এখানে আর এক মুহূর্তও থাকার কোনো প্রয়োজন দেখছি না, রামেসিস আর সেরেনার কাছে ফিরে আসতে আসতে বললাম আমি। সেরেনাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল রামেসিস। ফিরতি পথে রওনা দিলাম আমরা, গন্তব্য নীলনদের তীর, যেখানে সেই ডিঙি নৌকাটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। কেউই একবারের জন্যও পেছনে তাকালাম না।
*
হুরোতাসের শিবিরে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। ডিঙিতে বসা আমাদের তিনজনকে চিনতে পেরেই উল্লসিত চিৎকারের স্রোত বয়ে গেল উপস্থিত প্রহরীদের মধ্যে। কয়েকজন নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের নৌকাটাকে টেনে তীরে নিয়ে এলো। ডাঙায় নামতে নামতে প্রায় অর্ধেক সেনাবাহিনী এসে জড়ো হলো আমাদের স্বাগত জানাতে। তার পরেই তাঁবুর ভেতর থেকে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলো হুরোতাস আর তেহুতি। দৌড়ে এসে সেরেনাকে জড়িয়ে ধরল হুরোতাস, তারপর বুকে জড়িয়ে রেখেই তাঁবুতে নিয়ে গেল। ওদিকে তেহুতি আনন্দে প্রায় নাচতে শুরু করল, একই সাথে মেয়েকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছে সকল দেবতাকে। একটু দূরত্ব রেখে ওদের অনুসরণ করলাম আমি আর রামেসিস, অপেক্ষা করছি যে কখন মেয়ের দিক থেকে আমাদের দিকে মনোযোগ ফেরাবে হুরোতাস। ভাগ্যই বলতে হবে, টেরামেশের শিরস্ত্রাণসহ অন্য যেসব জিনিস আমরা সাথে নিয়েছিলাম সেগুলো সব এখন একটা থলের মাঝে রয়েছে আমার সাথে।
অবশেষে মেয়েকে বুকে টেনে নিল তেহুতি, তারপর অন্য মহিলাদের সাথে নিয়ে যোগ দিল মেয়েদের নিজস্ব আলোচনা সভায়। প্রায় সাথে সাথেই আমাদের দিকে এগিয়ে এলো হুরোতাস। এসো আমার সাথে! হুকুম দিল সে। যা যা ঘটেছে সব শুনতে চাই আমি, সেইসাথে বিশেষভাবে জানতে চাই যে সেই দানবটার কী গতি করে এলে তোমরা।
হুরোতাসের সাথে তার ব্যক্তিগত তাঁবুতে ঢুকলাম আমরা। ভেতরে ঢুকে আরাম করে বসলাম আমরা দুজন, আর ওদিকে বড় এক বোতল লাল মদ নিয়ে এলো হুরোতাস। তিনটি বড় বড় পেয়ালায় মদ ঢালল সে। এই পেয়ালাগুলো কেবল বিশেষ বিশেষ উপলক্ষেই বের করা হয়। বোঝাই যাচ্ছে দারুণ খুশি হয়ে আছে সে।
এবার বলো। সব কিছু একেবারে প্রথম থেকে, আমাদের মুখোমুখি নিজের সিংহাসনে বসতে বসতে বলল হুরোতাস।
আমার দিকে তাকাল রামেসিস। লুকানো বাগান থেকে এখানে আসার পথেই আমি আর রামেসিস আলোচনা করে নিয়েছি যে, টেরামেশের সাথে আমাদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনার ব্যাপারে কতটুকু বলা হবে হুরোতাসকে। আমাদের দুশ্চিন্তা হচ্ছিল এই ভেবে যে, আজ যা যা ঘটেছে তাকে বলা যায় একেবারেই অবিশ্বাস্য। যে এই ঘটনা নিজের চোখে দেখেনি সে হয়তো কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইবে না। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা ঠিক করেছি যে, হুরোতাসের কাছে অন্তত কিছুই লুকাব না আমরা, তা সে যতই অবিশ্বাস্য মনে হোক না কেন। যদি আমাদের বক্তব্য তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে না হয় তাহলে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তো তার আপন মেয়েই আছে। সেরেনার কথাকে নিশ্চয়ই কখনো ফেলতে পারবে না সে।
লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিলাম আমি, তারপর লম্বা একটা চুমুক দিলাম মদের পেয়ালায়। অনেকটা মানসিক শক্তি ফিরে পেলাম এবার। তারপর বলতে শুরু করলাম সব। দীর্ঘ সময় ধরে বলতে হলো আমাকে, এমনকি আমার স্বাভাবিক সময়ের চাইতেও বেশি। যদিও ঘটনাপ্রবাহে সেরেনার ভূমিকার কিছু কিছু ব্যাপারে হালকা চেপে গেলাম আমি। হাজার হোক হুরোতাসের আপন মেয়ে সেরেনা। মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম, রামেসিস তার তীর ছোঁড়ার আগে সেরেনা কীভাবে টেরামেশকে অন্যমনস্ক করে তুলেছিল তার নিখুঁত বর্ণনা হুরোতাসের না শুনলেও চলবে। আমার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল হুরোতাস, মাঝে মাঝে আপন মনে মাথা ঝাঁকাল। বোঝা গেল এই বিবরণে কোথাও কোনো সন্দেহ নেই তার।
আমার কথা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সে। তারপর বলল, তার মানে টেরামেশের মাথাটা তোমরা সাথে করে নিয়ে এসেছ, যাতে তার মৃত্যু সম্পর্কে সবাই নিঃসন্দেহ হতে পারে। তাই তো?
না, হালকা গলায় তার ভুলটা শুধরে দিলাম আমি। কথাটা ওভাবে বলিনি আমি।
তুমি কী বলেছ তা তো আমি নিজের কানেই শুনেছি, এবং বিশ্বাসও করেছি। কিন্তু জল ঘোলা করে কী লাভ বলো? আমাদের শিবিরের আশপাশে খুঁজলেই অনেক খুলি পাওয়া যাবে। ওগুলোর মাঝে যেকোনো একটাকে টেরামেশের মাথার খুলি বলে চালিয়ে দিতে পারব আমরা। আবু নাসকোসের দুর্গ দখল করার জন্য সৈন্যদের নদীর ওপারে পাঠাতে চাই আমি। টেরামেশের বেঁচে থাকার এবং সৈন্যদের ওপর আক্রমণ করার সামান্যতম সম্ভাবনা থাকলেও ওরা কেউ যেতে চাইবে বলে মনে হয় না। ওদেরকে বোঝানোর জন্যই একটা খুলি দরকার আমাদের। সুন্দর দেখে একটা পরিষ্কার খুলি জোগাড় করব আমরা, বা ময়লা হলেও অসুবিধা নেই; যেটা দেখলে ওরা বিশ্বাস করবে যে নদীর ওপারে ওদের জন্য ওত পেতে বসে নেই টেরামেশ।
রামেসিসের দিকে তাকালাম আমি। দাঁত বের করে হাসল ও। বলল, আমার বিয়ে খুব বেশি দিন হয়নি। তবে এর মধ্যেই একটা জিনিস শিখে গেছি আমি। সেটা হচ্ছে বউ এবং শ্বশুরের সঙ্গে কখনো তর্কে যেতে হয় না।
পরদিন সকালে মিশরের ফারাও প্রথম রামেসিস স্পার্টা ও ল্যাসিডিমনের রাজা হুরোতাস এবং বাকি চৌদ্দজন মিত্র রাজার সকল সৈন্য এক জায়গায় জড়ো হলো। তবে তাদের জায়গাটা এমনভাবে বেছে নেওয়া হলো যেন নদীর ওপারে আবু নাসকোস দুর্গ-প্রাচীরের ওপর থেকে কিছু দেখা না যায়। সৈন্যদের বেশির ভাগই বেশ মনমরা হয়ে আছে। পরে শুনেছিলাম নীলনদের ওপারে অভিযান থেকে আমরা গতকাল বিকেলে ফিরে আসার পর থেকেই নাকি তাদের মধ্যে একটা গুজব ঘুরে বেড়াচ্ছিল। গুজবের সারমর্মটা এ রকম যে, উটেরিক টুকরা এবং তার সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত ভয়ংকর যোদ্ধা টেরামেশের বিরুদ্ধে আক্রমণের পরিকল্পনা বাদ দিতে যাচ্ছি আমরা। হুরোতাস এবং তার মিত্ররা খুব শীঘ্রই নাকি যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে স্পার্টায় পালিয়ে যাবে। রামেসিস আর তার নববিবাহিত স্ত্রীও যাবে তাদের সাথে।
