সেই একই মুহূর্তে যেন বজ্রপাত বর্ষিত হলো রামেসিসের কণ্ঠ থেকে; এত জোরে যে আগে থেকে প্রস্তুত থাকার পরেও আমি পর্যন্ত চমকে গেলাম, ফন্টাসের পুত্র, তোমার বাবা তোমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে!
চরকির মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাদের মুখোমুখি হলো টেরামেশ। সাথে সাথে যেন জমে গেল সে, পাথরের মতো তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে। তারপর সব কিছু যেন একই সাথে ঘটতে শুরু করল। এক লাফে ঘাসের মাঝে মুখ খুঁজে শুয়ে পড়ল সেরেনা, ফলে পরিষ্কার হয়ে গেল রামেসিসের তীর নিক্ষেপের পথ। এবং একই মুহূর্তে অভ্যস্ত দ্রুততার সাথে ধনুকটা সামনে তুলে আনল রামেসিস। তীরটা আগেই ছিলায় জোড়া ছিল, এবার সেটাকে এক টানে কানের কাছে এনেই ছেড়ে দিল ও। তীক্ষ্ণ প্রায় সুরেলা একটা ঝংকার বেরিয়ে এলো ছিলা থেকে, ছুটে গেল তীর।
টেরামেশের প্রতিক্রিয়াটা হলো তাৎক্ষণিক। কিন্তু মৃত্যুর প্রতিনিধি তীরটা থামানোর জন্য যথেষ্ট দ্রুত হলো না তা, কারণ সেটা ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি দূরত্ব পেরিয়ে গেছে। অর্ধবৃত্ত রচনা করে ছুটছে ওটা, এবং টেরামেশ এক চুল নড়ার আগেই বৃত্তের সর্বোচ্চ বিন্দু পার হয়ে নেমে আসতে শুরু করেছে। তার বীভৎস চেহারা আর বিশাল পুরুষাঙ্গ- দুটোই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই এক ফালি সূর্য কিরণের মতো নেমে এলো তীরটা। টেরামেশের বিস্মিত চোখের ঠিক মাঝখানে ঢুকে গেল, এক ঝলক স্বচ্ছ তরল বেরিয়ে এলো সাথে সাথে। পালকসহ তীরের প্রায় দেড় হাতের মতো বেরিয়ে রইল তার চোখের ফুটো থেকে। যে অবস্থানে ভেতরে ঢুকেছে ওটা তাতে আন্দাজ করা যায় যে, নিশ্চিতভাবেই তার মস্তিষ্ক ছিদ্র করে দিয়েছে। ভেবেছিলাম সাথে সাথেই মাটিতে পড়ে যাবে সে, আর উঠতে পারবে না। কিন্তু তার বদলে দৌড়াতে শুরু করল টেরামেশ, একই সাথে গলা থেকে বেরিয়ে আসছে প্রলম্বিত টানা লয়ের চিৎকার। সরাসরি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে সে। প্রথমে মনে হলো আমাদের ওপর আক্রমণ করতে চায়; কিন্তু আমাদেরকে দেখতে পাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখলাম না তার মাঝে। কাছাকাছি এগিয়ে আসতেই রামেসিস আর আমি লাফ দিয়ে সরে গেলাম তার সামনে থেকে। ওদিকে দৌড়ে ঢালু জমি বেয়ে হ্রদের দিকে নেমে যেতে লাগল টেরামেশ, অন্ধ ক্রোধ আর যন্ত্রণায় চিৎকার করেই চলেছে।
দুজনেই তলোয়ার বের করে তাকে ধাওয়া করলাম আমরা; কিন্তু দৌড়ে পেরে উঠলাম না কেউই। তারপর দৌড়াতে দৌড়াতেই বিশাল ডুমুর গাছটার সাথে ধাক্কা খেল টেরামেশ, গাছটা দেখতেই পায়নি সে। সংঘর্ষের ফলে তীরটা সম্পূর্ণ ঢুকে গেল তার মাথার ভেতর, খুলি ফুটো করে পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে এলো। কিন্তু তবু পড়ল না সে, টলোমলো পায়ে চক্কর খেতে লাগল বারবার। এখনো বন্ধ হয়নি তার চিৎকার। এবার মাংস খসে আসতে শুরু করল তার মাথা থেকে, যেন পচে-গলে খসে পড়ছে। সূর্যের আলোতে চকচক করে উঠল খুলির সাদা হাড়। তারপর তাতেও পচন ধরতে শুরু করল।
এবার মাথা থেকে বাহু আর বুকের মাংসে নেমে এলো পচন। প্রথমে কালো হয়ে এলো মাংস, তারপর টুকরো টুকরো হয়ে খসে পড়তে লাগল নিচে। তীব্র ভারি দুর্গন্ধে ভরে উঠল বাতাস। সে গন্ধ এতই তীব্র যে নাকে মুখে হাত চাপা দিয়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলাম আমরা। ঝাঁকি খেতে লাগল শরীরটা, মোচড় দিতে লাগল বারবার। তারপর ওভাবেই একসময় পরিণত হলো পচা মাংসের একটা স্কুপে। তারপর সেটাও পরিণত হলো ধুলোয়, হ্রদের ওপর থেকে বয়ে আসা হালকা বাতাসের সাথে উড়ে যেতে শুরু করল। তবে যে তীরের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে সেটা পড়ে রইল ওখানেই। একটু দ্বিধা করে সামনে এগিয়ে গেল রামেসিস, ঝুঁকে তীরের ফলাটা তুলে নিতে চাইল। কিন্তু তার ছোঁয়ার আগেই কালো হয়ে এলো ধাতুর রং, তার পরই ক্ষয় হয়ে মিশে গেল মাটির সাথে। শেষ পর্যন্ত টেরামেশের অস্তিত্বের আর কোনো চিহ্নই রইল না কোথাও। আক্ষরিক অর্থেই বাতাসে মিলিয়ে গেছে সে।
অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা। তারপর একসময় চোখ সরিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেলাম সেরেনা যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সেখানে। ওর দুপাশে বসলাম আমরা দুজন। ওর কাঁধে হাত রেখে জড়িয়ে ধরল রামেসিস, আর তার কাঁধে হেলান দিল সেরেনা। প্রসাধনের নিচে বরফের মতো সাদা হয়ে গেছে ওর চেহারা, চোখে টলমল করছে অশ্রু।
রীতিমতো জোর করে দৃশ্যটা দেখছিলাম আমি। কী ভয়ানক! ফিসফিস করে বলে উঠল ও। তারপর টেরামেশের মৃতদেহ যে জায়গাটায় বাতাসে মিশে গেছে সেদিকটায় আঙুল তাক করে বলল, দেখো, টেরামেশের লুকানো বাগানের কী পরিণতি হচ্ছে।
আমাদের চোখের সামনেই শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে হ্রদ আর ঝরনাগুলো। এখন সেগুলো স্রেফ উঁচু-নিচু মাটির ঢিবি আর গর্তে পরিণত হলো, তার ওপরে লেগে রইল সবুজ শেওলা। জঙ্গলের গাছগুলো থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল ঘন সবুজ ডালপালা আর রঙিন ফুলের বাহার। গুঁড়িগুলো শুকিয়ে কালো হয়ে এলো। শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেল গাছগুলোর নিচে জন্মানো সবুজ ঘাসের গালিচা। বিশাল ডুমুর গাছটার বড় বড় ডালগুলো খসে পড়ল, কাটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো পড়ে রইল নিচে। লুকানো বাগানকে ঘিরে রাখা কাটাঝোঁপটা আবারও রুক্ষ নিষ্প্রাণ চেহারা নিয়ে মাথা তুলল; কিন্তু তা কেবল কয়েক মুহূর্তের জন্য। তার পরেই ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করল তাদের বিস্তার। টেরামেশের সেই বিশাল ইউনিকনগুলোকে আর দেখা গেল না। লুকানো বাগানের সাথে সাথে তারাও অদৃশ্য হয়ে গেছে। এখন এখানে কেবল মৃত্যু আর ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নেই। সব কিছুর মাঝে পড়ে রইল টেরামেশের সেই শিরস্ত্রাণ। এগিয়ে গিয়ে ওটাকে এই আশ্চর্য ঘটনার একমাত্র স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়ার জন্য তুলে নিলাম আমি।
