হ্যাঁ আছে। সেরেনা আর রামেসিসকে ওই কাঁটাঝোঁপের মাঝ দিয়ে কী করে নিয়ে আসব আমি? ওখান দিয়ে আসতে গেলেই তো ঘুমিয়ে পড়বে ওরা।
কোনো একটা বুদ্ধি নিশ্চয়ই চলে আসবে তোমার মাথায়, আমি নিশ্চিত, জবাব দিল সে। তার পরেই মানুষ থেকে আবার পরিণত হলো ছোট্ট পাখিটায়, বাতাসে তখনো তার দুষ্টুমিভরা হাসির প্রতিধ্বনি ভেসে বেড়াচ্ছে। তুমি নিশ্চয়ই আশা করছ না যে এই চেহারায় আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব?
অগত্যা কাঁটাঝোঁপের মাঝ দিয়ে আবার ওপাশে ফিরে গেলাম আমি। দেখলাম রামেসিস এবং সেরেনাকে যেখানে রেখে গিয়েছিলাম সেখানেই আমার জন্য উদ্বিগ্ন অবস্থায় অপেক্ষা করছে ওরা। কোথায় গিয়েছিলে টাইটা? আমাকে দেখে একসাথে জানতে চাইল দুজন। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল আমাদের।
এখন তোমাদের সামনে দুশ্চিন্তা করার মতো একটা ব্যাপারই আছে। সেটা হচ্ছে এই আমার কাঁধে চড়ে এই কাঁটাঝোঁপের জঙ্গল পার হতে হবে তোমাদের। দয়া করে তর্ক কোরো না। আমাদের হাতে মোটেই সময় নেই। কিন্তু- আহত গলায় বলতে শুরু করল রামেসিস।
কোনো কিন্তু নয়, প্রিয় স্বামী। টাটার কথা শুনেছ তুমি। প্রথমে তোমার পালা, কড়া গলায় তাকে বলে উঠল সেরেনা। সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল রামেসিস।
বোঝাই যাচ্ছে স্ত্রী হিসেবে নিজের অবস্থানটা বেশ ভালো মতোই পোক্ত করে নিয়েছে সেরেনা।
নিজের ধনুকের খাপটাও সাথে করে নিয়ে যেতে চাইল রামেসিস, তবে আমার কথায় শেষ পর্যন্ত ওটা সেরেনার কাছে রেখে যেতে সম্মত হলো। কাঁটাঝোঁপের মাঝ দিয়ে অর্ধেকের মতো দূরত্ব অতিক্রম করতে পারল ও, তার পরেই হঠাৎ যেন শরীরে ভার ছেড়ে দিল তার পা দুটো। মাটিতে পড়ে গেল ও, মৃদু নাক ডাকতে শুরু করেছে। ঠোঁটে আরামের মৃদু হাসি। বেশ বড়সড় মানুষ রামেসিস, পেশিবহুল দেহ। তা সত্ত্বেও ওকে এক কাঁধের ওপর তুলে নিতে পারলাম আমি, বয়ে নিয়ে এলাম গোপন বাগানটার ভেতরে। বিশাল ডুমুর গাছটার গোড়ায় শুইয়ে দিলাম রামেসিসকে। গাছের ডালে বসে বুলবুল পাখিটা নজর রাখল ওর ওপর।
এবার সেরেনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফিরে এলাম আমি। কোনো রকম আপত্তি ছাড়াই এক লাফে আমার কোলে চড়ে বসল ও, তারপর দুই হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরল।
অপেক্ষা করছিলাম যে কখন আমাকে নিতে আসবে তুমি, খুশি খুশি গলায় বলল সেরেনা। ওর স্বামীর ওজন বহন করার পর ওকে বইতে কোনো কষ্টই হলো না। ধনুকের খাপ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসগুলোও সহজেই সাথে করে নিতে পারলাম আমি। যখন ওকে ডুমুর গাছের নিচে রামেসিসের পাশে শুইয়ে দিলাম তখন আরাম করে গুটিসুটি মেরে শুলো ও, তবে কেউই জাগল না ঘুম থেকে। পাশে বসে মিনিটখানেক ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম আমি। দুজনকে এত সুন্দর মানিয়েছে, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে হয়।
বাহ, কী আরামে ঘুমোচ্ছে, যেন নিজের বাড়ি পেয়েছে, মাথার ওপর গাছের ডাল থেকে বলে উঠল পাখিটা। আমি তাহলে একটা ঘুমপাড়ানি গান শোনাই, কি বলো?
*
রামেসিস আর আমি অনেক আগেই একমত হয়েছি যে, পঁয়ষট্টি কদম দূর থেকেই ওর তীর ধনুকের নিশানা সবচেয়ে নিখুঁত হয়। এই দূরত্ব থেকে একটা ভুট্টার দানার সমান ছোট্ট লক্ষ্যেও একের পর এক নিখুঁত নিশানায় তীর ছুঁড়ে যেতে পারে ও। এবার ওর দুই গালে কয়েকটা চাপড় মেরে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললাম আমি। উঠে বসে অবাক চোখে এদিক-ওদিক চাইতে লাগল রামেসিস, বাগানের সৌন্দর্য দেখে বিস্মিত হয়ে গেছে। ওর বিস্মিত কথাবার্তার শব্দে সেরেনারও ঘুম ভাঙল। দুজনের প্রাথমিক বিস্ময়ের ধাক্কাটা কেটে যাওয়ার পর এবার ওদের বুঝিয়ে দিলাম আমি কাকে কী করতে হবে।
ধনুকের খাপের সাথে নিয়ে আসা প্রসাধন এবং অন্যান্য মেয়েলি দ্রব্যাদি তুলে দিলাম সেরেনার হাতে। এগুলোর সাহায্যে নিজের নিখুঁত সৌন্দর্যকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলবে ও। তারপর ওকে প্রসাধন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার সুযোগ দিয়ে আমি আর রামেসিস ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নির্দিষ্ট জায়গাটার দূরত্ব মাপতে। হ্রদের সামনে মাঠের মাঝখান বরাবর ফুটে আছে অত্যন্ত সুন্দর কিছু নীল রঙের বুনো ফুল। ওটাই আমাদের নির্দিষ্ট জায়গা এবং ওখান থেকে ডুমুর গাছের ফাঁপা গুঁড়িটা পর্যন্ত দূরত্ব মেপে দেখলাম আমরা।
ইনানা আমাকে আগেই জানিয়েছে হ্রদের ওপাশে জঙ্গলের ভেতর ঘুমিয়ে আছে টেরামেশ। এখনো সেই লাল ডানার বুলবুল পাখিরই রূপ ধরে আছে সে, গিয়ে বসেছে টেরামেশ যে গাছের নিচে ঘুমাচ্ছে তার ডালে। আমার এবং রামেসিসের প্রস্তুতি নেওয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ওখানেই থাকবে সে, ঘুম পাড়িয়ে রাখবে তাকে। হ্রদের মাঝ দিয়ে এ পারে আসার একটা পথ আছে। ঘুম থেকে ওঠার পরেই টেরামেশকে ওই পথ দিয়ে এদিকে আসার জন্য প্ররোচিত করবে ইনানা। অবশেষে ফাঁদ পাতা এবং তাতে টোপ বসানোর কাজ শেষ হলো। ডুমুর গাছের ফাঁপা গুঁড়ির ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিলাম আমি এবং রামেসিস। ধনুকে সেই বিশেষ তীরটা জুড়ে নিল রামেসিস। খাঁটি সোনার মতো উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বল করে জ্বলছে তীরের মাথাটা। কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে রইল ও যেন প্রার্থনা করছে। তারপর আবার চোখ খুলে আমার দিকে ফিরে মাথা ঝকাল। এবার গুঁড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে এসে গাছটার সামনে দাঁড়ালাম আমি, সবুজ চত্বরটার দিকে তাকালাম। পুরো বাগানকে ঘিরে রাখা জাদুর কাটাঝোঁপের সামনে চত্বরের অপর প্রান্তে গাছপালার সাথে মিশে গিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে সেরেনা। আমার কাছ থেকে সংকেত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে ও। মাথার ওপরে এক হাত তুলে নাড়লাম আমি। সংকেত পেয়ে উঠে দাঁড়াল ও, তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে নীল রঙের বুনো ফুলের ঝোঁপটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এটা একই সঙ্গে যেমন আমার প্রতি ওর সংকেত হিসেবে কাজ করল তেমনি ইনানার প্রতি আমার সংকেত হিসেবেও কাজ করল। আমি জানি হ্রদের অপর পাশে গাছের ডালে বসে আমাদের দিকেই চোখ রেখেছে সে।
