হঠাৎ কোনো রকম সংকেত ছাড়াই অদৃশ্য হয়ে গেল বুলবুল পাখিটা। থমকে দাঁড়ালাম আমরা। আশান্বিত চোখে আমার দিকে তাকাল রামেসিস আর সেরেনা। যদিও আমি নিজেও ওদের মতোই বিভ্রান্ত বোধ করছি তবে চেহারায় তার কোনো ছাপ ফুটতে দিলাম না। তার বদলে কণ্ঠস্বরে আত্মবিশ্বাস এনে বললাম, এখানেই দাঁড়াও। আমি যাব আর আসব। দেখতে হবে যে সামনের পথটুকুর কী অবস্থা।
এই বলে ওদের রেখে সামনে গিয়ে গেলাম আমি। প্রায় দুর্ভেদ্য কাঁটাঝোঁপের দেয়াল ভেদ করে সামনে এগোতে হলো আমাকে। কিন্তু হাঁটতে গিয়ে বুঝলাম দেখতে যদিও কাটাঝোঁপগুলো বেশ ভয়ংকর; কিন্তু আমাকে কোনো রকম বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। আমার শরীর এবং জামাকাপড়ের ওপর দিয়ে যেন আলতো পরশ বুলিয়ে দিয়ে সরে যেতে লাগল ওরা, কোথাও কোনো আঁচড় বা কাটাছেঁড়ার চিহ্ন পড়ল না। তবে কিছুক্ষণ পরেই আবিষ্কার করলাম অদ্ভুত এক ক্লান্তি আর অবসাদ ঘিরে ধরেছে আমাকে। ধীর হয়ে এলো আমার পদক্ষেপ, থেমে পড়লাম আমি। ইচ্ছে হচ্ছে এখানেই একটু বসে বিশ্রাম নিই, আর যদি সম্ভব হয় তাহলে একটু ঘুমিয়েও নিই। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে শুরু করল আমার। এবং কেবল তখনই আমি বুঝতে পারলাম অন্য কোনো অস্তিত্ব বা সত্তা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। কোনো ধরনের মানসিক বাধার মুখোমুখি হয়ে পড়েছি আমি। বুঝতে পারছি টলছে আমার পা দুটো, অবশ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে শরীরের ভার আর বইতে পারছে না ওরা। মাথার ভেতর যেন কুয়াশার মেঘ জমছে, পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারছি না। আর সামনে এগোনো সম্ভব নয় আমার পক্ষে।
তার পরেই আমার কাঁধের ওপর কীসের যেন ওজন অনুভব করলাম। কানে শুনতে পেলাম ইনানার মিষ্টি কণ্ঠ: হাল ছেড়ো না টাইটা! তোমার সাথে কী হচ্ছে খুব ভালো করেই জানো তুমি। এটাকে কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা আছে তোমার।
লম্বা করে দম নিলাম আমি, শ্বাসনালি আর বুকের ভেতর শিসের মতো শব্দ উঠল। ইনানার কণ্ঠ শুনতে লাগলাম কান পেতে। একই সাথে অনুভব করলাম আমার মনের ওপর যে কালো মেঘের ছায়া নেমে এসেছিল তা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে, সরে যাচ্ছে। আবারও পায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলাম আমি। তারপর জোর করে এগিয়ে গেলাম আরো এক পা।
এই তো টাইটা। চাইলেই এই বাধাকে কাটিয়ে উঠতে পারবে তুমি। নিজের এবং ভালোবাসার মানুষদের কথা চিন্তা করে নিজেকে শক্ত রাখো। এখন তোমাকে দরকার ওদের।
আরো একটা পা ফেললাম আমি, তারপর আরেকটা। এখনো গায়ে কাঁটার খোঁচা লাগছে না, আমার কিন্তু অবচেতন মনে বুঝতে পারছি যে ইনানার কাজ এটা। ইচ্ছে করেই কাঁটাগুলোর মুখ ঘুরিয়ে দিচ্ছে সে।
তারপর হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল শরীরের ওপর কাঁটার স্পর্শ। বন্ধ চোখের ওপরে আলোর স্পর্শ টের পেলাম আমি। চোখ খুললাম এবার এবং অসাধারণ এক দৃশ্য দেখতে পেলাম আমার চোখের সামনে। ধারালো কাঁটায় ভর্তি সেই কাঁটাঝোঁপগুলো আর নেই এখন। তার বদলে অদ্ভুত সুন্দর এক বাগান উন্মোচিত হয়েছে আমার সামনে। বাগানের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট ছোট হ্রদ আর স্রোতস্বিনী ঝরনাধারা, সূর্যের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে তাদের পানিতে। তার সাথে আরো রয়েছে ঘন সবুজ রঙের নানা রকম গাছে ভর্তি বন। তাদের উঁচু উঁচু ডালগুলোতে ফুটে আছে নানা রঙের ফুল, নিচ থেকে মনে হচ্ছে যেন চুনি আর নীলা পাথর সাজিয়ে রেখেছে কেউ। আর তার নিচে বিছিয়ে আছে ঘন সবুজ ঘাসের গালিচা।
হ্রদের ওপাশে জঙ্গলের মাঝ থেকে বেরিয়ে এলো এক দল কুচকুচে কালো ইউনিকর্ন। এগুলোকেই দেখেছিলাম টেরামেশের সেই ভয়ংকর রথটাকে টানতে। তবে এখন আর লাগামের বন্ধনে আবদ্ধ নয় প্রাণীগুলো, মুক্ত সবাই। তরুণ ঘোড়ার মতো লাফাতে লাফাতে পানি খাওয়ার জন্য হ্রদের কিনারে এগিয়ে এলো দলটা। খাওয়া শেষ হতে আবার জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল তারা, অদৃশ্য হয়ে গেল গাছগুলোর মাঝে।
এটাই তাহলে টেরামেশের লুকানো বাগান, বলে উঠলাম আমি। ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ফিরে পাচ্ছি আবার এবং বুঝতে পারছি যে গন্তব্যে পৌঁছে গেছি আমরা। আমাকে সমর্থন জানিয়েই যেন কিচিরমিচির করে উঠল কাঁধে বসে থাকা পাখিটা। কিন্তু টেরামেশ কোথায়? প্রশ্ন করলাম আমি।
ঘুমাচ্ছে।
তুমি কি নিশ্চিত, ইনানা?
ভয় পেও না। আমি যতক্ষণ আছি তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
ভয় পাচ্ছি না আমি, একটু আহত গলায় তাকে শুধরে দিলাম আমি। শুধু একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছে এই যা। তারপর চলে এলাম অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলোর আলোচনায়। এখন টেরামেশকে যেভাবেই হোক এমন একটা অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে যেখান থেকে তার মুখের অক্ষত পাশটায় তীর দিয়ে আঘাত করার সুযোগ পাবে রামেসিস।
সমস্যাটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম আমরা। পাখির রূপ ছেড়ে মানুষের রূপ ধারণ করল ইনানা, যাতে তার মতামতগুলো আরো ভালোভাবে বোঝাতে পারে আমাকে। বাগানের যে অংশটাকে সে টেরামেশকে খুন করার জন্য বেছে নিয়েছে সেটা এবার দেখাল আমাকে। তারপর বুঝিয়ে দিল যে টেরামেশকে কীভাবে এই জায়গার ভেতরে নিয়ে আসতে হবে এবং সে আসা পর্যন্ত আমি রামেসিস এবং সেরেনা কোথায় অপেক্ষা করব।
আর আগে কখনো সেরেনাকে দেখেনি সে, বলল ইনানা। তাই স্বভাবতই ধরে নেবে যে সেরেনা সম্ভবত কোনো অপার্থিব সৃষ্টি, যাকে তার মা হেকাটি অথবা অন্য কোনো খারাপ দেবতা তার মনোরঞ্জনের জন্য পাঠিয়েছে। এর আগে বহুবার এ ধরনের উপহার পেয়েছে টেরামেশ। ফলে সেরেনাকে দেখে একটুও চমকাবে না সে, কোনো প্রতিক্রিয়াই হবে না তার মাঝে। ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘাসে ঢাকা জমিটুকুর ঠিক মাঝখানে জন্মানো একটা বিশাল গাছের দিকে ইঙ্গিত করল ইনানা। ওই ডুমুর গাছটার গুঁড়ির ভেতরটা ফাঁপা। তুমি আর রামেসিস ওর ভেতরে লুকিয়ে থাকবে। সেরেনা যখন তোমাদের শিকারকে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসবে তখন রামেসিস তাকে তার নাম ধরে ডাক দেবে। ডাক শুনে ঘুরে তাকাবে টেরামেশ, এবং তখনই বাকি কাজটুকু শেষ করবে রামেসিস। অদ্ভুত সুন্দর চোখগুলো দিয়ে আমার দিকে তাকাল ইনানা। আর কিছু জানার আছে তোমার?
