সেই দিন সন্ধ্যায় নীলনদের বুকে অবস্থিত চারটে দ্বীপের মাঝে তৃতীয় দ্বীপটায় সাঁতরে গিয়ে উঠলাম আমি। ইনানার সাথে দেখা করতে হবে আমার। তার আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে প্রাচীন লোকগুলোর বানানো সেই সুড়ঙ্গপথটা আরো একবার পরীক্ষা করে দেখলাম। বুঝতে পারলাম এখনো এই পথ তৈরির উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা কাজ করছে না আমার মাথায়। শেষ পর্যন্ত যখন ইনানা দেখা দিল তখন যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। শেষবার যখন দেবীর সাথে আমার দেখা হয় তখন সে হেকাটির গুহার মুখে আটকে বসে থাকা বিশাল পাথরটার ওপর বসে মিষ্টি সুরে গান গাইছিল। তবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম সেই ঘটনার কথা এখন দেবীকে মনে করিয়ে না দিলেই ভালো হয়।
হয়তো এ কারণেই প্রথমবারের মতো অন্ধকারের মাঝ থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি আমার দিকে এগিয়ে এলো সে, তারপর আমার দুই গালে চুমু খেল। তারপর সাঁতার কেটে আসার ফলে আমার ভেজা শরীরের দিকে গ্রাহ্য না করেই বসে পড়ল আমার কোলের ওপর।
তুমি এবং তোমার বন্ধু টাৰ্মাকাট মিলে নিখুঁত একটা তীর তৈরি করতে পেরেছ দেখে খুব খুশি হয়েছি আমি, কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বলে উঠল সে।
কখনো কোনো কিছু তোমার চোখ এড়ায় না, তাই না? প্রশ্ন করলাম আমি। তার চুমুগুলো এখনো যেন লেগে রয়েছে আমার গালে, এবং ব্যাপারটা আমি দারুণ উপভোগ করেছি বুঝতে পেরে নিজেই অবাক হয়ে উঠলাম। কিন্তু ওই তীরটা কখনো ব্যবহার করার সুযোগ কি আসবে আমাদের হাতে?
আমার প্রশ্নটা অগ্রাহ্য করল সে। নীলনদের পশ্চিম তীরে আবু নাসকোসে উটেরিকের দুর্গের পেছনে যে জঙ্গল তার মাঝে লুকানো আছে এক তৃণভূমি। ছেলের জন্য আশ্রয় এবং আত্মগোপনের স্থান হিসেবে জায়গাটাকে তৈরি করেছে হেকাটি।
লুকানো তৃণভূমি বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছ? প্রশ্ন করলাম আমি।
যা মুখে বলেছি ঠিক তাই। জায়গাটা লুকানো কারণ দেখার মতো চোখ এবং শোনার মতো কান যাদের আছে তারা ছাড়া আর কেউ ওই জায়গার সন্ধান পায় না।
এমন চোখ আর কান আমি কোথায় পাব?
শুধু আমাদের কারো কাছ থেকে, যারা অলিম্পাস পর্বতের বাসিন্দা।
তার মানে কোনো দেবতা বা দেবী? এমনকি দেবত্বের অধিকারী কাউকে দিয়েও কাজ হবে না?
প্রিয় টাইটা, মাঝে মাঝে তোমার বুদ্ধি দেখে সত্যিই অবাক হয়ে যাই আমি! ঠিক ধরেছ, আমি ঠিক এটাই বলতে চেয়েছি।
তোমার রসবোধ যতটা তীক্ষ্ণ, আমার বুদ্ধিও ঠিক ততটাই, গলা নামিয়ে বলে উঠলাম আমি।
কথাটা আমার কানে যায়নি সে জন্য আমি খুশি, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল ইনানা। তবে এখন বুদ্ধি এবং রসবোধের চাইতে আরো গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময়। দেবী হেকাটির ছেলে টেরামেশ এই মুহূর্তে তার লুকানো বাগানেই রয়েছে। কিন্তু অস্থির হয়ে উঠেছে সে। এমনকি আমি নিজেও জানি না যে আগামীকাল সকাল নাগাদ সে একই জায়গাতে থাকবে কি না।
আমাদেরকে কত দ্রুত ওখানে নিয়ে যেতে পারবে তুমি?
দেখি আমার লাল ডানার বুলবুল বন্ধুটি কী বলে, জবাব দিল ইনান। তারপর মৃদু হাসল সে। আশা করি হেকাটির গুহার মুখ খোলার সময় যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল তা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছে সে। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল বেচারা।
*
ইনানার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি যখন তৃতীয় দ্বীপ থেকে আবার তীরে ফিরে এলাম তখনো রাতের অর্ধেক পার হয়নি। রামেসিস আর সেরেনাকে আগেই বলে গিয়েছিলাম, আমি ফিরে আসার সাথে সাথেই যেন কাজে নামা যায় এমনভাবে প্রস্তুত থাকতে। আমার তাঁবুতে ঢুকে দেখলাম যেকোনো মুহূর্তে পথে নামার উপযোগী পোশাক পরে আমার বিছানার ওপর ঘুমিয়ে আছে দুজন, একবার ডাকতেই ধড়মড় করে উঠে বসল। আগেই তাবুর পেছনে আস্তাবলে ঘোড়া প্রস্তুত করে রেখেছিলাম আমি, যাতে দরকারের সময় সাথে সাথে রওনা দেওয়া যায়।
এ ছাড়াও নদীর তীরে কিছু দূর পর পর নির্দিষ্ট জায়গায় ডিঙি নৌকা লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছি আমি। প্রধান শিবিরের উজান এবং ভাটি- দুই দিকেই রয়েছে নৌকাগুলো, কারণ এখনো আমার জানা নেই যে ঠিক কোন জায়গা দিয়ে নদী পার হতে হবে। তবে রওনা দেওয়ার পর দেখা গেল আমাদের শিবির থেকে খুব বেশি হলে দুই লিগ ভাটিতে অবস্থিত টেরামেশের লুকানো আস্তানা। নীলনদের পুব তীরে তার বাগান বরাবর আমরা যখন নৌকা থেকে নামলাম তখন সবে ভোর হচ্ছে। ঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দিলাম, যাতে ওরা নিজেদের ইচ্ছেমতো শিবিরে ফিরে যেতে পারে আবার। তারপর এগিয়ে গেলাম নদীর তীরের দিকে। সেখানে বেশ কিছু শুকনো ঘাস এবং অন্যান্য আবর্জনার নিচে লুকানো অবস্থায় পাওয়া গেল একটা ডিঙি নৌকা। ময়লাগুলো পরিষ্কার করে ফেললাম আমরা, তারপর রামেসিস আর আমি মিলে নদীর কিনারে টেনে নিয়ে গেলাম নৌকাটাকে। চামড়ার তৈরি লম্বা ধনুকের খাপ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে আমাদের অনুসরণ করল সেরেনা। নৌকায় উঠে পড়লাম আমরা, তারপর কিনারে ঠেলা দিয়ে সরে এলাম নদীর ভেতরে, অপর তীর লক্ষ্য করে বৈঠা বাইতে শুরু করলাম। নদী পার হয়ে নৌকাটাকে আবারও কিছু গাছপালা আর ঘাস ব্যবহার করে লুকিয়ে রাখছি, এই সময় একটা পরিচিত কিচিরমিচির শব্দ ভেসে এলো কানে। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের মাথার ওপর একটা গাছের ডালে অধৈর্য ভঙ্গিতে লাফালাফি করছে সেই বুলবুল পাখিটা। কাজ শেষ হতে এবার উত্তর দিক লক্ষ্য করে হালকা চালে দৌড়াতে শুরু করলাম আমরা। তার আগে ধনুকে ছিলা পরিয়ে নিল রামেসিস, দেখে নিল তূণের ভেতর প্রয়োজনীয় তীরটা আছে কি না। বাকি দুজনের কেউই বুঝতে পারল না যে আমি আসলে পাখিটাকে অনুসরণ করছি। এমনকি ওটার উপস্থিতি সম্পর্কেও কিছু আন্দাজ করতে পারেনি কেউ। সকালের অর্ধেকটা সময় জুড়ে দৌড়াতে হলো আমাদের। যদিও নির্দিষ্ট কোনো পথ বা রাস্তাঘাট নেই তবে বুলবুল পাখিটা প্রত্যেকবারই আমাদের সামনে সবচেয়ে সহজ রাস্তাটুকু বাতলে দিতে লাগল। ঘন জঙ্গলে ভর্তি কিছু পাহাড় টপকাতে হলো আমাদের। যতই সামনে এগোলাম ততই ঘন হয়ে উঠতে লাগল জঙ্গল।
