পাওয়া গেছে, টাটা! চকচকে ফলাটা মুখের কাছাকাছি তুলে এনে ওটার দিকে চেয়ে রইল সেরেনা। এই অস্ত্রটাকে খুঁজছি আমরা।
কীভাবে বুঝলে? প্রশ্ন করলাম আমি।
আমি জানি। কীভাবে জানি তা বলতে পারব না; কিন্তু জানি। আর তুমিও এটা জানো টাটা। চোখে অভিযোগ নিয়ে আমার দিকে তাকাল ও। ফলাটা আমার হাতে দেওয়ার আগেই বুঝতে পেরেছিলে তুমি, তাই না?
হাসলাম আমি। বললাম, তোমার বন্ধু রামেসিসকে ডেকে নিয়ে এসো। এখনই আবু নাসকোসে তোমার বাবার শিবিরের উদ্দেশ্যে রওনা দেব আমরা। আর ফলাটা কিন্তু হারিয়ে ফেলো না, সাবধান। তোমার রাজ্য এবং তোমার স্বামীর জীবন হয়তো এর ওপরই নির্ভর কড়ছে।
*
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঘোড়ায় উঠে বসলাম আমরা এবং ভোর হওয়ার আগেই পৌঁছে গেলাম তান্তিকা নদীর মুখে। এখানে এসে ঘোড়াগুলোকে পানি খাইয়ে নিলাম, তারপর সারা দিন পথ চললাম। বিকেল হলে তিন ঘণ্টার জন্য বিশ্রাম দিলাম ঘোড়াগুলোকে, নিজেরাও একটু চাঙ্গা হয়ে নিলাম। তারপর দ্বিতীয় রাতের পুরো সময়টা কাটালাম পথে। রাতের শেষ দিকে এসে বেঁকে বসল দুটো ঘোড়া। সেগুলোকে ওখানেই রেখে আবার এগিয়ে চললাম আমরা। পরের দিনের শেষ দিকে আরো দুটো ঘোড়া হারাতে হলো আমাদের। তবে ভোর হওয়ার আগেই পৌঁছে যেতে পারলাম আবু নাসকোসের বিপরীতে রাজা হুরোতাসের তাঁবুতে। তিন দিনের মধ্যে হেকাটির গুহা থেকে হুরোতাসের শিবিরে ফিরে এসেছি আমরা, যেটা নিঃসন্দেহে অহংকার করার মতো একটা কাজ। কিন্তু কাজটা করতে গিয়ে বেশ কয়েকটা ঘোড়াকে হারাতে হয়েছে। আমার এবং এটা নিয়ে আমি মোটেই গর্বিত নই।
শিবিরে পৌঁছে আবিষ্কার করলাম আমাদের অবর্তমানে পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি বা অবনতি হয়নি। নীলের দুই তীরে দুই পক্ষের সেনাবাহিনী অনেকটা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে, কেউই কাউকে বিরক্ত না করে সময় কাটাচ্ছে নিজ নিজ এলাকায়। নদী পার হয়ে টেরামেশের তীরবৃষ্টির মুখোমুখি হওয়ার জন্য উৎসাহী কাউকে পাওয়া যায়নি আমাদের লোকদের মধ্যে।
একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন যেটা ঘটেছে তা হলো একের অপমান মানে সবার অপমান- এই শপথ ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মিত্র রাজাদের মাঝে দুজন। নিজ নিজ সেনাবাহিনী নিয়ে জাহাজে উঠে পড়েছে তারা, তারপর নীলনদ ধরে ভূমধ্যসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। সেখান থেকে নিজেদের রাজ্যে চলে যাওয়ার ইচ্ছে তাদের, অবশ্য সার্বক্ষণিক ঝড়ের ঝাঁপটায় বিপর্যস্ত এবং জলদস্যুদের আখড়া এক টুকরো পাথুরে দ্বীপকে যদি রাজ্য বলা যায় আর কি। হুরোতাস জানাল সব মিলিয়ে দেড় শর বেশি হবে না দলত্যাগীদের সংখ্যা, এবং দুই রাজাসহ তাদের প্রত্যেকেই ছিল কাপুরুষ এবং দুর্বল চিত্তের অধিকারী।
হুরোতাস এবং হুইয়ের সাথে প্রাথমিক কথাবার্তা শেষ করার পর আমার পরবর্তী কাজ হলো সভ্য দুনিয়ার সবচেয়ে দক্ষ তীর-ধনুক নির্মাতা টাৰ্মাকাটকে ডেকে নিয়ে আসা। আমার পুরনো বন্ধু সে, ফলে একবার ডাকতেই চলে এলো আমার সাথে দেখা করতে। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানালাম আমি। তারপর বললাম, আমি চাই আমার জন্য সবচেয়ে নিখুঁত এবং শক্তিশালী একটা তীর বানিয়ে দেবে তুমি। বলা যায় না, তোমার দক্ষতার ওপরই হয়তো নির্ভর করছে মানবসভ্যতার ভাগ্য।
এমন একটা দায়িত্ব পাওয়ার জন্যই আমি সারা জীবন ধরে অপেক্ষা করছি, বলল সে। প্রথমে ধনুকটা দেখাও আমাকে। তারপর ওটার জন্য সম্পূর্ণ নিখুঁত একটা তীর বানাব আমি।
তাকে নিয়ে তাবুর পেছনের রাখা হাতির দাঁতের টেবিলটার কাছে চলে এলাম আমি, তারপর টান দিয়ে সরিয়ে ফেললাম টেবিলটাকে ঢেকে রাখা সিল্কের চাদর। টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটা ছিলাবিহীন ধনুক। সেটার দিকে এগিয়ে গেল টার্নাকাট। ধনুকটা স্পর্শ করার আগেই বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল তার চেহারায়।
এই ধনুকের সাথে যোগ্যতায় পাল্লা দিতে পারে এমন ধনুক এর আগে শুধু তিনটি দেখেছি আমি, বলল সে। ধনুকের হাতলটার ওপর সোনার তার জড়িয়ে তৈরি করা সূক্ষ্ম কারুকাজের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে তার আঙুলগুলো। এবং তিনটেই ছিল কোনো না কোনো রাজা বা ম্রাটের ব্যক্তিগত সম্পদ।
এবং এটাও ঠিক তাই, প্রিয় টাৰ্মাকাট। উচ্চ এবং নিম্ন মিশরের ফারাও প্রথম রামেসিসের ব্যক্তিগত ধনুক এটা।
এর চাইতে কম কিছু আশা করিনি আমি, টাইটা। এখনই কাজ শুরু করব আমি। অনেক সময় নষ্ট করেছি আমার জীবনে, আর নষ্ট করতে চাই না।
আমি তোমাকে সাহায্য করব, তাকে বললাম আমি। সারা জীবন ধরে তীর ধনুক তৈরির নিখুঁত সব কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখেছে টাৰ্মাকাট। সেগুলোর মাঝ থেকে সবচেয়ে উন্নত উপাদানটা খুঁজে বের করতে এবং তা দিয়ে চারটি তীর তৈরি করতে আরো দুই দিন সময় লাগল আমাদের। তারপর ওগুলোর মাঝে নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি করল টার্মাকাট, যেন অন্তত দুই শ কদম দূরত্ব পর্যন্ত লক্ষ্যভেদ করতে একটুও বিচ্যুতি না আসে। সব শেষে এক এক করে প্রতিটি তীরের মাথায় হেকাটির গুহা থেকে নিয়ে আসা সেই ফলাটা জোড়া দিলাম আমরা, যেটা আমি আর সেরেনা খুঁজে পেয়েছিলাম। প্রত্যেকটা তীরকে একবার করে ছুড়ল রামেসিস। এবার ওগুলোর মাঝে যেটা সবচেয়ে নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারল সেটাকেই বেছে নিলাম আমরা। লক্ষ্যবিন্দুর মাত্র আধ ইঞ্চি দূরে লেগেছে এই তীরটার আঘাত।
