পাথরটা সরে যাওয়ার ফলে যে গুহাটা উন্মোচিত হয়েছে তা আদতে খুব বেশি বড় নয়। ভেতরটা দেখলে প্রথমেই মনে পড়ে কোনো জাহাজের অগোছালো ক্যাপ্টেন কর্তৃক রক্ষিত গুদামঘরের কথা, যা দুই-এক শতাব্দীর মাঝে কখনো পরিষ্কার করা হয়নি। দেয়ালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছাদ সমান উঁচু স্তূপ করে রাখা হয়েছে নানা জিনিস, যেগুলোর বেশির ভাগই এখন আর চেনার উপায় নেই। কয়েকটা জিনিস যেগুলো আমরা চিনতে পারলাম সেগুলো হচ্ছে একসাথে বাঁধা তীর, হাতকুড়াল, তলোয়ার এবং অন্যান্য ধারালো অস্ত্র।
গুহার অন্যান্য জিনিসের মধ্যে আরো রয়েছে শত শত অগুরুত্বপূর্ণ জিনিস, একটার ওপর আরেকটা স্তূপ করে রাখা। তাদের ওপর পড়েছে শত বছরের ধুলোর আবরণ, সম্পূর্ণ ঢেকে দিয়েছে জিনিসগুলোর পরিচয়। এখান থেকে সব কিছু বাইরে নিয়ে যেতে হবে আমাদের, তারপর ওপর থেকে ময়লা পরিষ্কার করে পরীক্ষা করতে হবে বুঝে মনে মনে দমে গেলাম আমি। অনেক শতাব্দী আগে কোন অস্ত্রের আঘাতে টেরামেশ আহত হয়েছিল তা খুঁজে বের করা মোটেই সহজ হবে না। যদিও দীর্ঘজীবন এবং একই সাথে দেবত্বের অধিকারী আমি; কিন্তু স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে এই ক্ষেত্রে এসে আমার কোনো দক্ষতাই কাজে লাগবে বলে মনে হলো না।
লাল ডানার বুলবুলটার খোঁজে এদিক-ওদিক তাকালাম আমি। কিন্তু দেবী হলে কী হবে, মেয়েমানুষ তো। দরকারের সময় কখনোই তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
বেশ, কী আর করা। কাজ শুরু করে দিই, গলায় কিছুটা উৎসাহ আনার চেষ্টা করলাম আমি; কিন্তু খুব একটা লাভ হলো না।
মন খারাপ কোরো না, টাটা, বলল সেরেনা। সব কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগবে না আমাদের; এই ধরো বড়জোর এক মাস।
গুহার ভেতরে একবারে একজনের বেশি কাজ করার মতো জায়গা নেই। তাই রামেসিস আর আমি পালা করে ঢুকতে লাগলাম ভেতরে। অন্য দুজন প্রবেশপথের মুখে অবস্থান নিল; তারপর প্রতিটি জিনিসকে হাত বদল করে গুহার বাইরে নিয়ে রাখতে লাগল। ধীরে ধীরে দারুণ পরিশ্রমের সাথে এগোতে লাগল কাজ। নাক আর মুখের সামনে কাপড় বেঁধে নেওয়ার পরেও ধুলোয় দম আটকে আসতে লাগল আমাদের। কিছুক্ষণ পরপরই অবস্থান বদল করতে বাধ্য হলাম আমরা।
আকাশে চাঁদ উঠল একসময়, ধীর গতিতে গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে লাগল এক প্রান্ত ধরে। কিন্তু কাজ থামালাম না আমরা। মধ্যরাতের কিছু আগে গুহার ভেতর রামেসিসকে আসতে বলে বাইরে গুহার প্রবেশপথে বেরিয়ে এলাম আমি। মাথার ওপর দেয়ালের গায়ে একটা আংটার সাথে একটা মশাল ঝুলিয়ে রেখেছি এখানে, ভালোই আলো দিচ্ছে ওটা।
রামেসিসের কাছ থেকে এক এক করে বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে এসে ফাটলের কাছাকাছি দাঁড়ানো সেরেনার হাতে তুলে দিতে লাগলাম আমি। এভাবে কতক্ষণ চলল মনে নেই, তবে হঠাৎ করেই এমন একটা ঘটনা ঘটল যে একঘেয়েমি কেটে গেল আমার। প্রাচীন শুকনো চামড়ার একটা থলে আমার হাতে তুলে দিল রামেসিস। ওর হাত থেকে থলেটা নিয়ে একটু সামনে আসতেই ছিঁড়ে গেল সেটা, ভেতরের জিনিসগুলো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। বিড়বিড় করে একটা গাল দিলাম আমি, তারপর হাঁটু গেড়ে বসলাম জিনিসগুলো তোলার জন্য। থলের ভেতরে ছিল ব্রোঞ্জের তৈরি চারটি তীরের ফলা। কিন্তু ফলাগুলো তোলার জন্য হাত বাড়িয়েও থমকে গেলাম আমি। চারটির মধ্যে তিনটি ফলা কালের আবর্তনে ক্ষয়ে গেছে, এখন আর প্রায় চেনারই উপায় নেই সেগুলোকে। কিন্তু চতুর্থ ফলাটা এমনভাবে ঝকঝক করছে, যেন এইমাত্র বেরিয়ে এলো কামারের হাতুড়ির নিচ থেকে। উজ্জ্বল ধারালো শরীর ওটার, মশালের আলোতে চকচক করে উঠল।
ফলাটা তুলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম আমি। কিন্তু আমার আঙুলগুলো ওটাকে স্পর্শ করার সাথে সাথেই চমকে উঠে হাত সরিয়ে নিলাম আবার, বিস্ময়ের অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। গরম হয়ে আছে ফলাটা। তবে এত গরম নয় যে হাতে ঘঁাকা লাগবে। রামেসিসের দিকে পেছন ফিরে আছি আমি, ফলে আমার প্রতিক্রিয়াটা দেখতে পায়নি ও। গুহামুখে দাঁড়িয়ে আছে সেরেনা; কিন্তু এই মুহূর্তে ও আমার দিকে পেছন ফিরে আছে; গুহার বাইরে পাঠানো জিনিসগুলো সাজিয়ে রাখছে এক এক করে। কেউই। বুঝতে পারেনি যে কী আবিষ্কার করেছি আমি।
চারটি ফলাই হাতে তুলে নিলাম এবার। তবে এবার মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম বলে ফলাটার উষ্ণতা আর অবাক করতে পারল না আমাকে, বরং যেন আরাম লাগল হাতে। ফলাগুলো নিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এলাম আমি। আমাকে দেখে ক্লান্ত একটা হাসি উপহার দিল সেরেনা।
কাজ আর কত দূর বাকি? প্রশ্ন করল ও।
এই ধরো অর্ধেক কাজ বাকি এখনো, জবাব দিলাম আমি। হতাশ একটা দৃষ্টি ফুটল সেরেনার চোখে। ক্ষয় হয়ে আসা ফলা তিনটি ওর হাতে দিলাম আমি। ফলাগুলো নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে যাবে ও; কিন্তু তার আগেই বাধা দিলাম আবার। আর একটা আছে, বললাম আমি। ঘুরে দাঁড়াল সেরেনা, হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। চতুর্থ ফলাটা ওর বাড়ানো হাতের তালুতে রাখলাম আমি। সাথে সাথে এমনভাবে ঝাঁকি খেল ও, যেন বোলতায় হুল ফুটিয়েছে ওর হাতে। অন্য হাতে রাখা বাকি তিনটি ফলা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিল এবার, তারপর দুই হাতে এমনভাবে চতুর্থ ফলাটাকে চেপে ধরল যেন ওটা সাধারণ কোনো তীরের মাথা নয় বরং বহুমূল্য কোনো রত্ন।
