না, কিছুই পাইনি, জবাব দিল রামেসিস। তোমার কী খবর?
আমিও একই জবাব দিতে যাব, এই সময় কী মনে হতে ওপরে তাকালাম। এবার এমন একটা জিনিস চোখে পড়ল আমার, যেটা এক মুহূর্ত আগেও দেখতে পাইনি। এই দেয়ালটার ওপাশে পাহাড়ের গায়ে একটা ফাটল দেখা যাচ্ছে। ওটা একবার পরীক্ষা করে দেখা দরকার। তাড়াতাড়ি আমার পাশে চলে এলো দুজন। এবার ওদেরকে ফাটলটা আঙুল দিয়ে দেখালাম আমি। পাহাড়ের গায়ে জন্মানো ঘন জঙ্গল আর ঝোঁপের কারণে প্রায় ঢেকে গেছে ফাটলের মুখটা। বোঝাই যাচ্ছে যে বহু বছরের মধ্যে কোনো মানুষ বা জীবজন্তু এই পথ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেনি।
পাহাড়ের গায়ে ফাটলটা খুব বেশি চওড়া নয় অবশ্য, স্রেফ তিনজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারবে এমন। কোমর থেকে তলোয়ারটা বের করে আনলাম আমি, তারপর প্রবেশপথের মুখে এসে জমা ঝোঁপঝাড় আর গাছের ডালপালা কেটে পরিষ্কার করতে শুরু করলাম। রামেসিসও হাত লাগাল আমার সাথে। সেরেনা দাঁড়িয়ে রইল পেছনে, উৎসাহ দিতে লাগল আমাদের। মাথার ওপর ছোট্ট বুলবুল পাখিটা উত্তেজিত ভঙ্গিতে ডাকাডাকি করতে করতে এই ঝোঁপ থেকে ওই ঝোপে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফাটলের মুখটা পরিষ্কার হয়ে আসতেই ভেতরে ঢুকলাম আমরা। প্রায় বিশ কদমের মতো এগোনোনার পর বিশাল গোলাকার একটা পাথর চোখে পড়ল। গুহার প্রবেশপথকে সম্পূর্ণ আটকে রেখেছে পাথরটা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে বহু বছর ধরে এই একই জায়গায় রয়েছে ওটা, সময়টা এমনকি কয়েক শতাব্দীও হতে পারে। পাথরের সামনে জন্মানো ঝোঁপঝাড়গুলো পরিষ্কার করলাম আমরা। তারপর সেরেনার দিকে তাকালাম। প্রশ্ন করলাম, গোপন সংকেতটা মনে আছে তো?
অবশ্যই মনে আছে, জবাব দিল। সংকেতটা হচ্ছে, হে জোড়া মুখ—
দাঁড়াও! গলাটা সামান্য চড়িয়ে ওকে বাধা দিলাম আমি। আমরা দুজনই প্রস্তুত হওয়ার আগে কথাগুলো উচ্চারণ করার দরকার নেই।
এই কথাটা ধমক দিয়ে বলার কোনো দরকার ছিল না, অভিমানের সুরে বলল সেরেনা।
তোমার গলা টিপে ধরার চাইতে ধমক দেওয়াই উত্তম, তাই না? বললাম আমি।
এভাবে বললে অবশ্য তোমার সাথে একমত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না, ক্ষমা প্রার্থনার হাসি ফুটল সেরেনার ঠোঁটে। তারপর হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। সেটা ধরলাম আমি, তারপর বিশাল পাথরটার সামনে এসে দাঁড়ালাম পাশাপাশি। রামেসিস রইল আমাদের পেছনে।
বুলবুলটাও কখন যেন গুহার ভেতর এসে ঢুকেছে। এবার উড়ে এসে বিশাল পাথরটার ওপরে বসল সে। লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিলাম আমি। কেন জানি না হঠাৎ করেই কিছুটা ভয় ভয় লাগতে শুরু করেছে। সেরেনার হাতে একবার চাপ দিলাম, তারপর দুজন একসাথে মুখ খুললাম।
হে জোড়া মুখবিশিষ্ট জ্যানাস খুলে যাও! একই সাথে বলে উঠলাম আমরা, তারপর থেমে গেলাম।
হে জোড়া মুখবিশিষ্ট জ্যানাস, খুলে যাও! আরো একবার একই সাথে উচ্চারণ করলাম কথাটা। তারপর আবার লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে তৃতীয় ও শেষবারের মতো বলে উঠলাম: হে জোড়া মুখবিশিষ্ট জ্যানাস, খুলে যাও!
মনে হলো যেন বাজ পড়ল গুহার ভেতর। কান ফাটানো শব্দের সাথে সাথে পাথরটা টুকরো টুকরো হয়ে গেল, হাজারটা ছোট-বড় পাথরের ছিন্নভিন্ন টুকরো ছড়িয়ে গেল এদিক-ওদিক। লাল ডানার বুলবুলটা সরাসরি পাথরের ওপর বসে ছিল। বিস্ফোরণের ধাক্কায় সই করে ওপরে উঠে গেল তার ছোট্ট শরীরটা, ভয়ে আর আতঙ্কে তীক্ষ্ণ স্বরে চিৎকার করে উঠল সে। যদিও আমার নিজের অবস্থাও খুব একটা সুবিধার নয়, তবু মনে মনে কৃতজ্ঞ বোধ করলাম এই ভেবে যে, ইনানা অমর এবং পার্থিব, কোনো আঘাতে তার কোনো ক্ষতি হতে পারে না। তা না হলে এই বিস্ফোরণের ফলে দারুণ আঘাত পেতে পারত সে। সেরেনা আর আমি নিরাপদ দূরত্বেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, তা সত্ত্বেও উড়ে গিয়ে পড়লাম পেছনে। অজস্র পাথরের টুকরো আর ধুলোবালিতে ভরে গেল আমাদের শরীর। রামেসিস ছিল আমাদের চাইতে দ্বিগুণ দূরত্বে; কিন্তু ও একজন সাধারণ মানুষ মাত্র। ফলে সেরেনা এবং আমার চাইতে অনেক বেশি আঘাত সহ্য করতে হলো ওকে। সেরেনা অবশ্য প্রায় সাথে সাথেই ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, যেটা নিঃসন্দেহে যে কাউকে আবেগপ্রবণ করে তোলার জন্য যথেষ্ট। তবে আমার কেন যেন মনে হলো যে ইচ্ছে করেই একটু বেশি অভিনয় করছে রামেসিস। যাই হোক ওদেরকে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকার সুযোগ দিয়ে পাথরের ধ্বংসস্তূপটার ওপর দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম আমি। গুহার মুখটা খুলে গেছে এখন, এবার উঁকি দিলাম তার ভেতরে।
দেখে মনে হলো এটাই হেকাটির সেই গুহা, যেখানে আরো অনেকগুলো অস্ত্রের সঙ্গে সেই বিশেষ অস্ত্রটাকেও লুকিয়ে রেখেছে সে। ওটাকে খুঁজতেই এখানে এসেছি আমরা, ওই অস্ত্রের সাহায্যেই ঘায়েল করা যাবে টেরামেশকে। কিন্তু বিস্ফোরণের ফলে ধুলোর মেঘ উড়তে শুরু করেছে গুহার ভেতরে, এর মাঝ দিয়ে কোনো কিছু পরিষ্কারভাবে দেখতে পাওয়া অসম্ভব। সব কিছু ঝাপসা হয়ে আছে এখন। তাই দারুণ অস্থির হয়ে ওঠা সত্ত্বেও ধৈর্য ধরতে হলো আমাদের তিনজনকে। ধুলোর মেঘ মেঝেতে নেমে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমরা। এরই মাঝে কখন যেন পাহাড়ের ওপাশে ডুব দিল সূর্য।
সৌভাগ্যক্রমে শুকনো নলখাগড়া আর জ্বালানি কাঠ দিয়ে তৈরি অনেকগুলো মশাল নিয়ে এসেছিলাম আমি। এবার সেগুলো থেকে তিনটে মশাল চকমকির সাহায্যে জ্বালানো হলো, তারপর সেগুলো হাতে নিয়ে আবার ফিরে এলাম গুহার কাছে। মশালের আলোতে ভেতরে প্রবেশ করলাম আমরা।
