তাহলে কখন রওনা দিচ্ছ তোমরা?
ঘোড়াগুলো ক্লান্ত হয়ে গেছে। আমাদের নিজেদের অবস্থাও খুব একটা ভালো না। তাই ঠিক করেছি আজ রাতটা এখানেই বিশ্রাম নেব, তারপর কাল ভোরে আলো ফোঁটার সাথে সাথে রওনা দেব, জবাব দিলাম আমি।
গন্তব্যে পৌঁছেই আমাকে দেখতে পাবে তুমি, প্রতিশ্রুতি দিল ইনান, তারপর যেন মরীচিৎকার মতো মিলিয়ে গেল বাতাসে।
*
পরদিন সকালে সূর্য ওঠারও আগে তান্তিকা নদী ছেড়ে রওনা দিলাম আমরা, এগিয়ে চললাম সমভূমি ধরে। যাত্রাপথের প্রথম দিকে আমাদের সঙ্গী হলো হাজারে হাজারে পরিযায়ী গ্যাজেল হরিণ। পঁাচানো বাঁশির মতো শিং এদের, মুখে ডোরাকাটা বাদামি দাগ। আকারে ছোটখাটো, লাফিয়ে লাফিয়ে চলাচল করে মরুভূমির ওপর দিয়ে। ওদের সৌন্দর্য দেখে একটা গান রচনা করে ফেলল সেরেনা। তারপর গানটা গাইতে শুরু করতেই কান খাড়া করে শুনতে লাগল হরিণগুলো, বড় বড় উজ্জ্বল কালো চোখগুলো অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। সেরেনার মাঝে দেবত্বের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে ওরা, কারণ ঘোড়া নিয়ে ওকে এগিয়ে আসতে দেখেও কেউ জায়গা ছেড়ে নড়ল না। একসময় সেরেনা ওদের এত কাছে পৌঁছে গেল, যেন হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে পারবে। গান শেষ হতেই দলবেঁধে দৌড়াতে শুরু করল হরিণগুলো, নিমেষের মাঝে চলে গেল বহু দূরে। খুরের ঘায়ে ধুলো উড়িয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দিগন্তের ওপাশে এমনভাবে হারিয়ে গেল, যেন ছিলই না কখনো।
মরুভূমিতে যেমনটা হয় সাধারণত, তিন পাহাড়ের চূড়াকে যতটা দূরত্বে ভেবেছিলাম তার চাইতে অনেক দূরে অবস্থিত ওগুলো। মাঝখানের পাহাড়টার গোড়ায় যখন আমরা পৌঁছলাম তখন প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট জায়গায় এসে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলাম আমরা, মুখ তুলে চূড়ার দিকে চাইলাম। যা ভেবেছিলাম তার চাইতে পাহাড়টা অনেক উঁচুও বটে।
ঢালের নিচের দিকে ঘন সবুজ ঘাস জন্মেছে। তাই সেখানেই আমাদের ছোট্ট তাঁবুটা খাটালাম আমরা। তারপর ঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দিলাম ঘুরে ঘুরে ঘাস খেতে।
তারপর তিনজন মিলে ঢালের নিচের দিকটা তল্লাশি করতে বের হলাম। এমন কিছু খুঁজছি, যা দেখে হেকাটির গুহার অবস্থান সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। ইনানাকে কোথায় পাওয়া যাবে সে সম্পর্কে অবশ্য ইতোমধ্যে একটা আন্দাজ করে ফেলেছি আমি। আমার জানা আছে, তিনজন একসাথে থাকলে দেখা দিতে চাইবে না সে। তাই রামেসিস আর সেরেনাকে উল্টো দিকে পাঠিয়ে দিলাম। তারপর একা একা এগিয়ে গেলাম ঢালের উত্তর দিকটায়। এবং এখানেই ইনানাকে খুঁজে পাওয়া গেল, বা বলা যায় তার কণ্ঠস্বর শোনা গেল। একটা পাথরের ওপর বসে বসে পালকগুলো পরিপাটি করছে সে, সেইসাথে মাঝে মাঝে কিচিরমিচির করে উঠছে মিষ্টি গলায়। তার পাশে পাথরটার ওপর গিয়ে বসলাম আমি। আরো কিছুক্ষণ মিহি সুরে গান গাইল সে, তারপর কথা বলে উঠল আমাকে উদ্দেশ্য করে।
হেকাটি এখানে এসেছিল, বলল সে। তোমাদের আসার কথা জানে সে। তার ইচ্ছে ছিল ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবে তোমাদের। গুহার মুখটা নিজে পাহারা দিয়ে গোপন করে রাখতে চেয়েছিল সে; কিন্তু আমি তাকে ভাগিয়ে দিয়েছি।
খবরটা শুনে চমকে গেলাম আমি। অনুভব করলাম গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে; যেন একগাদা বিষাক্ত পোকা হেঁটে বেড়াচ্ছে সেখানে। এদিক-ওদিক তাকালাম তাড়াতাড়ি। মনে হলো এই বুঝি গোখরা সাপের মতো ফণা তুলে হাজির হবে হেকাটি, হিসিয়ে উঠবে আমার দিকে তাকিয়ে। এমনটা করার ক্ষমতা আছে তোমার? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
আমি হচ্ছি আর্টেমিস, জিউসের কন্যা, একেবারে স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল ইনানা। আমার সামনে পড়ে শেষ পর্যন্ত ভয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে পালিয়ে গেছে হেকাটি। তারপর হঠাৎ লাফ দিয়ে আমার কাঁধের ওপর উঠে বসল সে। আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, একটা জিনিস সব সময় মনে রাখবে, টাইটা। তুমি আমার অন্যতম প্রিয় মানুষগুলোর একজন। আর সে জন্যই তোমাকে নিয়ে মাঝে মাঝে মজা করি আমি। এসো এখন, তোমাকে ওই ডাইনি বুড়ির লুকানো গুহাটার পথ দেখিয়ে দিই।
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলাম আমরা। আমার কাঁধে বসে মিষ্টি সুরে কিচিরমিচির করতে লাগল ইনানা, মাঝে মাঝে আবার আমাকে পথের নির্দেশ বলে দিতে লাগল। পাহাড়ের গোড়া থেকে একটুখানি ওপরেই পাথরের একটা দেয়াল তৈরি হয়েছে। এখানে এসে হঠাৎ আমাকে একটু থামতে বলল ইনানা।
কেন? প্রশ্ন করলাম আমি।
বাকি দুজন ফিরে আসছে, আমাকে জানাল সে। যদিও ব্যাপারটা সে কীভাবে বুঝল আমার জানা নেই, তবে এ নিয়ে আর তর্ক না করাই ভালো হবে বলে মনে হলো আমার। এবং সত্যিই কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেরেনার সুরেলা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম আমি, এবং তার সাথে রামেসিসের অপেক্ষাকৃত ভারী গলা। নিজেদের মাঝে কথা বলতে বলতে এদিকেই আসছে ওরা। কাছাকাছি এগিয়ে আসার সাথে সাথে আরো জোরালো হয়ে উঠতে লাগল ওদের কণ্ঠস্বর। এবার আমার কাধ ছেড়ে উড়ে গিয়ে দেয়ালটার ওপরে গিয়ে বসল ইনানা। আর সেই একই মুহূর্তে পাথুরে দেয়ালের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এলো রামেসিস আর সেরেনা, হাত নাড়ল আমাকে দেখতে পেয়ে। ইনানার সময়জ্ঞান একেবারে নিখুঁত, ওরা দুজন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে দেয়ালের ওপর বসে থাকা ছোট্ট সুন্দর পাখিটার সাথে আমার কোনো রকম সম্পর্ক থাকতে পারে। কিছু পেলে? কাছে আসতে ওদের জিজ্ঞেস করলাম আমি।
