সৌভাগ্যক্রমে আমারোদা মরুভূমির অবস্থান নীলের পুব তীরেই। তাই টেরামেশের মোকাবিলা করার মতো প্রস্তুতি ছাড়াই আরো একবার নদী পার হয়ে তার সামনে পড়ার ঝুঁকি নিতে হচ্ছে না আমাদের। তিনজনের বেশি আর কাউকে সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না আমরা, সাথে নিলাম সর্বোচ্চ দশ দিনের রসদ। খাওয়ার পানির কোনো অসুবিধা হবে না বলে আশা করা যায়। প্রথমে নীলনদের তীর ঘেঁষে এগিয়ে যাব আমরা, তারপর তান্তিকা নদীর মুখে পৌঁছে সেখান থেকে গুহা পর্যন্ত অনুসরণ করব তান্তিকার গতিপথ। হুরোতাস এবং হুইকে অবশ্য আমাদের অভিযানের কথা জানাতেই হলো। সব শুনে ওরাও আমাদের সাথে যেতে চাইল। তবে আমার সবটুকু বুদ্ধি খাঁটিয়ে ওদের বিরত করলাম আমি। বললাম যে, সেনাবাহিনীর সাথে থাকাটাই এখন ওদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য, কারণ ওরা না থাকলে ষোলোজন মিত্র রাজার মাঝে বিবাদ বাধতে একটুও সময় লাগবে না। হুরোতাস এবং হুই উপস্থিত থাকার পরেও তাদের সবাইকে সামলে রাখতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। কেউ কেউ তো ইতোমধ্যে টেরামেশের তীরবৃষ্টির মুখে ভয় পেয়ে মিশর আক্রমণ বাদ দিয়ে আকারে ইঙ্গিতে বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা বলতে শুরু করেছে।
সঙ্গে খুব বেশি বোঝা নেই আমাদের, তাই অত্যন্ত দ্রুত পথ চলতে পারলাম। শিবির ছেড়ে রওনা দেওয়ার পর চতুর্থ দিন বিকেলে তান্তিকা নদীর মুখে পৌঁছে গেলাম আমরা। ইনানার সাথে নদীর এই বিশেষ জায়গাতেই দেখা হওয়ার কথা ছিল আমার। তাই এবার দুই সঙ্গীকে তাঁবু খাটানোর কাজে লাগিয়ে দিলাম আমি, সেইসাথে ঘোড়াগুলোকে দানাপানি খাওয়াতে বললাম। নীলের পানি তুলে এনে ঘোড়াগুলোকে দিল ওরা। আর আমি সেই ফাঁকে চললাম নদীর মুখ লক্ষ্য করে। ভাবছি এবার কোনো ছদ্মবেশ ধরে আসবে দেবী?
আবু নাসকোস ছেড়ে রওনা দেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত একবারও গোসল করার সুযোগ হয়নি আমার। এবার তাই প্রথম সুযোগেই গোসলটা সেরে নিলাম। গোসলের পর নদীর পাশে একটা উষ্ণ পাথরে বসে ইনানার দেখা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম আমি, একই সাথে হালকা বাতাসে শুকিয়ে নিচ্ছি ভেজা শরীর। ইতোমধ্যে একটা বড়সড় সবুজ ব্যাঙ, একটা ছোট বাদামি সাপ এবং বেশ কিছু অন্যান্য পোকামাকড় এবং বন্য প্রাণীকে ইনানা ভেবে ভুল করেছি আমি। শেষ পর্যন্ত মরুভূমির স্তব্ধতা ধীরে ধীরে ঘিরে ধরতে লাগল আমাকে। মনে পড়ল নীলনদের তীরে অবস্থিত আমাদের শিবির ছেড়ে আসার পর ঘুমোনোর সুযোগ খুব কমই পেয়েছি।
শেষবার যখন আমাদের দেখা হলো তখন ধৈর্য নিয়ে একটা কথা বলেছিলাম আমি, মনে আছে? হঠাৎ করেই বলে উঠল সে। দেখা যাচ্ছে আগের চাইতে বেশ উন্নতি হয়েছে তোমার। ব্যাপারটা দেখে খুশি হলাম।
চমকে ঝিমুনি থেকে জেগে উঠলাম আমি, এদিক-ওদিক তাকালাম। আমার হাতের কাছেই পানির ওপর ভাসছে একটা ছোট্ট কচ্ছপ। আমি তো ভেবেছিলাম আরেকটু উষ্ণ রক্তের, আরেকটু সুন্দর কোনো প্রাণীর বেশ ধরে আসবে তুমি, বললাম আমি। পাল্টা জবাব দিতে আমিও কম যাই না।
আরো সুন্দর কোনো প্রাণী মানে নিশ্চয়ই কোমল পালকে ঢাকা কোনো পাখির কথা বলছ? আবার বলে উঠল ইনানা; কিন্তু এবার আমার পেছন থেকে ভেসে এলো তার কণ্ঠ। সাথে সাথে ঘাড় ঘোরালাম আমি। দেখলাম কাছেই একটা পাথরের ওপর বসে আছে সুন্দর ছোট্ট একটা মরু বুলবুল। মাখনরঙা পালকে ঢাকা সরু বুক পাখাগুলো গাঢ় লালচে-বাদামি রঙের। আমার চোখের সামনেই একটা পাখা ছড়িয়ে দিয়ে ঠোঁট দিয়ে পালকগুলো পরিপাটি করতে শুরু করল সে।
রংটা খুব মানিয়েছে তোমাকে, প্রিয়তমা, তাকে বললাম আমি।
পছন্দ হয়েছে তোমার? কী যে ভালো লাগল শুনে, পাখির মতোই কিচিরমিচির করে উঠল সে। না হেসে পারলাম না এবার।
সুন্দর লাগছে তোমাকে বরাবরের মতোই, হাসতে হাসতে জবাব দিলাম আমি। কিন্তু এখন যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলতে হবে তোমার সাথে। তোমাকে পরিচিত চেহারায় না দেখতে পেলে কেমন অস্বস্তি লাগবে আমার।
তাহলে এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টিটা অন্যদিকে ফেরাও, বলল সে। বাধ্য ছেলের মতো চোখ ঘুরিয়ে পানিতে ভাসতে থাকা কচ্ছপটার দিকে তাকালাম আমি। ঠিক আছে, এবার তাকাতে পারো।
আবার ঘাড় ঘোরালাম। দেখলাম সেই পরিচিত মোহময়ী ইনানা বসে আছে। পাথরটার ওপর। এক গোছা চুল নিয়ে একবার আঙুলে পেঁচাল সে, তারপর উঠে দাঁড়াল। পরনের পোশাকটার নিচের অংশ ফুলে উঠল বাতাসে। তারপর এগিয়ে এসে বসে পড়ল আমার পাশে, হাঁটুগুলো ভাঁজ করে বুকের কাছে তুলে নিয়ে এলো।
বলো কী জানতে চাও, আমাকে আহ্বান জানাল ইনানা। বুঝতে পারছি প্রশ্ন করার জন্য ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছ তুমি।
এত সহজেই বুঝে ফেলা যায় আমাকে?
তুমি নিজেও জানো না কাজটা কত সহজ, প্রিয় টাইটা।
বেশ। তাহলে বলো, হেকাটির গুহা এখান থেকে কোন দিকে?
সরাসরি তোমার নাক বরাবর দিগন্তের দিকে তাকাও। কী দেখতে পাচ্ছ?
আকাশের গায়ে শুয়ে থাকা তিনটি পাহাড়ের চূড়া দেখতে পাচ্ছি।
ঠিক মাঝখানের পাহাড়টার গোড়ায় রয়েছে সেই গুহার প্রবেশপথ, যা তুমি খুঁজছ।
ভেতরে ঢোকার জন্য গোপন সংকেতটা কী?
এই কথাটা তিনবার বলতে হবে-হে জোড়া মুখবিশিষ্ট জ্যানাস, খুলে যাও!
সহজেই মনে রাখা যাবে কথাটা, আনমনে মাথা ঝাঁকালাম আমি। জ্যানাস হচ্ছে প্রবেশপথ এবং দরজার পৃষ্ঠপোষক দেবতার নাম।
