হ্যাঁ। কিন্তু সেই গুহার অবস্থান লুকিয়ে রাখার জন্য হেকাটি নিজে এক গোপন জাদু প্রয়োগ করেছে সেখানে।
সেই জাদুকে কীভাবে ভাঙতে হবে তা নিশ্চয়ই জানা আছে তোমার?
এমন কিছুই নেই আমি জানি না, গম্ভীর গলায় বলে উঠল দেবী। ভেতরে ভেতরে বেশ চমকে গেলাম আমি। এমন কিছু দাবি করার আগে, এমনকি আমাকেও বেশ দ্বিধা করতে হবে। অবশ্য এটাও ঠিক যে ইনানার বুদ্ধি আমার চাইতে কোনো অংশে কম নয়, বরং অনেক দিক দিয়েই বেশি।
তাহলে আমাকে বলল, অনুনয় করলাম আমি।
তার আগে তোমাকে সাহায্য করতে পারবে এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে তোমার।
অন্য কারো সাহায্য কেন লাগবে আমার? প্রতিবাদ জানালাম আমি।
কারণ হেকাটি এমন ব্যবস্থা করেছে যে, দেবত্বের অধিকারী এমন কমপক্ষে দুজন মানুষ যদি একই সঙ্গে ওই মন্ত্র উচ্চারণ না করে তাহলে খুলবে না গুহার দরজা। আর শুধু দরজা খুললেই হবে না, কারণ ব্যাপারটাকে আরো জটিল করে তোলার জন্য গুহার মাঝে অন্তত কয়েক শ নানা রকমের অস্ত্র রেখে দিয়েছে হেকাটি। ওগুলোর মাঝ থেকে আসল অস্ত্রটা খুঁজে বের করতে হবে তোমাকে।
ব্যস, এটুকুই? ব্যঙ্গ ফুটে উঠল আমার গলায়।
না, আরো আছে। হেকাটির ছেলে টেরামেশের বিরুদ্ধে কেবল একজন রাজাই অস্ত্র ধরতে পারবে। তার শরীরে যে দেবত্ব থাকতে হবে এমন নয়; কিন্তু আঘাত করার সময় একটি নির্দিষ্ট রণহুংকার উচ্চারণ করতে হবে তাকে। তা হলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে তার আঘাত।
এই সব যোগ্যতা পূরণের ক্ষমতা রাখে এমন সঙ্গী আমি খুঁজে বের করতে পারব বলেই আমার বিশ্বাস।
মাথা ঝাঁকাল ইনানা। তোমার মতো কারো জন্য অনেক শতাব্দী ধরে অপেক্ষা করছি আমি। অসংখ্য নিরপরাধ প্রাণকে কেড়ে নিয়েছে হেকাটির সন্তান টেরামেশ। কিন্তু এখন অবশেষে তার অন্তিম সময় উপস্থিত হয়েছে।
তোমার কথাকে সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করছি আমি। কিন্তু যাওয়ার আগে তোমার সাথে এই দ্বীপগুলোর ব্যাপারে আরেকটু আলোচনা করা দরকার। বলে ইনানা যেখানে বসে আছে সেই পাথরগুলোর ওপর চাপড় মারলাম আমি। এই পথটা কোথায় গেছে?
তোমার জন্ম তো এক শতাব্দীরও বেশি আগে। এত বয়স হলো তোমার, এর মাঝে নিশ্চয়ই একটু হলেও ধৈর্য ধরতে শিখেছ? দুষ্টুমির স্বরে বলল সে।
উঁহু, মোটেই না, জবাব দিলাম আমি। কিন্তু আমার কথায় কর্ণপাত না করে আরো একবার হাওয়ায় মিলিয়ে গেল সে।
*
দ্বীপ থেকে নীলনদের পুব তীরে সাঁতার কেটে ফিরে আসতে বেশ অনেকটা সময় লেগে গেল। কিন্তু অত্যন্ত দ্রুত কেটে গেল সময়টা, কারণ ইনানার সাথে কথাবার্তা বলার পর চিন্তাভাবনার জন্য বেশ কিছু খোরাক পেয়েছি আমি। শেষ পর্যন্ত যখন তীরে এসে উঠলাম তখনো অন্ধকার কাটেনি। শরীর মোছার জন্য সময় নষ্ট করলাম না মোটেই, বরং এক দৌড়ে হাজির হলাম রামেসিসের তাঁবুর সামনে। রাজদম্পতির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার অজুহাত দিয়ে আমাকে থামাতে চেষ্টা করল প্রহরীরা। কিন্তু বেশি কিছু বলার আগেই এক হাত তুলে তাদের মুখ বন্ধ করে দিলাম আমি।
শোনো, গাধার দল! সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল সবাই। এবং সাথে সাথেই তাঁবুর ভেতর থেকে চাপা হাসি আর উচ্ছ্বসিত গলার আওয়াজ ভেসে এলো। এই যদি হয় তাদের ঘুম তাহলে এমন ঘুম কীভাবে ঘুমোতে হয় তা এখনো শেখা হয়নি আমার, প্রহরীদের উদ্দেশ্য করে বললাম আমি। তারপর গলা চড়িয়ে বলে উঠলাম, মহামান্য ফারাও, আপনি জেগে আছেন?
সাথে সাথেই একটা নারীকণ্ঠে আমার জিজ্ঞাসার জবাব এলো: টাটা! এসেছ তুমি? এইমাত্র শেষ হলো আমার আর রামেসিসের। তুমি ছিলে কোথায় সারা রাত? গতকাল রাতের ভোজেও তোমাকে দেখিনি আমরা। ভেতরে এসো! ভেতরে এসো! দেখে যাও রামেসিস কী এনেছে আমার জন্য।
রাজদম্পতির শোয়ার তাঁবুতে ঢুকতেই দুজন বিছানার ওপর সরে বসে জায়গা করে দিল আমার জন্য। ধমকের সুরে বলে উঠল সেরেনা, শরীর এত ঠাণ্ডা হয়ে আছে কেন তোমার? মনে হচ্ছে যেন মধ্য শীতের রাতে ট্যাগেটাস পর্বতের মাথায় গিয়ে শুয়ে ছিলে? দীর্ঘ সময় সাঁতার কেটে আসার ফলে শীতে কাঁপছি আমি, দুজনের চাপিয়ে দেওয়া উটের চামড়ার তৈরি কম্বলগুলো তাই কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করলাম।
বেশ কিছুক্ষণ এটা-সেটা নিয়ে আলাপ করলাম আমরা। তারপর পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে দুজনকে খুলে বললাম দাগীমুখো শয়তানটাকে পরাজিত করার জন্য আমার সাজানো পরিকল্পনার কথা। তবে দেবী ইনানার সাথে আমার যে বিশেষ একটা সম্পর্ক রয়েছে সেটার ব্যাপারে ওদের বা আর কাউকে কিছু বলার উপায় নেই আমার।
তাই ওদের জন্য আগেই একটা গল্প বানিয়ে রেখেছি আমি। সেই গল্পে দেবী ইনানা হচ্ছে একজন জ্ঞানী বৃদ্ধা মহিলা, যে মাঝে মাঝেই আমার সাথে দেখা করতে আসে। টেরামেশের জন্ম এবং তাকে পরাজিত করার উপায় সম্পর্কে আমার গল্পটা দারুণ মনোযোগের সাথে শুনল ওরা। গল্প থেকে শুধু সেরেনার দেবত্ব সম্পর্কিত কথাগুলো বাদ দিয়ে গেলাম আমি। ব্যাপারটা এখনো ও নিজেও জানে না এবং না জেনেই বরং ভালো আছে। আমার গল্প যখন শেষ হলো তখন ওরাও আমার মতো অভিযানে বের হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। পারলে এখনই রওনা দেয় আমারোদা মরুভূমির উদ্দেশ্যে, খুঁজে নিয়ে আসে টেরামেশকে হত্যা করার সেই অব্যর্থ অস্ত্র। দিনের বাকি সময়টা আমাদের কেটে গেল এই অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিতে নিতে।
