সুড়ঙ্গটা অন্য কোনো দিকে মোড় নিয়েছে কি না সেটাও বোঝার চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু দেয়ালের গায়ে সেই টালির সারি ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া গেল না। এই টালিগুলোতে যে প্রাণীর ছবি আঁকা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে ভোদড়। মাছ সুড়ঙ্গ, পাখি সুড়ঙ্গ এবং ভেঁদড় সুড়ঙ্গ। কিন্তু কোনো সুড়ঙ্গ ধরেই তো বেশি দূর এগোনোর উপায় নেই।
রেগেমেগে দেবী ইনানাকে উদ্দেশ্য করে একটা গালি ছুড়লাম আমি, কারণ ইদানীং মনে হচ্ছে আমাকে ভুলেই গেছে সে। মনের ঝাল মেটাতে একটা লাথি মারলাম সুড়ঙ্গের ভেতর জমে থাকা আবর্জনার স্তূপের গায়ে। কিন্তু কাজটা ভুল হলো, কারণ দারুণ ব্যথা লাগল পায়ে। মনে হলো দুই-একটা আঙুল বোধ হয় ভেঙেই গেছে। তাড়াতাড়ি বসে আহত পা-টা মালিশ করতে শুরু করলাম। সৌভাগ্যক্রমে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি আমার পায়ের আঙুলে। এবার সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে উঠে এলাম সুড়ঙ্গের ওপরে।
কে যেন কিছু একটা বলল আমার নামে?
পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বরটা শুনতে পেয়েই অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করল আমার ভেতরে। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলাম সুড়ঙ্গের কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে দেবী। বরাবরের মতোই অনিন্দ্যসুন্দরী লাগছে তাকে দেখতে। চাঁদের আলোয় যেন ঝিলিক দিচ্ছে তার চেহারা, সত্যি কথা বলতে গেলে চাঁদের চাইতেও উজ্জ্বল লাগছে তাকে। আগের চাইতেও যেন মনোমুগ্ধকর মোহন রূপ নিয়েছে তার হাসি।
আমার ধৃষ্টতাকে ক্ষমা করে দিও, হে পবিত্র দেবী। আসলে নিজেকে গালিগালাজ করছিলাম আমি, তোমাকে নয়। হাঁটু গেড়ে বসে সম্মান জানানো উচিত আমার; কিন্তু এখনো দপদপ করছে পায়ের আঙুলটা।
তাই নাকি, প্রিয় টাইটা? এখন তাহলে আমার নামটাকে নিজের নাম হিসেবে ব্যবহার করছ তুমি? ব্যাপারটা শুনে ভালো লাগছে ঠিকই; কিন্তু ঠিক বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না।
নিজের কথার প্যাঁচে নিজেই আটকে গেছি আমি। অগত্যা হার মেনে নিলাম, তারপর বদলে ফেললাম আলাপের বিষয়বস্তু। জিউসের প্রিয়ভাজন তুমি। আমাকে বলতে পারো এই সুড়ঙ্গ কোথায় গেছে? প্রশ্ন করলাম আমি।
তোমার মন যেখানে যেতে চায় সেখানেই। এখনো আমাকে শাস্তি দিতে চাইছে সে। আপত্তি করলাম না আমি। তার পরই কোনো বিরতি না দিয়েই প্রসঙ্গ বদল করল দেবী। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যাটা বোধ হয় অন্য জায়গায়, তাই না?
কার কথা, অথবা কীসের কথা বলছ তুমি? সাবধানে প্রশ্নটা ছুড়লাম আমি।
এই দেখো, তুমি এমনকি তার নামও জানো না, মিষ্টি গলায় ঠাট্টা করে উঠল। ইনান। তার পরিচয়ই যদি না জানতে পারো তাহলে তার বিরুদ্ধে জয়লাভ করবে কীভাবে?
আমার ধারণা দাগীমুখোর কথা বলছ তুমি, তাই না? বলে উঠলাম আমি।
ওই নামে ভালো বা খারাপ কোনো ব্যক্তিকেই চিনি না আমি। আবারও হেয়ালি করছে দেবী।
কিন্তু এমন একজন ব্যক্তিকে তুমি নিশ্চয়ই চেনো, যার চেহারার সাথে এই নামের বর্ণনা মিলে যায়? যার চেহারায় সত্যিই এমন কাটাছেঁড়ার দাগ আছে? তার নাম টেরামেশ, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল ইনানা। হেকাটি এবং ফন্টাসের সন্তান সে।
হেকাটি যে জাদুবিদ্যা, প্রেতাত্মা এবং শবসাধনার দেবী তা তো সবাই জানে, বললাম আমি। কিন্তু ফন্টাস নামে কাউকে তো চিনি না আমি?
তার কথা খুব কম লোকেই জানে টাইটা, আমাকে জ্ঞান দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল ইনানা। পৃথিবীতে সবার প্রথমে যেসব মানুষের আগমন ঘটেছিল তাদের একজন সে। হেকাটিকে অপহরণ করেছিল এই ফন্টাস, ধর্ষণ করেছিল তাকে। তার ফলেই জন্ম হয় টেরামেশের। এর অর্থ হলো হেকাটের ছেলে একই সঙ্গে অর্ধ-মানুষ, অর্ধ-দেবতা। দেবত্বের চিহ্ন আছে তার শরীরে; কিন্তু সে নিজে দেবতা নয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের পিতার সাথে লড়াইয়ে নামে টেরামেশ। তার মা হেকাটির ওপর নির্যাতন করার কারণে ফন্টাসকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল সে। এক দিন এক রাত লড়াই হয় তাদের মধ্যে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের পিতাকে হত্যা করতে সক্ষম হয় সে। কিন্তু তার বদলে ফন্টাসের হাতে দারুণভাবে আহত হতে হয় তাকে। তার মাথা এবং মুখের বাম পাশে সেই আঘাতেরই চিহ্ন রয়েছে।
যদি সত্যিই ফন্টাসের কাছে এমন আঘাত পেয়ে থাকে টেরামেশ তাহলে এখনো আমাকে জ্বালানোর জন্য কীভাবে বেঁচে আছে সে?
মাথা ঝাঁকাল ইনানা, বোঝাতে চাইছে যে, আমার প্রশ্নটা আসলেই যৌক্তিক। টেরামেশ যখন মৃত্যুশয্যায় তখন তার মা হেকাটি আসে তার কাছে। ছেলের ওপর মন্ত্রশক্তি প্রয়োগ করে সে এবং মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনে তাকে। তারপর হেকাটি টেরামেশকে এই বলে আশীর্বাদ করে যে, মুখের ডান পাশে একই রকম আরেকটি আঘাত ছাড়া কিছুতেই তাকে খুন করতে পারবে না। কেউ, এবং বাম দিকের আঘাতটা যে অস্ত্র দ্বারা করা হয়েছিল শুধু সেই একই অস্ত্রের আঘাতের মাধ্যমেই তাকে হত্যা করা যাবে। আর কোনো অস্ত্রই তার ক্ষতি করতে পারবে না।
সেই অস্ত্রটা এখন কোথায়? ব্যগ্র গলায় প্রশ্ন করলাম আমি। সেটা কোথায় খুঁজে পাব আমি?
ছেলেকে সুরক্ষার জন্য দারুণ বুদ্ধি খাঁটিয়েছে হেকাটি। তান্তিকা নদীর উত্তরে আমারোদা মরুভূমির এক গুহার ভেতর অস্ত্রটা লুকিয়ে রেখেছে সে।
নদীটা আমি চিনি। নীলনদের একটা শাখা নদী ওটা। এখান থেকে খুব বেশি হলে তিন কি চারদিন লাগবে ওই নদীর কাছে পৌঁছতে, উত্তেজিত গলায় বলে উঠলাম আমি।
