হঠাৎ করেই অদ্ভুত রকমের বাস্তব একটা অনুভূতি হলো আমার। মনে হলো যেন মরে গেছি আমি, তারপর প্রবেশ করেছি স্বর্গে।
কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল হুরোতাস। মাথার আঘাতের জন্য একটা দারুণ ওষুধ আছে আমার কাছে, সেটা এবার জাদুর মতো কাজ করল। অনেক বছর আগে হিকসসদের হাত থেকে পালিয়ে রানি লসট্রিসকে নিয়ে আমি যখন নীলনদের উৎসমুখের দিকে পালিয়ে গিয়েছিলাম তখন এক হাবশি ওঝা আমাকে দিয়েছিল এই ওষুধটা।
তবে ইউনিকনে টানা রথে চড়ে ওই রহস্যময় দাগীমুখো লোকটার আগমনে আমাদের যুদ্ধপ্রস্তুতিতে বেশ ভালো রকমের একটা ছেদ পড়ল। সবাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে এখন। কেউ জানে না যে তাকে কোথা থেকে জোগাড় করেছে উটেরিক; কিন্তু এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণ হয়ে গেছে যে, নীলনদের পশ্চিম তীরে এখন শুধু তারই একচ্ছত্র রাজত্ব। অনায়াসে আমাদের সৈন্যদের বারবার প্রতিহত করছে সে। আমরা যখনই নদী পার হয়ে আবু নাসকোসে উটেরিকের দুর্গ দখল করার চেষ্টা করি না কেন ইউনিকর্ন বাহিনী নিয়ে আমাদের তাড়া করে সেই রহস্যময় তীরন্দাজ। অকল্পনীয় দক্ষতার সাথে একের পর এক তীরবর্ষণ করে সে আমাদের ওপর, ফলে পালিয়ে আসা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না আমাদের। আমাদের রথে আঘাত করেছিল এমন বেশ কয়েকটা তীর সংগ্রহ করতে পারলাম আমি, আরো কয়েকটা তীর পাওয়া গেল আমাদের লোকদের মৃতদেহের সাথে। তীরগুলো দেখতে আমাদের তীরের চাইতে খুব বেশি আলাদা কিছু নয়। কিন্তু নিজের ওই ধনুকটা দিয়ে অনায়াসে আমাদের চাইতে দ্বিগুণ দূরত্বে তীর ছুঁড়তে পারে লোকটা। বেশ কয়েকবার তাকে তীর ছুঁড়তে দেখলাম আমি। বুঝলাম এক একবারে একসাথে চার-পাঁচটা তীর ছুঁড়ে দিতে পারে সে এবং তাদের ভেতর খুব কমই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
আমাদের সৈনিকদের মাঝে সবচেয়ে সাহসী ছিল যারা তারাও এখন ধীরে ধীরে নিরাশ হয়ে পড়ছে। মিত্র রাজাদের কেউ কেউ তো বিড়বিড় করে বলে বেড়াচ্ছে যে এই অভিযান ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে, এখন এসব ঝামেলা থেকে সরে আসা উচিত। জাহাজে করে সাগর পাড়ি দিয়ে উত্তরে ফিরে যেতে চায় তারা, খুব সম্ভব নিজেদের বুড়ি মুটকি বউদের কোলে শুয়ে ঘুমাতে ইচ্ছুক।
তবে এমনকি সব সময়ের আশাবাদী আমি নিজেও যখন ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে উঠছি তখন ওদের ঠিক দোষ দেওয়া যায় না। রাতের বেলায় প্রায়ই উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখি ইদানীং, তাতে আমার প্রিয় দেবী ইনানা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে। এটা বুঝতে পারছি যে আমার প্রার্থনা এবং পুজোর কোনো জবাবই দিচ্ছে না সে। ক্ষতবিক্ষত চেহারার ওই শত্রু নিঃসন্দেহে অন্য কোনো স্থান এবং কাল থেকে উঠে এসেছে; এবং তার মোকাবিলা করতে হলে আমার ইনানার সাহায্য একান্তভাবে দরকার। ধারণা করছি যে, আবু নাসকোস বরাবর নীলনদের বুকে যে চারটে দ্বীপ রয়েছে সেগুলোকেই আপাতত নিজের বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে দেবী। তাই তাকে পেতে হলে ওখানে খুঁজতে হবে আমাকে।
*
তিন রাত পর অভিযানের ক্লান্তি থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলাম আমি। সেই দিন রাতে চাঁদ ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম, তারপর ঘুমন্ত শিবিরের মাঝ দিয়ে এগিয়ে গেলাম সামনে। প্রহরীরা জানে যে প্রায়ই রাতে এমন ঘুরে বেড়াই আমি, তাই কেউ কিছু বলল না। নীলনদের কিনারে এসে নেমে পড়লাম পানিতে, তারপর সাঁতার কাটতে শুরু করলাম। একবারও না থেমে পার হয়ে এলাম মৎস্যদ্বীপ এবং পক্ষীদ্বীপ, এবং একটু পরেই রাতের বুকে বিশাল একটা ছায়ার মতো জেগে উঠল তৃতীয় দ্বীপটা। তারার আলোতে কিছুটা আলোকিত হয়ে আছে। এখানে আগে কখনো আসিনি আমি, জায়গাটা আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। যদিও দূর থেকে প্রথম দুটো দ্বীপের মতোই মনে হচ্ছে; কিন্তু আমি আসলে জানি না যে ওখানে কী অপেক্ষা করছে আমার জন্য।
দ্বীপের কাছাকাছি চলে আসার পর হাত দিয়ে দ্বীপের গায়ে স্পর্শ করে বুঝলাম সত্যিই আগের দুটো দ্বীপের সাথে মিল আছে এটার। একই রকম খাড়া এবং উঁচু হয়ে উঠে গেছে পানি থেকে এবং অত্যন্ত দক্ষ ও সাহসী লোক ছাড়া এর গা বেয়ে ওপরে উঠতে পারবে না কেউ। তবে ব্যাপারটা আমাকে দমাতে পারল না। দ্বীপের ধার বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে খেয়াল করলাম আগের দুটো দ্বীপের তুলনায় এই দ্বীপে কালের আঁচড় যেন আরো কম পড়েছে। কয়েকটা পাথরের গায়ে তো প্রাচীন মিস্ত্রিদের বাটালির দাগও বোঝা যাচ্ছে। দ্বীপের ওপরে উঠতে বোঝা গেল একই রকমের পাথরের টুকরো সাজিয়ে তৈরি হয়েছে এই দ্বীপটাও। যদিও পরে তার ওপর বড় বড় গাছ জন্মেছে এবং তাদের শিকড়ের চাপে জায়গায় জায়গায় ফেটে গেছে পাথরের গাঁথুনি। প্রথম দুটো দ্বীপের মতো এই দ্বীপের ওপরও নানা রকম ঝোঁপঝাড় আর গাছপালায় ভর্তি।
ইতোমধ্যে দিগন্তের বেশ ওপরে উঠে এসেছে চাঁদ। পূর্ণিমা নয় আজ অর্ধেকটা চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তবে আকাশে কোনো মেঘ না থাকায় বাধা পাচ্ছে না তার আলো। ঘন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে সামনে এগিয়ে চললাম আমি। দ্বীপের ঠিক মাঝখানে এসে সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম একটা চওড়া কূপের মতো গর্ত রয়েছে এখানে, আর তার মাঝ দিয়ে নেমে গেছে একটা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত প্যাচানো সিঁড়ি। প্রাচীনরা কোন যুক্তিতে এই সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল? নদীর তলদেশে পৌঁছানোর এতই শখ হয়েছিল তাদের? তারপর বুঝতে পারলাম সুড়ঙ্গ আসলে স্রেফ একটা নাও হতে পারে। কে জানে হয়তো চারটি দ্বীপের প্রত্যেকটাতেই এমন একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। প্যাচানো সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম আমি, প্রতি মুহূর্তে ভয় পাচ্ছি যে পা পিছলে পড়ে গিয়ে ঘাড় ভাঙবে। কিন্তু কিছু দূর নামার পরেই দেখলাম শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে জমা হওয়া ময়লা-আবর্জনা জমা হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে সামনে এগোনোর পথ।
