শক্ত হও, জারাস। হুরোতাসকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য ওর মুখে থাপ্পড় মারলাম আমি। নৌকাটাকে ওই পারে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য করো আমাকে। কিন্তু মহান জিউসের দোহাই, খোলের ওপর মাথা তোলার চেষ্টা কোরো না। অবশ্য যদি চোখ বরাবর একটা তীর খাওয়ার ইচ্ছে থাকে তাহলে আলাদা কথা।
প্রাণপণে বৈঠা মেরে নৌকাটাকে মাঝ নদীতে নিয়ে এলাম আমরা, তারপর অবশেষে কমে এলো নৌকার ওপর চলমান তাণ্ডব। এবার মনে হলো যে একটু উঁকি মেরে দেখা যায় পরিস্থিতি কেমন দাঁড়িয়েছে। আশা করা যায় এই দূরত্বে এমনকি দাগীমুখোর শক্তিশালী ধনুকও তীর ছুঁড়তে পারবে না। খালের ওপর সাবধানে মুখ বের করে দেখলাম, যে তীর থেকে পালিয়ে এলাম আমরা সেখানে এখন সত্যিই কেউ নেই। শুধু আমাদের মৃত সৈন্যদের লাশ পড়ে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। দাগীমুখো আর তার ইউনিকনগুলো জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেছে আবার। জারাস আর আমি মিলে যে নৌকাটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি তার ভেতরেও আরো পাঁচটা মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। সবগুলো শরীরে বিধে আছে বেশ কয়েকটা করে তীর।
৭. আঘাত পেয়েছে হুরোতাস
মাথায় বেশ ভালোভাবেই আঘাত পেয়েছে হুরোতাস। কথা বলতে গেলে জড়িয়ে যাচ্ছে মুখ, এবং পুব তীরে পৌঁছানোর পর যখন পরিস্থিতি নিরাপদ হয়ে এলো তখনো সোজা হয়ে বসতেই পারছিল না সে। অগত্যা আমি নিজে এগিয়ে গিয়ে ওকে খোলের সাথে হেলান দিয়ে সোজা করে বসিয়ে দিলাম। কিন্তু প্রায় সাথে সাথেই আবার পড়ে গেল সে। একা একা আমার পক্ষে স্রোতের বিপরীতে এই ভারী নৌকা দাঁড় টেনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, বুঝতে পারলাম আমি। শেষ পর্যন্ত নৌকার সাথে একটা দড়ি বেঁধে নিলাম, তারপর তাই ধরে টেনে নিয়ে চললাম। অনেক সময় লেগে গেল কাজটা করতে। যখন আমাদের শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছলাম তখন নেকড়ের প্রহর শুরু হয়ে গেছে। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোরের ঠিক মাঝামাঝি সময়কে বলা হয় নেকড়ের প্রহর, এবং এই সময়ের মাঝেই বেশির ভাগ মানুষ মারা যায়। ঘুম সবচেয়ে গাঢ় হয় এই সময়ে, দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে অনেক বেশি ভয়ংকর। আর এই সময়েই ঘুমহীন ব্যক্তিদের তাড়া করে ফেরে তাদের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়। এমন একসময় যখন প্রেতাত্মা আর দানবরা হয়ে ওঠে সবেচেয়ে শক্তিশালী। নেকড়ের প্রহরেই মৃত ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে বেশি শোক করি আমরা।
তবে পৌঁছানোর পর দেখলাম আমাদের শিবিরের সবাই জেগে আছে, এবং চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে সেখানে। দাগীমুখোর আক্রমণ থেকে তিনজন পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিল, আমাদের আগেই শিবিরে ফিরে এসেছে তারা। এবং সবাইকে জানিয়েছে যে আমি এবং হুরোতাসসহ আমাদের দলের প্রত্যেকে মারা পড়েছে এক ভয়ংকর তীরন্দাজের আক্রমণে। ফলে তেহুতি ও সেরেনাসহ রাজপরিবারের নারী সদস্যরা ষোলোজন রাজা এবং তাদের দরবার, সেইসাথে আমাদের পুরো সেনাবাহিনীর মাঝে নেমে এসেছে তীব্র শোকের ছায়া। সূর্য ডোবার পর থেকেই মৃত্যুদেবতার প্রতি উৎসর্গ করে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে শিবিরে, সেইসাথে মৃত আত্মাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গাওয়া হচ্ছে শোকগাথা।
শিবিরের মাঝে সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য খালি মদের বোতল। বোঝা গেল এগুলোর সাহায্যেই শোক ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে সবাই। পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফালি ফালি করে ফেলেছে মেয়েরা, আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করেছে নিজেদের চেহারা। মাটিতে পা ঠুকে আর বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ করেছে পুরুষরা, সেইসাথে শপথ নিয়েছে প্রতিশোধের। আমাদের প্রত্যেকের প্রাণের বদলে শত্রুপক্ষের এক শ জনকে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা করেছে তারা।
নেকড়ের প্রহর শুরু হওয়ার সাথে সাথে যখন আকাশের সর্বোচ্চ অবস্থানে এসে পৌঁছায় ইনানার তিনটে তারা; ঠিক সেই সময় অন্ধকারের মাঝ থেকে শেষকৃত্যের আগুনের আলোতে এসে দাঁড়ালাম আমি। আমার বাহুতে ভর দিয়ে রয়েছে প্রায় অচেতন রাজা হুরোতাস। ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে আমাদের পোশাক, কাদাপানি মেখে একাকার। যে কারো ধারণা হতে পারে যে কবর থেকে উঠে এসেছি আমরা। কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে আমাদের চেহারা, চোখগুলো বিস্ফারিত; যেন পাতাল এবং মৃত্যুর দেবতা হেডিসের প্রবেশদ্বার পেরিয়ে এসেছি আমরা।
আমাদের দেখতে পাওয়ার সাথে সাথে মৃত্যুর মতোই নীরবতা ভর করল সবার ওপর। ভয়ে পিছিয়ে গেল সবাই, ধরেই নিয়েছে যে মৃত্যুর ওপার থেকে উঠে এসেছি আমরা। বেপরোয়া হয়ে উপস্থিত সবার মাঝ থেকে সেরেনা আর তেহুতিকে খুঁজে বের করতে চাইলাম আমি, যাতে ওদের বিশ্বাস করানো যায় যে আমরা মরিনি, বেঁচেই আছি। দেখলাম দুটো অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানের জায়গাটায় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। দুজনই বিস্মিত, বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। ওদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুললাম আমি; কিন্তু স্বাভাবিক কোনো কথার বদলে স্রেফ একটা রোমহর্ষক গোঙানি বেরিয়ে এলো আমার গলা দিয়ে। তার পরেই মাটিতে পড়ে গেলাম আমি, আমার ওপর পড়ল হুরোতাস। এরপর আমার যা মনে আছে তা হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী দুই নারী আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, চুমুয় চুমুয় ভরিয়ে দিচ্ছে।
