এখন এক হাতে হুরোতাসকে সামলাতে হচ্ছে আমার, কারণ এখনো মাতালের মতো টলছে সে। আর অন্য হাত ব্যবহার করছি রথ চালানোর জন্য। এক ঝলক চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম, যে নৌকাগুলো আমাদের তীরে নামিয়ে দিয়েছিল তার আরোহীরা আমাদের বিপদ বুঝতে পেরেছে। আমাদের তুলে নেওয়ার জন্য আবার তীরের দিকে ফিরে আসছে তারা। তবে এখন স্রোতের বিপরীতে এগোতে হচ্ছে তাদের, ফলে যথেষ্ট দ্রুতগতিতে এগোনো সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে। তার ওপরে বিশালদেহী মানুষ হুরোতাস, স্বাভাবিকভাবেই আমার রথের ওজন বাড়িয়ে দিয়েছে সে। তা ছাড়া নদীর কিনারার যত কাছাকাছি যাচ্ছি ততই নরম হয়ে আসছে রথের চাকার নিচের মাটি, ফলে ক্রমেই তাতে দেবে যাচ্ছে চাকা।
কাঁধের ওপর দিয়ে একবার পেছনে তাকালাম আমি, দেখতে চাইছি যে আমাদের বিশালদেহী শত্রু আর তার শিংঅলা দানবগুলো কী করছে। খুব বেশি দূরে তাকাতে হলো না আমাকে। ঘুরন্ত ছুরির ঘায়ে আমাদের অর্ধেক রথের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে সে, এবার মনোযোগ স্থির করেছে আমার রথের ওপর। বুঝতে পারলাম হুরোতাস যে এই রথের যাত্রী হয়েছে সেটা বুঝতে পেরেছে সে, এবং খুব সম্ভব আমার পরিচয়ও খুব ভালো করেই জানে। বাকি সবাই যখন আমার সম্মান এবং অবস্থান সম্পর্কে খবর রাখে তাহলে এই লোকটাই বা কেন রাখবে না… কিন্তু তার পরিচয়টা কী?
কাছাকাছি চলে এসেছে লোকটার রথ, এবং দ্রুত দূরত্ব কমিয়ে আনছে আরো। প্রতি পদক্ষেপে যেন আরো ভয়ানক হয়ে উঠছে রথের সাথে জোড়া ঘোড়াগুলো। ওদের মাথায় যে ভয়ানক শিংগুলো রয়েছে সেগুলোর সাহায্যে কতটা ক্ষতি করতে পারে তা নিজের চোখেই দেখেছি আমি। তবে নীলনদের তীর এখন আর দুই শ কদমও দূরে নেই আমাদের কাছ থেকে, এবং গভীর পানিতে প্রবহমান স্রোতের বাধা থেকে অবশেষে মুক্ত হতে পেরেছে উদ্ধারকারী নৌকাগুলো। দ্রুত তীরের দিকে এগিয়ে আসছে তারা।
দাগীমুখো লোকটার দিকে তীর ছুঁড়ে যে কোনো লাভ নেই সেটা খুব ভালো করেই বুঝে গেছি আমি। কিন্তু ওর রথ টানছে যে অদ্ভুত প্রাণীগুলো, ওরাও কি একই রকম অভেদ্য? মনে হয় না। রথের লাগামটা হুরোতাসের হাতে ধরিয়ে দিলাম আমি, যদিও এখনো নিজেকে সম্পূর্ণ সামলে উঠতে পারেনি সে। তারপর রথের পাশ থেকে ধনুক তুলে নিয়ে একটা তীর জুড়লাম তাতে। ইউনিকনগুলো একেবারে কাছে চলে এসেছে আমাদের, সেগুলোর মধ্যে ঠিক মাঝখানের প্রাণীটাকে লক্ষ্য করে ছেড়ে দিলাম তীর।
যদিও তীব্র গতির কারণে দারুণভাবে ঝাঁকি খাচ্ছিল আমার রথ, তবু লক্ষ্য ব্যর্থ হলো না আমার। সরাসরি প্রাণীটার বিশাল বুকের ঠিক মাঝখানে গিয়ে লাগল তীর, একেবারে পালক পর্যন্ত ঢুকে গেল ভেতরে। বুঝতে পারলাম হৃৎপিণ্ড ফুটো হয়ে গেছে ওটার। কিন্তু তার পরও সামান্যতম হোঁচট খাওয়ারও কোনো লক্ষণ দেখা গেল না দানবটার মাঝে, গতি কমে আসা তো দূরের কথা। এবং এবার প্রচণ্ড আতঙ্ক আর বিস্ময় নিয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, দাগীমুখো ওই রথচালক আর তার পোষা দানবের দলের আগমন ঘটেছে আসলে অন্য কোনো পৃথিবী থেকে। অন্ধকার দেবতাদের পাঠানো প্রতিনিধি ওরা।
এই চিন্তাটা মাথায় আসার পর মুহূর্তেই দাগীমুখো তার ইউনিকর্নের দলটাকে সরাসরি আমার রথ লক্ষ্য করে চালিয়ে দিল। অসংখ্য টুকরোতে ভেঙে গেল বাম দিকের চাকাটা। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া পা থেকে রক্ত ঝরাতে ঝরাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল আমার রথের ঘোড়াগুলো কাতর স্বরে আর্তনাদ করে উঠল। তবে ঠিক একই মুহূর্তে নদীর তীরে পৌঁছে গেছি আমরা। আঘাতের ফলে গুলতি থেকে ছোঁড়া পাথরের মতো উড়ে গিয়ে পড়লাম আমরা দুজন। নীলনদের ঘোলাটে পানি যেন গিলে নিল আমাদের, সাথে সাথে এক দফা নাকানি-চুবানি খেয়ে ভেসে উঠলাম আবার।
নৌকাগুলো এগিয়ে আসছে আমাদের সাহায্য করার জন্য। কিনার থেকে মাত্র বিশ কদমের মতো দূরে রয়েছে তারা; কিন্তু পাগলের মতো দাঁড় বাইছে, একই সাথে চিৎকার করে আমাদের বলছে সাঁতার কেটে সরে আসতে। হুরোতাসকে। পানির ওপর ভেসে থাকতে সাহায্য করলাম আমি, একই সাথে টেনে নিয়ে তীর থেক দূরে সরে যেতে শুরু করলাম। আমাদের দুজনের পরনেই বর্ম থাকায় অনেক কঠিন হয়ে গেল কাজটা। তা ছাড়া হুরোতাস এখনো সম্বিৎ ফিরে পায়নি। তবে প্রথম নৌকাটার কাছে পৌঁছে যেতে পারলাম সহজেই। সাথে সাথে বেশ কয়েক জোড়া হাত নেমে এলো আমাদের নৌকায় তুলে নিতে। দ্রুত একবার পেছনে তাকিয়ে দেখলাম ইউনিকর্নের দল নিয়ে নদীর কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের শত্রু। হঠাৎ করে থেমে যেতে হওয়ায় ক্রুদ্ধ আক্রোশে ফুঁসছে ঘোড়াগুলো, খুর দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। পাশ থেকে ধনুকটা তুলে নিয়েছে দাগীমুখো এখন অভ্যস্ত সাবলীলতার সাথে বিশাল অস্ত্রটাকে বাঁকিয়ে ছিলা পরাচ্ছে।
কাঁধের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে পিঠ থেকে ব্রোঞ্জের ঢালটা খুলে আনলাম আমি, তারপর আমার এবং হুরোতাসের সামনে ধরলাম সেটাকে। উদ্দেশ্য আসন্ন ঝড় থেকে নিজেদের কিছুটা হলেও সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। নৌকার ওপর বসে থাকা আমাদের দিকে একবার তাকাল দাগীমুখো, তারপর ধনুকটা উঁচু করে ধরল। একটা তীর জুড়ে ফেলেছে ইতোমধ্যে, এবার টেনে সেটাকে পিছিয়ে আনল সে।
মুখে হাসি ফুটেছে তার এবং এই প্রথমবারের মতো কোনো আবেগের চিহ্ন দেখলাম তার চেহারায়। ভয়ংকর বাঁকা হাসিটা ধরে রেখেই তীর ছুড়ল সে। তীরের লক্ষ্যটা আমার দিকেই ছিল; কিন্তু নিজেকে রক্ষা করার জন্য আগেই প্রস্তুত হয়ে গেছি আমি। ঢালটা সামনে তুলে ধরে হুরোতাস এবং আমাকে আড়াল করার ব্যবস্থা করলাম সাথে সাথে। সম্পূর্ণ সোজা না করে ধরে একটু কাত করে ধরেছি ঢালটা। যদিও শক্ত সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি আমার এই ঢাল, কিন্তু কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নই আমি। এভাবে কাত করে ধরার ফলে তীরটা ঢাল ভেদ করে ভেতরে ঢোকার সুযোগ পাবে না, বরং পিছলে বেরিয়ে যাবে। তীক্ষ্ণ ধাতব আওয়াজের সাথে ঢালের ওপর আঘাত হানল তীর, ধাক্কা সামলাতে বেশ বেগ পেতে হলো আমাকে। পেছনের নৌকার খোলে গিয়ে লাগল তীরটা। হুরোতাসকে টেনে নৌকার খোলের ভেতর নামিয়ে আনলাম আমি, খেয়াল রাখলাম যেন মাথা ওপরে তোলার সুযোগ না পায় সে। এখানে অন্তত নদীর কিনারে দাঁড়ানো তীরন্দাজের হাত থেকে আমরা নিরাপদ। তবে বাকিদের ভাগ্য এত সুপ্রসন্ন হলো না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাতাস ভারী হয়ে উঠল দাগীমুখোর তীরের আঘাতে আহত এবং নিহত ব্যক্তিদের আর্তচিৎকারে।
