এমন বিশালদেহী লোক এর আগে খুব কমই দেখেছি আমি। শরীরে খুবই সাধারণ চেহারার একটা বর্ম পরে আছে সে; গলার নিচ থেকে পালিশ করা রুপোর আবরণ। নিঃসন্দেহে শত্রুর তীরকে প্রতিহত করার জন্য পরেছে সেটা। হাতে কোনো অস্ত্র নেই, তবে পাশে রাখা রয়েছে একটা ছিলাবিহীন ধনুক আর একটা চওড়া তলোয়ার। রথের লাগাম ছাড়া আর কিছুই নেই তার হাতে। তবে তার শিরস্ত্রাণটা সত্যিই দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। কেবল তার মাথা এবং মুখের ডান পাশ ঢেকে রেখেছে সেটা। চকচকে ধাতুর মাঝে একটা সরু ফুটোর ভেতর দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে তার ডান চোখ।
তবে তার মুখের বাম পাশটা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, এবং বীভৎস দেখতে। অজস্র ক্ষত আর কাটা দাগে ভর্তি তার মুখের এই দিকটা। ঠোঁটগুলো ফুলে আছে, বেঁকে গেছে নিচের দিকে। চোখের পাতা ঝুলে পড়েছে; কিন্তু তার ওপাশে বিচ্ছুরিত হওয়া খুনে দৃষ্টি বোঝা যাচ্ছে পরিষ্কার।
শত্রুর রথ এবং আমাদের মাঝে দূরত্ব দ্রুত কমে আসছে, এই অবস্থাতেই ডান হাতের নিচে আটকানো তূণ থেকে একটা তীর বের করে ধনুকে জুড়ে ফেললাম আমি। তারপর এক টানে তীরের লেজটা টেনে ধরে নিয়ে এলাম আমার ঠোঁটের কাছে। মুহূর্তের এক শ ভাগের এক ভাগ সময় নিয়ে লক্ষ্যস্থির করেই ছেড়ে দিলাম তীরটা। দেখলাম ঝাপসা একটা আকৃতি নিয়ে সামান্য দূরত্বটুকু পেরিয়ে গেল তীর, সরাসরি ছুটছে ক্ষতবিক্ষত চেহারাটার বাম চোখ লক্ষ্য করে।
বাঁচার কোনো উপায় নেই লোকটার, নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারলাম আমি। কল্পনার চোখে দেখলাম চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার ভেতর একেবারে পালক পর্যন্ত সেঁধিয়ে গেছে তীরটা। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে ঝট করে মাথা নামিয়ে ফেলল লোকটা। তীরের মাথাটা তার শিরস্ত্রাণে ঘষা খেয়ে পিছলে বেরিয়ে গেল, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল জঙ্গলের মাঝে, একটু আগে যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে রথটা।
এমন আক্রমণের পরেও এমনকি একবার চোখের পলকও ফেলল না রথের চালক। বরং আমাদের সারির ঠিক সামনে দাঁড়ানো হুরোতাসের ওপর পুরো মনোযোগ পুঞ্জীভূত করল সে, নিশ্চয়ই হুরোতাসের চোখ ধাঁধানো শিরস্ত্রাণ আর বর্ম তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কালো ইউনিকনগুলোকে সরাসরি হুরোতাসের দিকে চালিয়ে নিয়ে গেল সে। শেষ মুহূর্তে সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করল হুরোতাস, নিজের ঘোড়াগুলোর লাগাম ধরে জোরে টান দিল। ফলে সরাসরি সংঘর্ষের বদলে কোনাকুনি তার রথকে আঘাত করল আগন্তুক আক্রমণকারীর রথ। বন বন করে ঘুরতে থাকা ছুরিগুলো হুরোতাসের রথের একটা পাশ সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিল, একই সাথে রক্ত আর হাড়ের মেঘে পরিণত করল ঘোড়াগুলোর এক পাশের পাগুলোকে। আর্তচিৎকার করে লুটিয়ে পড়ল প্রাণীগুলো। রথের চাকাগুলোও ছুরির সামনে পড়ায় একই দশা হলো তাদের, গুড়ো হয়ে গেল স্রেফ। উল্টে গেল রথটা, উড়ে গিয়ে অন্য পাশে পড়ল হুরোতাস আর তার দুই সঙ্গী। মাটিতে পড়ার সময় হাত থেকে অস্ত্র ছুটে গেল তাদের।
এবার কালো ইউনিকর্নগুলো আমাদের সারির বাম পাশটা লক্ষ্য করে ধেয়ে এলো এবং একের পর এক রথের চাকাগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করল। মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল রথ এবং সেগুলোর আরোহী। কপাল ভালো আমার, ডান পাশে দাঁড়ানো চারটি রথের একটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি, ফলে আমার রথের চাকা ভেঙে দেওয়ার কোনো সুযোগ পেল না আগন্তুক। তবে আরো একটা তীর ধনুকে জুড়লাম আমি, তারপর ছুঁড়ে দিলাম আক্রমণকারীর শিরস্ত্রাণের খোলা অংশ লক্ষ্য করে। সে সময় আমার কাছ থেকে মাত্র দশ কিউবিট দূরে ছিল সে, দুটো রথের প্রস্থের সমান। এত দ্রুত ছুটে গেল আমার তীর যে চোখ দিয়ে অনুসরণ করা গেল না। কিন্তু তীরটা শরীরে বেঁধার ঠিক আগ মুহূর্তে লোহার জাল দিয়ে ঢাকা একটা হাত ওপরে তুলল লোকটা, তারপর এমনভাবে সেটাকে সরিয়ে দিল যেন মাছি তাড়াচ্ছে। মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য আধবোজা চোখের দৃষ্টিটা স্থির হলো আমার ওপর। জীবনে ওই ভয়ানক দৃষ্টির কথা ভুলব না আমি। তার পরেই আমার সামনে থেকে সরে গেল তার রথ।
গুঁড়ো হয়ে যাওয়া রথের ওপর থেকে ছিটকে পড়েছিল হুরোতাস, এখন আমার সামনেই পড়ে আছে সে। এবার আমার রথের চালকের কাছ থেকে লাগাম ছিনিয়ে নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি। নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে হুরোতাস; কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে যে পতনের ফলে যে চোট পেয়েছে তা এখনো সম্পূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। শিরস্ত্রাণ এবং অস্ত্র- সবই হারিয়েছে সে, টলছে মাতালের মতো। মুখের একটা পাশ ফুলে উঠেছে, ময়লা আর ধুলো লেগে আছে সেখানে।
জারাস! তার আগের নাম ধরে ডাক দিলাম আমি। যেমনটা ভেবেছিলাম, সত্যিই কাজ হলো। রথ নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে চোখ কুঁচকে আমার দিকে তাকাল হুরোতাস।
হাতটা দাও! চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। যখন আমাদের বয়স আরো কম ছিল তখন এই বিশেষ কাজটা প্রায়ই অনুশীলন করতাম আমরা। সোজা হয়ে আমার দিকে মুখ করে দাঁড়াল হুরোতাস, ডান হাত কোমরে রেখে একটা আংটার মতো তৈরি করল। কিন্তু এখনো অল্প অল্প টলছে তার শরীর।
বাম হাতে লাগামে ঝাঁকি দিয়ে রথের তিনটি ঘোড়াকে সামনে এগোতে নির্দেশ দিলাম আমি, ওদিকে নিজে ঝুঁকে পড়েছি রথের ডান পাশে। দ্রুত হুরোতাসের দিকে এগিয়ে গেল আমার রথ। একেবারে শেষ মুহূর্তে রথের মোড় ঘুরিয়ে নিলাম আমি, ফলে ডান পাশে থাকা ঘোড়াটা ঘষা খেল ওর গায়ে। আমার এবং হুরোতাসের অবস্থান পাশাপাশি আসতেই ডান হাত বাড়িয়ে ওর ডান হাতে তৈরি হওয়া আংটার মাঝে আটকে ফেললাম। ফলে প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকি খেতে হলো আমাকে, আরেকটু হলেই পড়ে যাচ্ছিলাম রথ থেকে। তবে কোনোমতে সামলে নিতে পারলাম শেষ পর্যন্ত এবং এক টানে হুরোতাসকে এনে ফেললাম রথের ওপর।
