*
ষষ্ঠ দিন ভোরবেলা নদীর ভাটি ধরে বড় একটা সেনাদলকে পাঠানো হলো শত্রুর চোখে ধূলো দেওয়ার উদ্দেশ্যে। আর আমি এবং হুরোতাস আমাদের শ্রেষ্ঠ রথ এবং চালকদের নিয়ে ছোট একটা বাহিনী সাজিয়ে চলে এলাম উল্টো দিকে প্রায় পাঁচ লিগ দূরত্বে। গত কয়েক দিন নদীর বুকে চলাফেরা করার সময় খুব সতর্কতার সাথে সব দিক বিবেচনা করেছি আমরা, তারপর আবু নাসকোস থেকে দশ মাইল দূরত্বে নীলনদের পশ্চিম তীরে একটা জায়গা বেছে নিয়েছি অবতরণের জন্য। এখানে জঙ্গল থেকে একটা ছোট স্রোতস্বিনী বের হয়ে এসে মিশে গেছে নীলনদের সাথে। নদীটার তলদেশ পাথরে ভরা, ফলে রথের চাকা দেবে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। রথগুলোকে ছোট নদীটায় নামিয়ে দিতে পারব আমরা, তারপর জাহাজ থেকে নেমে সেগুলোকে ডাঙায় তুলে নেওয়া যাবে আবার।
আমাদের পেছনে দিগন্তে সূর্য উঠল একসময়। আমরা তখন বহরের মাঝ থেকে দুটো জাহাজকে পশ্চিম তীরের বালির ওপর তুলে রাখতে ব্যস্ত। আমাদের প্রতিটি জাহাজে রয়েছে চারটি করে রথ, ঘোড়াগুলোকে বেঁধে রাখা হয়েছে সেগুলোর সাথে। রথচালকরা লাগাম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রথের ওপর। জাহাজের মাথা থেকে পাটাতন নামিয়ে দিতেই তার ওপর দিয়ে নেমে গেল রথগুলো। অগভীর নদীর মাঝ দিয়ে রথগুলোকে টেনে নিয়ে গেল ঘোড়ার দল। প্রথম রথে রয়েছে হুরোতাস। সারিতে মোট আটটা রথ, সবার শেষ রথটায় রয়েছি আমি। আমাদের দলের সবার কাছেই রয়েছে দুই দিক বাঁকানো ধনুক, যেকোনো মুহূর্তে বিপদের মোকাবিলা করার জন্য সবগুলোতেই ছিলা পরিয়ে রাখা হয়েছে। সেইসাথে প্রস্তুত রয়েছে কুঠার আর তলোয়ারও। আমাদের উদ্দেশ্য কেবল শত্রুপক্ষের হালহকিকত পরিদর্শন করা। দরকার হলে উটেরিকের সৈন্যদের মুখোমুখি হব আমরা, তারপর তাদের শক্তি এবং সংখ্যার আন্দাজ নেওয়ার চেষ্টা করব। এর মধ্যে আমাদের দলের বাকি জাহাজগুলো নদীতে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করবে আমাদের ফেরার। তীরে থাকা অবস্থায় যদি কোনো কারণে দ্রুত পালানোর দরকার হয় সে জন্য যেকোনো মুহূর্তে জাহাজ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে তারা।
এখন পর্যন্ত উটেরিকের সৈন্যদের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। কাছাকাছি দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে আমাদের রথগুলো। হুরোতাসের নেতৃত্বে ঘাসের মাঝ দিয়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাওয়া পথটা ধরে চলতে শুরু করলাম আমরা।
জঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি প্রায়, এই সময় হঠাৎ ভয়ংকর এক শব্দ ভেসে এলো আমাদের কানে। শব্দটা সম্পূর্ণ অপরিচিত আমার কাছে, এমন শব্দ আগে কখনো শুনিনি আমি। তবে ধারণা করলাম যে শব্দটা সম্ভবত অনেকগুলো ট্রাম্পেট একসাথে বাজিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। সাথে সাথে একটা মুঠিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে তুলে ধরল হুরোতাস, অগ্রগতি বন্ধ করার সংকেত। ওদিকে আমাদের ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে লাফালাফি শুরু করেছে, ঘাড় মুচড়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে লাগাম। রথের চালকরা সবাই এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে অবাক চোখে, কেউ জানে না যে এই অদ্ভুত শব্দ কোথা থেকে ভেসে এলো।
শব্দটা আর শোনা গেল না ঠিকই; কিন্তু তার জায়গা দখল করল ঘোড়ার খুর আর চাকার গর্জন। এত জোরালো শব্দ, মনে হলো যেন এক শ রথ পুরোদমে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। কাউকে কিছু বলতে হলো না, আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এক সারিতে দাঁড়িয়ে গেল সবাই।
কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো একটা মাত্র রথ, যদিও এমন রথ আমরা কেউই আগে কখনো দেখিনি। সরাসরি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে রথটা, এবং তার উদ্দেশ্য যে মোটেও শুভ নয় সেটা বোঝার জন্য খুব বেশি মাথা খাটাতে হয় না। আমাদের রথের চাইতে এই রথটা প্রায় দ্বিগুণ হবে চওড়ায়, দেড় গুণ উঁচু। আমাদের রথগুলোর চাকা যেখানে মোটে এক জোড়া সেখানে এই রথটার প্রতি পাশে চারটি করে চাকা অর্থাৎ মোট আটটা চাকা রয়েছে।
আমাদের রথের চাকাগুলো তৈরি হয়েছে শক্ত কাঠের সাহায্যে, প্রতিটায় ছয়টা করে ভারী শিক লাগানো। আর শত্রু রথের চাকাগুলোতে কোনো শিক নেই, স্রেফ রুপালি রঙের এক অচেনা ধাতুর তৈরি এক একটা চাকতি। চাকার ঠিক মাঝখান থেকে বেরিয়ে আছে প্রায় এক হাত লম্বা একটা ধারালো ফলা। এটা ছাড়াও প্রতিটা চাকার পরিধি জুড়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে বসানো রয়েছে আরো চারটি ফলা, সবগুলোই ঘুরছে বন বন করে। যদিও এই জিনিস আগে দেখিনি আমি কিন্তু এটা বুঝতে মোটেও কষ্ট হলো না যে, ওই ফলার সংস্পর্শে যা কিছু আসবে সব কিছুই টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আমাদের রথের চাকাগুলোর কী অবস্থা হবে ভেবে শিউরে উঠলাম আমি।
আমাদের রথগুলো টানতে দরকার হয় তিনটি করে ঘোড়া। পক্ষান্তরে শত্রু রথের সামনে জোড়া রয়েছে আটটা বিশাল ঘোড়া, সবগুলো চকচকে কালো রঙের। প্রত্যেকটা ঘোড়া আমাদের ঘোড়াগুলোর চাইতে কমপক্ষে এক হাত উঁচু। এবং প্রতিটার কপালের ঠিক মাঝখান থেকে বেরিয়ে আছে একটা করে লম্বা, কালো, প্যাচানো শিং। তালে তালে পা ফেলে দৌড়ে আসছে ঘোড়াগুলো, একই সাথে নাকের বিস্ফারিত ফুটো থেকে বেরিয়ে আসছে গরম বাষ্প।
আমাদের রথগুলোতে সব মিলিয়ে তিনজন লোক দাঁড়াতে পারে, একজন চালক এবং দুজন তীরন্দাজ। ওদিকে শত্রু রথের যাত্রী বলতে কেবল চালক। পেছন দিকে হেলে পড়ে ঘোড়াগুলোর লাগাম ধরে রেখেছে সে, সরাসরি এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে।
