তার পরেই মৃদু হাসল ইনানা। বলল, গানোর্ড তোমাকে বলেছিল যে ওরা জাদুবিদ্যার সাহায্যে পার হতো নদী। কিন্তু ভুল করেছে সে। স্বাভাবিক বুদ্ধি ছাড়া আর কোনো কিছুরই সাহায্য নেয়নি প্রাচীনরা। এবং আমি জানি সেই একই জিনিসটা তুমিও কাজে লাগাবে। এই কথা বলেই গাছের গায়ে হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে, তারপর দ্বীপের কিনারার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর এক পা বাড়িয়ে পড়ে গেল কিনার থেকে। শুকনো পাতার মতো হালকাভাবে ভাসতে ভাসতে নিচে নামল তার শরীরটা। দেখলাম ঢেউয়ের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে সে আর নদীর বুক থেকে রুপালি কুয়াশার মতো বাষ্প উঠে এসে ধীরে ধীরে ঢেকে দিচ্ছে তাকে।
*
আজ এখানে সমবেত হওয়ার পর তোমাদের সবাইকে প্রথমেই আমি আন্তরিক ধন্যবাদ দিতে চাই। তার কারণ, একের অপমান মানে সবার অপমান-এই মর্মে তোমরা যে শপথ নিয়েছিলে তা পালন করতে কেউ পিছিয়ে যাওনি। এখন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে এক অত্যাচারী স্বৈরাচারকে উৎখাত করা, যে ফারাওদের ন্যায্য সিংহাসনকে দখল করে রেখেছে… নীলনদের পুব তীরে আবু নাসকোসের উল্টো দিকে সবুজ ঘাসে ঢাকা এক টুকরো মাঠে দাঁড়িয়ে বিদেশি রাজাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছে হুরোতাস।
রাজাদের প্রত্যেকেই পরে আছে পুরোদস্তুর যুদ্ধের সাজ। তাদের পেছনে। সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সৈন্যরা, সব মিলিয়ে যাদের সংখ্যা দশ হাজার। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা, মনে হচ্ছে যেন শেষ নেই তাদের। প্রত্যেকের ঢাল পরস্পরের সাথে স্পর্শ করে থাকা অবস্থায় ধরে রেখেছে সামনে, শিরস্ত্রাণের নিচে কঠোর চেহারা সবার। ঢালের ওপর প্রতিফলিত হচ্ছে রোদ। ধনুকে এখনো ছিলা পরানো হয়নি; কিন্তু দুই কাঁধে ঝুলছে তীরভর্তি তূণ।
নীলনদের তীরে সৈন্যদের ঠিক পেছনেই নোঙর করে রাখা আছে তাদের নৌবহর। নোঙর ফেলেছে ঠিকই কিন্তু নাবিকরা সবাই পুরোদস্তুর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে, আসন্ন যুদ্ধে যার যার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা উপহার দিতে কেউ পিছপা হবে না।
ভাষণ শেষ করে উপস্থিত বাদকদের দিকে তাকাল হুরোতাস, তারপর তাদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য তলোয়ার উঁচু করল। তার ইশারা পেয়ে একযোগে ঢাকের কাঠি ঠোঁটের সামনে তুলল বাদকরা। এক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করল হুরোতাস, তারপর তলোয়ার দিয়ে একবার ডানে একবার বামে বাতাস কাটল। ঝড়ের মতো আওয়াজ তুলল বাদকদের ঢাক। অস্ত্রধারী সৈন্যরা এবার সারি ধরে এগোতে শুরু করল অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোর দিকে। এই জাহাজগুলোই তাদের নিয়ে যাবে নদীর অপর তীরে, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে হয় মৃত্যু অথবা বীরের সম্মান।
পুরো ব্যাপারটা সামলানো অত্যন্ত জটিল এবং বিপদসংকুল একটা কাজ। আমরা ঠিক করেছি যে নৌবহরের সাহায্যে রথ, ঘোড়া এবং সৈন্যদের নদী পার করে নিয়ে যাওয়া হবে নীলের অপর তীরে। উটেরিকের সৈন্যরা ওই এলাকা নিজেদের দখলে রেখেছে। আবু নাসকোসের দুর্গের মতো দুর্ভেদ্য দুর্গ এই আফ্রিকা মহাদেশেই দ্বিতীয়টা আছে কি না সন্দেহ, মিশরে তো অবশ্যই নেই। আমাদের এটাও জানা আছে যে, হুরোতাস আর তার মিত্ররা যখন পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে রওনা দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে সেই অবসরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার যথেষ্ট সময় পেয়েছে উটেরিক। এবং এটাও জানা গেছে। যে, মিশরের পুব সীমান্তের ওপাশে এবং তারও অনেক দূরের অনেক শক্তিশালী সব দেশের সাহায্য পেয়েছে সে।
উটেরিকের এই মিত্রদের মাঝে রয়েছে পারসিয়া, মেদিয়া ইত্যাদি দেশ এবং আরো প্রায় পঞ্চাশটার মতো উপজাতি ও গোত্র। এরা সবাই দক্ষ ঘোড়সওয়ার এবং যোদ্ধা বলে যথেষ্ট সুনাম রাখে। তবে আমার অভিজ্ঞতা বলে, বাস্তব এবং সুনামের মাঝে তফাতটা অনেক ক্ষেত্রেই বড় বেশি হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আবু নাসকোস থেকে ল্যাসিডিমন যত দূরে তার চাইতে অনেক বেশি দূরত্বে অবস্থিত পারসিয়া এবং মেদিয়া।
তার পরও সাবধানের মার নেই ভেবে পুরোদমে আক্রমণ চালানোর আগে নীলের পশ্চিম তীরে কয়েকটা ছোট ছোট হামলা চালানোর জন্য হুরোতাস এবং হুইকে রাজি করালাম আমি। এতে ওদের ক্ষমতার প্রকৃত অবস্থাটা জানা যাবে। এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত যে, আমাদের রথগুলো উটেরিকের রথের চাইতে শক্তিশালী এবং আবু নাসকোস দুর্গ থেকে উজানে কোনো একটা জায়গায় ঘাঁটি তৈরি করার জন্য ওগুলোকে ব্যবহার করতে পারব আমরা। আর একবার এমন একটা ঘাঁটি তৈরি করতে পারলে সেখান থেকেই ঘিরে ফেলা যাবে পুরো শহরটাকে। তখন তাদের ওপর অবরোধ আরোপ করতে পারব আমরা।
পরবর্তী পাঁচ দিন ধরে নদীর উজান-ভাটি ধরে যাওয়া-আসা করল আমাদের জাহাজগুলো, ভাব দেখাল যেন যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করবে। কয়েকটা জাহাজে অস্ত্রধারী সৈন্যদের মোতায়েন করা হলেও বেশির ভাগ জাহাজেই কাঠের মূর্তি এবং কাকতাড়ুয়া ব্যবহার করা হলো বিভিন্ন জায়গায়। আমাদের জাহাজগুলোকে তীর থেকে অনুসরণ করতে লাগল উটেরিকের রথ বাহিনী, আর পদাতিক সৈন্যের দল জাহাজ থেকে তাদের চলার পথে ধুলো উড়তে দেখলাম আমরা। এভাবেই খুব সতর্কতার সাথে মেপে নিলাম তাদের আনুমানিক সৈন্য এবং রথের সংখ্যা। যা ভেবেছিলাম তার চাইতে অনেক বেশি ওরা সংখ্যায়।
