এবং সেই মুহূর্তেই কাজটা অন্য কারো হাতে, বিশেষ করে সাধারণ শ্রমিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম আমি।
কোমরের খাপ থেকে ছুরিটা বের করলাম এবার, তারপর শত শত বছর ধরে পাথরের খাঁচায় বন্দি হয়ে থাকা টালিটাকে খুব সাবধানে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত বের হয়ে এলো জিনিসটা।
এবার গর্ত থেকে বের হয়ে এসে নতুন টালিটাকে কোলের ওপর নিয়ে উবু হয়ে বসলাম। স্বীকার করছি যে বসার আগে একবার ভালো করে মাটির ওপরটা দেখে নিলাম আমি। বলা তো যায় না, এখানেও ইনানা দুষ্টুমি করে আরেকটা ধারালো টুকরো রেখে দিতে পারে। এবার মনোযোগ ফেরালাম নতুন টালিটার দিকে, অথবা বলা যেতে পারে যে নতুন পাওয়া প্রাচীন টালিটার দিকে।
আকার এবং আকৃতিতে এটা মাছের ছবি আঁকা টালির মতো হলেও অন্য সব দিক দিয়েই এটা একেবারেই আলাদা। মাছের টালিটা ছিল সবুজ রঙের সেখানে এটার রং গাঢ় নীল। এটার ওপর আঁকা রয়েছে কোনো একটা সামুদ্রিক পাখির ছবি, খুব সম্ভব পাফিন। তবে বলা যায় না, এমনকি উটপাখির ছবিও হতে পারে এটা। কীসের ছবি এঁকেছে সেটা পরিষ্কার করে বোঝাতে চায়নি শিল্পী। এ ছাড়া মাছের টালিটার গায়ে ছিল চারটি ছিদ্র সেখানে এই টালিটার গায়ে দেখা যাচ্ছে তিনটি।
ইতোমধ্যে দ্বীপ দুটোকে মৎস্যদ্বীপ এবং পক্ষীদ্বীপ নামে ডাকব বলে ঠিক করেছি আমি। নদীর ওপারে আবু নাসকোস দুর্গের দিকে তাকালাম একবার। মনে মনে ভাবলাম বাকি দুটো দ্বীপকেও হয়তো এভাবে নামকরণ করেছিল প্রাচীন নির্মাতারা; হতে পারে সেটা কুমিরদ্বীপ এবং জলহস্তীদ্বীপ। ব্যাপারটা ভাবতে নিজের অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল আমার ঠোঁটে।
আবার পাথর খননের কাজে ফিরে গেলাম আমি। এবার আবিষ্কার করলাম প্রথম টালিটা যেখানে পাওয়া গেছে তার পর থেকে একই রকমের আরো টালির সারি নেমে গেছে নিচে। ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই ভাবিয়ে তুলল আমাকে, আরো কিছু পাওয়া যায় কি না দেখার জন্য নতুন উদ্যমে খুঁড়ে চললাম আমি। তবে সামান্য দূরত্ব যাওয়ার পরেই হঠাৎ বাধা পেতে হলো আমাকে। খুব সম্ভবত মাটির অভ্যন্তরীণ গঠনে কোনো একটা পরিবর্তন ঘটেছিল কখনো, সেটাই বদলে দিয়েছে টালির সারির গতিপথ। এর বেশি সামনে এগোনোর আর কোনো উপায় নেই।
এখন পর্যন্ত শুধু এটুকুই বুঝতে পেরেছি যে হাজার বছর আগে সেই রহস্যময় জাতির সদস্যরা মৎস্যদ্বীপ এবং পক্ষীদ্বীপে দুটো সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিল। কিন্তু এগুলো কতটা গভীর অথবা এই বিপুল পরিশ্রমের কাজ তারা কেন করেছিল সেটা জানার কোনো উপায় নেই আমার সামনে। আমার পায়ের নিচে যে সুড়ঙ্গটা রয়েছে তার মুখ কিছুটা নিচে গিয়েই ধস নেমে বন্ধ হয়ে গেছে।
আচ্ছা, যদি কোনোভাবে মৎস্যদ্বীপ আর পক্ষীদ্বীপের মাঝে একটা সংযোগ থেকে থাকে? কথাটা আমি বলিনি, এমনকি চিন্তাও করিনি। সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম আমার কণ্ঠ ব্যবহার করে কথা বলে উঠেছে ইনানা। আমার সাথে দুষ্টুমি করতে সম্ভবত দারুণ মজা পায় সে।
ইনানার কথাটাকে খণ্ডন করার চেষ্টা করলাম আমি। দুই দ্বীপের মধ্যে সংযোগ কেন থাকবে? মানুষ যে পানির নিচে খুব বেশি সময় থাকতে পারে না তার প্রমাণ তো আমি নিজেই। নীলনদ ছাড়াও অনেক জলাশয়ের গভীরে ডুব দিয়েছি আমি; কিন্তু কোনো জায়গাতেই খুব বেশি সময় দম রাখতে পারিনি।
মৎস্যদ্বীপের দিকে তাকিয়ে দুই দ্বীপের মাঝে দূরত্বটা খালি চোখে মাপার চেষ্টা করলাম এবার। মাত্র একবার দম নিয়ে এই দূরত্বের দশ ভাগের এক ভাগ পাড়ি দেওয়ার কথা চিন্তা করতেই ঠাণ্ডা হয়ে এলো আমার হাত-পা। এক লাফে উঠে দাঁড়ালাম আমি, উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করতে লাগলাম। মাটিতে পা দিয়ে আঘাত করলাম একবার; কিন্তু কোনো লাভ হলো না। সম্পূর্ণ নিরেট আমার পায়ের নিচের মাটি, ভেতরে কিছু থাকলেও তা ওপর থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই।
এমন কি হতে পারে যে দুই দ্বীপের মাঝে খরগোশের গর্তের মতো কোনো সুড়ঙ্গপথ আছে? আনমনে বলে উঠলাম একবার এবং মাথা নাড়লাম প্রায়। সাথে সাথেই। পানি সর্বদা তার জায়গা খুঁজে নেয়। খুব ছোটবেলাতেই এই কথাটাকে ধ্রুব সত্য হিসেবে জেনে গিয়েছিলাম আমি। মাটির যেকোনো সাধারণ গর্তের মতোই খরগোশের গর্তও পানিতে ভর্তি হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি।
কিন্তু কোথাও একটা জিনিস ভুল হচ্ছে আমার বুঝতে পারছি সেটা। ব্যাপারটা নিয়ে আবার নতুন করে চিন্তা করতে বসলাম। আমি যখন নীলনদের তলায় ডুব দিই তখন আমার ফুসফুঁসে পানি ঢোকে না কেন?
কারণ আমি দম বন্ধ করে রাখি, ফলে আমার ফুসফুঁসের প্রবেশপথও বন্ধ হয়ে যায়।
তার মানে সুড়ঙ্গের দেয়াল যদি পানিরোধী হয় এবং প্রবেশপথগুলো হয় পানির ওপরে তাহলে ওই সেই সুড়ঙ্গও পানিরোধী হয়ে যাবে। কোনোভাবেই ভেতরে পানি ঢুকতে পারবে না।
হ্যাঁ, কিন্তু সমস্যাটা তো ওখানেই! সুড়ঙ্গের দেয়ালগুলো তো পানিরোধী নয়। মাটি দিয়ে তৈরি সেটা এবং মাটির ভেতর সহজেই পানি প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু প্রাচীনরা যদি এমন একটা পানিরোধী বস্তু আবিষ্কার করে থাকে যেটা দিয়ে সুড়ঙ্গের দেয়ালে আস্তরণ তৈরি করা যায় তাহলে তাদের পক্ষে পানির নিচ দিয়ে চলাচল করা কোনো ব্যাপারই ছিল না। এই কথাগুলো উচ্চারিত হলো ইনানার মিষ্টি মায়াবী কণ্ঠস্বরে। মুখ তুলে তাকাতেই আমার সামনে একটা গাছের সাথে আয়েশি ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম তাকে। বরাবরের মতোই আকাশকুসুম যুক্তি তৈরি করেছে সে; কিন্তু এটাও ঠিক যে একটু ঘুরপথে হলেও সত্যের কাছাকাছি আসতে পেরেছি আমি।
