সেরেনা মানবী নাকি দেবী সে তর্কে যাব না; কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে, সেদিন উপস্থিত সবাই ওকে এক বাক্যে স্বীকার করে নিয়েছিল তাদের জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারী বলে।
এবার নাচতে শুরু করল রামেসিস আর সেরেনা, তাদের সাথে নাচল বাকি সবাই। শুধু যখন সূর্য ডুবে আঁধার নেমে এলো তখনই কেবল নিজেদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করল বর আর কনে। তবে অনুষ্ঠানের আনন্দে কোনো কমতি হলো না, সারা রাত ধরে চলল তার উদযাপন।
*
তেহুতি আর বেকাথা- দুজনের সাথেই একবার করে নাচলাম আমি, তারপর সবার অলক্ষ্যে সরে এলাম আমার নিজের তাঁবুতে। হুরোতাসের বাগান থেকে তৈরি দারুণ মদে একটা চুমুকও দিইনি এবং স্বীকার করছি যে কাজটা করতে নিজের ইচ্ছাশক্তির সবটুকু ব্যবহার করতে হলো আমাকে।
সূর্যোদয়ের দুই ঘণ্টা আগে ঘুম থেকে জাগলাম আমি, তারপর রাতের সবচেয়ে অন্ধকার সময়টার সুযোগ নিয়ে চলে গেলাম নদীর কাছে। উৎসবের আনন্দে পাড় মাতাল হয়ে যেখানে-সেখানে পড়ে আছে সবাই, দেখে মনে হচ্ছে যেন ভয়াবহ কোনো যুদ্ধ শেষে পড়ে আছে নিহতদের মৃতদেহ। তাদের মাঝ দিয়েই পথ করে নিয়ে এগিয়ে যেতে হলো আমাকে। শুধু তারার আলোয় পথ চিনে নিয়ে এগিয়ে চললাম আমি। পরনে কেবল অন্ত বাস, ছোরাটা বেঁধে নিয়েছি খাপে। মাছের ছবি আঁকা টালিগুলো যে থলেতে ভরা ছিল সেটা ঝুলছে আমার গলায়। পানিতে নেমে পায়ে হেঁটে গলা পানি পর্যন্ত এগিয়ে এলাম আমি, তারপর সাঁতার কাটতে শুরু করলাম। প্রথম দ্বীপের কাছে একবারও না থেমে পার হয়ে গেলাম, এগিয়ে চললাম দ্বিতীয় দ্বীপটার কাছে। যখন ভয় পেতে শুরু করেছি যে অন্ধকারে আবার পার হয়ে গেলাম কি এই সময় হঠাৎ করেই ভোরের প্রথম আলোয় আমার সামনে ফুটে উঠল দ্বীপটার অবয়ব। দ্বীপের ভাটির দিক দিয়ে এগিয়ে গেলাম আমি, যাতে স্রোতের অত্যাচার কিছুটা হলেও কম সহ্য করতে হয়।
এবার দ্বীপের গোড়া লক্ষ্য করে পানির নিচে ডুব দিলাম আমি, উদ্দেশ্য নদীর তলদেশ। ইতোমধ্যে বেশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে আকাশ, ফলে প্রথম দ্বীপের সাথে দ্বিতীয় দ্বীপটার তুলনা করার সুযোগ পাওয়া গেল। অবাক হয়ে দেখলাম, দুটো দ্বীপ প্রায় সব দিক দিয়েই একই রকম। একই আকৃতি, সামান্য তফাত যদি থাকে তাহলে তা খুঁটিয়ে পরীক্ষা না করে ধরার উপায় নেই। এখন আমি নিশ্চিত ধারণা করতে পারি যে এগুলো মানুষের হাতেই তৈরি, এবং এগুলোর নির্মাণকৌশলের পেছনে সম্ভবত একজন মানুষের মাথাই কাজ করেছে।
কাজটা নিশ্চয়ই প্রচুর সময় এবং শ্রমসাপেক্ষ ছিল, এবং এ থেকে কোনো সুবিধা পাওয়া গিয়েছিল বলেও মনে হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত যে দুটো দ্বীপ দেখেছি সেগুলোর কোনোটাই পানির ওপরে এত উঁচু নয় যে যোগাযোগের সংকেত পাঠানোর কাজে ব্যবহার করা যাবে। সত্যি কথা বলতে এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে মানুষের চোখ এড়ানোর জন্য যেন ইচ্ছে করেই নিচু করে তৈরি করা হয়েছে ওগুলোকে। এ ছাড়া নদীর এই জায়গাটা অনেক গভীর এবং স্রোতও প্রচণ্ড। এমন জায়গায় এই দ্বীপ তৈরি করাটা নিঃসন্দেহে সেই প্রাচীন জাতির জন্য দারুণ কঠিন একটা কাজ ছিল। এগুলো কোনো বাঁধের অংশ হতে পারে কি না সেটাও একবার ভেবে দেখলাম আমি। কিন্তু তেমন কোনো কাজের পক্ষে দ্বীপগুলোর মাঝের দূরত্ব অনেক বেশি। তা ছাড়া দুই তীরেও এমন কোনো চিহ্ন নেই, যা দেখে বোঝা যাতে পারে যে সেচ বা অন্য কোনো কাজের জন্য নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ইতোমধ্যে যথেষ্ট আলো ফুটে উঠেছে আকাশে। সেই আলোতে দেখলাম দ্বীপের গায়ে হাত এবং পা রাখার জায়গা রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে ওপরে ওঠা যায়। ওপরে উঠতে উঠতে আমি বুঝলাম এটা আসলে প্রথম দ্বীপের মতোই একটি গোলাকার স্তম্ভ, মাথাটা চ্যাপ্টা। কিন্তু প্রথম দ্বীপের মতো নষ্ট হয়ে যায়নি এর আকার-আকৃতি, অনেক অংশেই অবিকৃত আছে। ওপরে ওঠার পর দেখতে পেলাম মাটিতে এখনো পাথর খোদাই করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করার চিহ্ন রয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় যে এগুলো দক্ষ হাতের কাজ, তবে কালের বিবর্তনে ক্ষয়ে এসেছে অনেক জায়গায়। মাটি সরিয়ে পাথরের বাঁধাই খোলার চেষ্টা করলাম আমি; কিন্তু প্রতিটা পাথর একেবারে নিখুঁতভাবে কাটা হয়েছে, দুই পাথরের মাঝখানে যে ফাঁক তা দিয়ে একটা চুলও গলবে কি না সন্দেহ। কাজটা করতে গিয়ে অনেক ঝক্কি পোহাতে হলো আমাকে। কয়েক ঘণ্টা ধরে পাথর সরানোর পর সবে কোমর পর্যন্ত গর্ত খুঁড়তে পারলাম আমি। সিদ্ধান্ত নিলাম অনেক হয়েছে। এবার ক্ষান্ত দেওয়া উচিত, অন্তত শ্রমিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত কাজটা। জায়গায় জায়গায় ফেটে গেছে আমার আঙুলের নখ। নিজের হাত নিয়ে গর্ব করি আমি, নারীমহলেও নিজের হাতের যত্ন নেওয়ার জন্য সুনাম আছে আমার। মনে মনে ঠিক করলাম এটাই শেষ, এরপর আর একটা পাথরও সরাব না আমি। কিন্তু এই শেষ পাথরটার নিচে যে জিনিসটা দেখা গেল তা দেখে একেবারেই অবাক হয়ে গেলাম আমি। এখনো জিনিসটার শুধু ওপরের দিক দেখা যাচ্ছে; কিন্তু তাতেই বোঝা যাচ্ছে যে এটা একেবারেই আলাদা কিছু একটা। কাঁধের ওপর ঝুলে থাকা চামড়ার থলেটা খপ করে ধরে সামনে আনলাম আমি, তারপর ঈষৎ কাঁপা কাঁপা আঙুলে ভেতর থেকে বের করে আনলাম গানোর্ডের দেওয়া সেই পোড়ামাটির টালিটা। এইমাত্র বেরিয়ে আসা টালির ওপর রাখলাম ওটাকে। একেবারে খাপে খাপে মিলে গেল দুটো টালি।
