*
পরদিন দুপুর নাগাদ খণ্ডযুদ্ধের সব চিহ্ন ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলা হলো। নদীর তীরে পড়ে থাকা শুকনো রক্ত ঢেকে দেওয়া হলো বালি দিয়ে। নীলনদের স্রোতে ভেসে মৃতদেহগুলো সাগরের দিকে চলে গেছে। যারা বর্ম পরে ছিল তাদেরকে ওই বর্মের ওজনই টেনে নিয়ে গেছে নদীর গভীর অন্ধকার তলদেশে। সেখানে কুমির এবং নীলনদের অন্য বাসিন্দারা তাদের শেষকৃত্য সম্পাদন করবে।
আবু নাসকোসের দুর্গ-প্রাচীরের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত আমাদের শিবিরের চারপাশে অস্ত্রের দুর্ভেদ্য বলয় তৈরি করেছি আমরা। ঘোড়াগুলোকে বেঁধে রাখা হয়েছে তাদের রথের সাথে এবং দশ হাজার সৈন্যের সবাই পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। পায়ের জুতো থেকে শুরু করে মাথার ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণ পর্যন্ত সম্ভাব্য সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত রয়েছে সবাই।
বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রধান মঞ্চ পর্যন্ত কনেকে কারা এগিয়ে নিয়ে যাবে তা অবশেষে ঠিক করতে পেরেছে সেরেনা। ভালোবাসা এবং বিবাহের মিশরীয় দেবী আইসিস এবং ল্যাসিডিমনের দেবী আফ্রোদিতিকে উৎসর্গ করে তৈরি করা হয়েছে এই মঞ্চ। প্রথমে প্রত্যেক মিত্র রাজার স্ত্রীদের মাঝ থেকে একজন করে মোট ষোলোজনকে বেছে নিতে চেয়েছিল ও। কিন্তু তাতে যেসব স্ত্রীরা বঞ্চিত হয়েছে তাদের মাঝে দারুণ কোন্দল লেগে গিয়েছিল। ফলে কনের সঙ্গীর সংখ্যা প্রথমে বত্রিশে এবং পরে আটচল্লিশে তুলে আনতে বাধ্য হয় সেরেনা ও রানি তেহুতি। এখন একমাত্র সান্ত্বনা এটাই যে, এই সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে উপহারের পরিমাণও একই হারে বাড়বে। এই সমাধানে সেরেনাসহ সবাই খুশি হয়েছে। দেবীদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত মঞ্চের সামনে স্থূপাকারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে উপহারগুলো। তার পেছনে দাঁড়িয়েছে বাদকদের দল। পালাক্রমে একের পর এক রণসংগীতের বাজনা বাজাচ্ছে তারা, নীলনদের অপর তীরে অবস্থিত শত্রু শিবিরের উদ্দেশ্যে বিদ্রূপ করতে চাইছে যেন। একই সাথে আমাদের মিত্রদের সবার সাহসও উজ্জীবিত হয়ে উঠছে সেই বাজনায়।
দুপুরবেলা যত এগিয়ে এলো ততই চড়ায় উঠতে লাগল বাজনার সুর, দ্রুত হতে লাগল তাল। সেইসাথে তলোয়ারের বাঁট দিয়ে তালে তালে ঢালের ওপর আঘাত করতে লাগল সৈন্যরা আর বজ্রের মতো আওয়াজ তুলল দশ হাজার কণ্ঠের সম্মিলিত সংগীত। তারপর নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথে অটুট নীরবতা নেমে এলো চারদিকে। মনে হলো যেন সেই নীরবতার ভার সহ্য করতে না পেরে ফেটে যাবে সবার কানের পর্দা।
এবার দশ হাজার সৈন্যের দলটি নিঃশব্দে দুই দিকে ভাগ হয়ে গেল। আর সেই পথ দিয়ে বেরিয়ে এলো আমাদের মিশরের নতুন শাসক ফারাও রামেসিসের দীর্ঘদেহী সুদর্শন অবয়ব। আইসিস এবং আফ্রোদিতির উদ্দেশ্যে নির্মিত মঞ্চে নিজের নির্ধারিত স্থান গ্রহণ করার জন্য এগিয়ে এলো সে। এগিয়ে যেতে যেতে একবার কনের তাঁবুর দিকে তাকাল সে, যেখানে সেরেনাকে আড়াল করে রেখেছে তার সঙ্গিনীরা, একই সাথে এক হাত উঁচু করে ইঙ্গিত দিল। সাথে সাথে শুরু হলো গান।
প্রথমে মনে হলো যেন শান্ত সাগরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে এক ঝলক মৃদু গ্রীষ্মের গন্ধমাখা হাওয়া; এমন মৃদু স্বরে গাইতে শুরু করল সবাই। তারপর ধীরে ধীরে আনন্দের ছোঁয়া লাগল তাতে, ভালোবাসার প্রশস্তি শুরু হলো। এবার খুলে গেল মেয়েদের তাবুর দরজা। তার ভেতর থেকে নাচতে নাচতে বেরিয়ে এলো রংধনুর পোশাক পরা মেয়েদের দুটো সারি। প্রতিটি সারিতে রয়েছে পঁচিশজন। সবার পা খালি, চুল বেঁধেছে রংবেরঙের ফিতে আর ফুল দিয়ে। হাসছে আর গান গাইছে তারা, একই সাথে লিয়ার, সিথারা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে হাততালি দিচ্ছে। ডান পাশের সারির নেতৃত্ব দিচ্ছে রানি তেহুতি, আর বাম পাশের সারির নেতৃত্বে রয়েছে তার বোন বেকাথা।
দুটো সারির মাঝখানে হাঁটছে এক পুরুষ ও দুই নারী। পুরুষটি আর কেউ নয় বরং রাজা হুরোতাস, পরনে স্বর্ণ এবং বহুমূল্য পাথরখচিত পোশাক। মুকুটে চুনির অলংকরণ, জুতোয় হীরা। বেগুনি সিল্কে তৈরি হয়েছে তার পোশাক, তার। ভেতরে বাদামি অলংকরণ। মুখে চওড়া হাসি এবং তা এতই প্রাণবন্ত যে, সেই হাসি দেখে উপস্থিত সবার মুখেও হাসি ফুটে উঠল।
তার ডান পাশে রয়েছে দীর্ঘদেহী একহারা গড়নের এক নারী। লম্বায় হুরোতাসের কাঁধ সমান লম্বা হবে সে; কিন্তু মাথার ওপর থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ঢাকা রয়েছে সোনার সুতোয় বোনা কাপড়ে। দুপুরের সূর্যের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে সেই আবরণ। কিন্তু চেহারা ঢাকা থাকলেও তার মাঝ থেকে এমন অপার্থিব কমনীয়তা আর ক্ষমতা বিচ্ছুরিত হচ্ছে যে, উপস্থিত কেউই তার পরিচয় সম্পর্কে একটুও সন্দেহের অবকাশ পেল না।
দুই হাত বাড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল মিশরের ফারাও রামেসিস। রাজা হুরোতাস তার মেয়ের হাত ধরে ঘূর্ণিবায়ুর মতো ঘুরিয়ে দিল তাকে, ফলে সোনালি আবরণে ঢেউ তুলে রামেসিসের দিকে এগিয়ে গেল তার হবু স্ত্রী। রামেসিসের সামনে এসে শরীরের ঊর্ধ্বভাগ নত করে দণ্ডায়মান হলো সে। তার হাত ধরুল রামেসিস তারপর সোজা করে দাঁড় করাল। কনের মুখের সামনের আবরণটা আলতো করে ধরল সে, তারপর এক টানে সরিয়ে আনল। সবার সামনে। উন্মোচিত হলো রাজকুমারী সেরেনার শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য। মাথার সোনালি চুলগুলো মুক্তা আর স্ফটিক দিয়ে সাজানো হয়েছে তার বহু বর্ণের রেশমি পোশাক, যেন শরীরের প্রতিটি বাঁক আর অঙ্গের গঠনকে আরো প্রস্ফুটিত করে তুলেছে।
