ষোলোজন রাজার সবাই বর এবং কনের চিরন্তন সুখশান্তি কামনা করে লম্বা চওড়া বক্তৃতা রাখল, তারপর নানা রকম দামি উপহার এনে রাখল তাদের সামনে। উপহারের মধ্যে থাকল মাহুতসহ হাতির দল, জাহাজ এবং সেগুলোর দাঁড় বাইবার জন্য যথেষ্ট ক্রীতদাস, কবিতা এবং সেগুলো আবৃত্তি করার জন্য কবি; ট্রাম্পেট এবং ঢাক আর সেগুলো বাজানোর জন্য বাদক; হীরা-মুক্তা এবং অন্যান্য রত্ন আর সেগুলো সাজানোর জন্য মুকুট; দামি মদ এবং রুপার পেয়ালা, সেইসাথে সেগুলোর স্বাদ আরো বাড়িয়ে তুলতে অজস্র স্বর্ণের ভাণ্ডার।
তবে এত কিছুর মাঝেও আমাদের সবচেয়ে দক্ষ দুই শ যোদ্ধাকে আলাদা করে নিয়েছি আমি এবং দিনের বেলায় একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মদ খেতে নিষেধ করে দিয়েছি সবাইকে। অন্যদিকে হুরোতাস হুই এবং আমি মিলে নীলনদের তীরে বেশ কিছু জায়গা চিহ্নিত করেছি, যেখান দিয়ে উটেরিকের গুণ্ডাপাণ্ডারা নদী পার হয়ে অনুপ্রবেশ করতে পারে। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর রাত নেমে এলো; কিন্তু একই তালে চলতে লাগল গানবাজনা আর আনন্দ উৎসবের প্রবাহ; বরং আরো যেন বাড়ল তাদের উৎসাহ।
হুরোতাস, হুই এবং আমি- এই তিনজন মিলে আমাদের বাছাই করা সৈন্যদের নিয়ে চলে এলাম নীলনদের তীরে সেই জায়গাগুলোতে, যেগুলো দিনের বেলায় বেছে রেখেছি আমরা। রামেসিসকে ইচ্ছে করেই এ ব্যাপারে কিছু জানাইনি আমি। ওকে এখন প্রায় নিজের মতোই চিনি আমি। আজকের কথা জানতে পারলে নিঃসন্দেহে আমাদের সাথে যোগ দিতে চাইত ও। কিন্তু আগামীকাল সেরেনার বিয়ে। আমি চাই না যে ওর বিয়ের উপহারের তালিকায় রামেসিসের লাশটাও যোগ হোক।
খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না আমাদের। ঘণ্টাখানেক পরেই আমাদের পেছনে শিবির থেকে ভেসে আসা উদ্দাম উৎসবের কোলাহল কমে আসতে শুরু করল। পরবর্তী এক ঘণ্টার মধ্যেই থেমে গেল সব। সন্দেহ নেই উটেরিকের সৈন্যরা বেশ ভালো সময়ই বাছাই করেছে। অবশ্য উটেরিক নিজে তাদের সাথে এই নৈশ-আক্রমণে যোগ দেবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম বলেই মনে হয় আমার।
দূরে নদীর অপর তীরে অন্ধকারের মাঝে উঁকি দিয়েছে এক টুকরো হলদে চাঁদ, তার প্রতিফলন নাচছে নদীর বুকে। সেই আলোতে আবু নাসকোসের দিক থেকে এক দল ছোট নৌকা এগিয়ে আসতে দেখলাম আমরা। আমাদের দিকেই আসছে তারা।
সরাসরি বাঘের মুখে এসে পড়বে ব্যাটারা, আমার পাশ থেকে মৃদু স্বরে হেসে উঠল হুরোতাস। আমি নিজেও এত ভালোভাবে সাজাতে পারতাম না সব কিছু।
আমার তা মনে হয় না, ফিসফিস করে জবাব দিলাম আমি। আমাদের কাছ থেকে কমপক্ষে তিন কিউবিট উজানে রয়েছে ওরা।
দূরত্বটা খুব বেশি নয়, সুন্দরী একটা মেয়ের দুই পায়ের মাঝখানের দূরত্বের সমান বলতে পারো, বলল হুরোতাস। এটুকু দূরত্ব মেনে নিতে কোনো আপত্তি নেই আমার।
ওদেরকে আরো একটু কাছে আসার সুযোগ দিলাম আমি। নৌকাগুলো আমাদের কাছাকাছি এগিয়ে এলো। তীরের কাছাকাছি আসতেই লাফ দিয়ে কোমর পানিতে নেমে পড়ল সামনের নৌকার লোকগুলো, তারপর নৌকাগুলোকে টেনে টেনে তীরের দিকে নিয়ে আসতে লাগল।
এইবার? হুরোতাসকে প্রশ্ন করলাম আমি।
এইবার! সম্মতি জানাল হুরোতাস। মুখের মধ্যে দুই আঙুল পুরে তীক্ষ্ণ একটা শিস বাজালাম আমি। এতক্ষণ ধনুকে তীর জুড়ে অপেক্ষা করছিল আমাদের তীরন্দাজরা। আমার সংকেত শুনতে পেয়েই একসাথে তীর ছুড়ল তারা। রাতের বাতাস কেটে দিয়ে ছুটল তীরবৃষ্টি। তার পরেই শোনা গেল মানুষের দেহে তীর বিদ্ধ হওয়ার ভেতা আওয়াজ এবং আহতদের আর্তনাদ। এক এক করে পানিতে ডুবে যেতে লাগল তারা।
প্রলয় বয়ে গেল যেন উটেরিকের পাঠানো বাহিনীর ওপর দিয়ে। কয়েকটা নৌকা ঘুরে পালানোর চেষ্টা করল এবং ফলশ্রুতিতে ধাক্কা খেল পেছনের নৌকাগুলোর সাথে। এভাবে ডুবে গেল বেশ কয়েকটা নৌকা। বর্মের ভারে অসহায়ভাবে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে চিৎকার করে সাহায্য চাওয়ার জন্য খুব সামান্যই সময় পেল লোকগুলো। বাকিদের চিৎকার আরো প্রলম্বিত হলো, এবং আমাদের তীরন্দাজরা এক এক করে ঘায়েল করল তাদের।
এবার আমাদের দলের আরো কয়েকজন জুলন্ত মশাল হাতে সামনে এগিয়ে গেল, আগুন ধরিয়ে দিল নদীর তীরে স্তূপ করে রাখা শুকনো কাঠে। আজ বিকেলেই এগুলো কিছু দূর পরপর স্কুপ করে রেখেছিলাম আমরা। এক নিমেষে জ্বলে উঠল কাঠ, আগুনের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠল রাতের আকাশ। উটেরিকের বাহিনীর নৌকা এবং নৌকার আরোহীদের স্পষ্ট দেখা যেতে লাগল সেই আলোতে। এতক্ষণ অন্ধকারের মাঝে তীর ছুড়ছিল আমাদের তীরন্দাজর ফলে প্রচুর তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু এবার তাদের নিশানা হয়ে উঠল আরো নির্ভুল। পশ্চিম তীর থেকে যতগুলো নৌকা এসেছিল তার মাঝে অর্ধেকও ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেল না। যেগুলো ফিরে যেতে পারল সেগুলোর আরোহীদের অনেকেই নিহত হলো, বাকিরা হলো আহত।
এবার ধনুক সরিয়ে রেখে অগভীর পানিতে নেমে পড়ল আমাদের সৈন্যরা, কোমর থেকে খুলে নিল ছুরি। যারা আহত হয়েছিল তাদের ব্যবস্থা করা হলো এবার। মৃতদেহগুলো ভাসিয়ে দেওয়া হলো স্রোতে আর না হয় বর্মের ওজনে নিজে থেকেই ডুবে গেল পানিতে।
আগামীকাল এই জায়গাতেই এক আনন্দঘন বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে এবং সেটা মাথায় রেখেই কাজ করলাম আমরা। আহতদের গোঙানি আর আর্তনাদ এবং মৃতদেহের দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠুক, এমনটা কারো ইচ্ছে নয়।
