সাঁতার কাটতে অবশ্য তেমন কোনো অসুবিধা হলো না আমার। সাঁতরাতে সাঁতরাতে প্রথম দ্বীপে যা যা দেখেছি তা নিয়ে চিন্তা করার একটা অবকাশ পাওয়া গেল। দুটো জিনিসকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে এবং বারবার ফিরে আসছে আমার চিন্তার ভেতরে। প্রথমটা হলো দ্বীপটার অদ্ভুত গঠন। দ্বিতীয় ব্যাপারটা হচ্ছে সবুজ রঙের মাটির ওই টালির টুকরোটা, যেটা আমার নিতম্বে খোঁচা মেরেছিল। গানোৰ্ড অদৃশ্য হওয়ার আগে যে টালিটা আমাকে দিয়ে গিয়েছিল তার সাথে হুবহু মিলে যায় ওই টুকরোটা।
সাঁতার কাটতে কাটতে এই দুটো ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম আমি। মোটামুটি অর্ধেক পথ পার হয়ে আসার পর প্রথম সম্ভাবনাটা উঁকি দিল আমার মাথায় অথবা বলা যায় যে প্রথম অসম্ভব ধারণাটা মাথায় এলো। ধারণাটা এতই অদ্ভুত যে উচ্চ স্বরে বলে উঠলাম আমি, এমন কি হতে পারে যে দ্বীপটা আসলে প্রাকৃতিক নয়, বরং সেই প্রাচীন জাতির রেখে যাওয়া কোনো স্থাপত্যের চিহ্ন?
উত্তেজনার চোটে এক ঢোক পানি খেয়ে ফেললাম আমি, সেটাকে বের করে দেওয়ার জন্য খক খক করে কেশে উঠতে হলো। তবে ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ধারণাটা চলে এসেছে আমার মাথায়। আর তাই যদি হয়ে থাকে, বলে উঠলাম আমি, তাহলে বাকি তিনটে দ্বীপও কি তারা একই নিয়ম মেনে তৈরি করেছিল? কিন্তু এমন একটা অদ্ভুত কাজ কেন করবে তারা?
তৃতীয় সম্ভাবনাটা নিয়ে চিন্তা করতে করতে সাঁতরে চললাম আমি। আরো একবার জবাবটা খেলে গেল আমার মাথায় এবং এবারও গানোর্ডের কাছ থেকে জানা তথ্যের ভিত্তিতেই বেরিয়ে এলো সেটা। হয়তো তারা দ্রুত এবং গোপনে নদী পার হওয়ার একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল, যাকে বলা যেতে পারে জাদুবিদ্যা? সাঁতার থামিয়ে পানিতে ভেসে ভেসে ব্যাপারটার সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম আমি। আমার ধারণা মতে প্রাচীন সেই জাতির লোকেরা নীলনদের ওপর দিয়ে নৌকা বা সেতুর মাধ্যমে পার না হয়ে বরং নদীর নিচ দিয়ে অতিক্রম করার একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। এমন অদ্ভুত চিন্তা অবশ্য মাঝে মাঝেই খেলা করে আমার মাথায়। মাঝে মাঝে এটাও ভাবি যে, মানুষের পক্ষে আকাশে ওড়া সম্ভব কি না। যদিও মানুষের শরীরে কখনো পাখা গজানো সম্ভব নয় এটা বোঝার পর চিন্তাটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাদ দিতে হয়েছে আমাকে। তবে এটা ঠিক যে আমার পক্ষে এক ডুবে নদীর তলদেশ পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব, গত এক ঘণ্টায় সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে। কিন্তু এক ডুবে নদীর এ পার থেকে ও পার পর্যন্ত যাওয়ার কথা চিন্তা করতে গিয়ে এমনকি আমার মনও হোঁচট খেল। দূরত্বটা কম নয়, প্রায় দেড় লিগ। যদিও পানির ওপর দূরত্বের সঠিক পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এমনকি পানিতে চলমান কোনো জাহাজ অথবা কোনো সঁতারুর গতিও মাপা অসম্ভব। এই সব চিন্তা মাথায় নিয়েই হুরোতাসের শিবিরের সামনে নদীর পাড়ে এসে উঠলাম আমি। কোমর পানিতে এসে হেঁটে হেঁটে ডাঙায় উঠছি, এই সময় সেরেনার সুরেলা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, ডাকছে আমার নাম ধরে। টাটা, তুমি জানো না যে নদীর এই তীরে কুমির এবং তার চাইতেও অনেক ভয়ংকর সব মানুষের আড্ডাখানা? বরাবরের মতোই আমার সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় ঠিকই কীভাবে যেন হাজির হয়ে গেছে ও। আমাকে পানি থেকে উঠতে সাহায্য করার জন্য দ্রুত এগিয়ে এলো ও। রামেসিসও ওর সাথেই ছিল, সেও আমাকে সাহায্য করল।
যদিও গতকালই ওদের সাথে দেখা হয়েছে আমার, তবু দারুণভাবে ওদের অভাব বোধ করছিলাম। বোঝা যাচ্ছে যে আরো একবার আমার জীবন বাঁচাতে পেরেছে ভেবে দুজনই বেশ খুশি খুশি বোধ করছে। এখন কোনোমতে শুকনো মাটিতে পা রাখতে পারলেই হয়, আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে পারি আমরা।
বিয়ের জন্য একটা দিন ঠিক করেছি আমরা রুদ্ধশ্বাসে বলতে শুরু করল রামেসিস।
এবং সেটা হচ্ছে পরশু দিন দুপুরে! ওর মুখ থেকে বাকি কথাটুকু কেড়ে নিল সেরেনা। আশা করি এই বিয়েটাও আমার পড়ানো বিয়েটার মতোই সুন্দর হবে, বললাম আমি।
কোনো কিছুই ওই বিয়ের ধারে কাছে যেতে পারবে না টাইটা। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে আমাকে চুমু খেল সেরেনা।
*
বিয়ের সব ঝামেলা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হলো যুদ্ধের সকল প্রস্তুতি। অবশ্য উটেরিক বুবাস্টিস যদি আমাদের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে চায় তাহলে আমরাও তার জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। কোমর থেকে কখনো তলোয়ারের খাপ খুলছি না আমি, এমনকি সুন্দরী মেয়েদের সাথে নাচার সময়ও না। রামেসিসের সভাইকে যে কখনো বিশ্বাস করা যায় না। এটা আমার চাইতে ভালো আর কেউ জানে না। নীলনদের অপর পারে দুর্গ-প্রাচীরের ওপর ভিড় জমিয়েছে শত শত কৌতূহলী মাথা। উটেরিক এবং তার অনুচররা নজর রেখেছে আমাদের ওপর, বোঝার চেষ্টা করছে যে এত গানবাজনা আর নাচের আয়োজন আসলে কীসের উদ্দেশ্যে।
এই তীরের সকল মহিলা তাদের মাথায় পরেছে ফুলের মুকুট। অপেক্ষাকৃত অল্পবয়স্ক এবং সুন্দরী মেয়েদের সবার দেহের উর্ধ্বাংশ উন্মুক্ত এবং বলার অপেক্ষা রাখে না যে ব্যবস্থাটা দারুণ পছন্দ হলো আমার। মদের বোতলগুলো যত হাত বদল হতে লাগল ততই উদ্দাম হয়ে উঠল নাচের ছন্দ, উচ্চকিত হয়ে উঠল বাজনা। আরো খোলামেলা হয়ে উঠল গায়কদের গানের কথা। মেয়েদের মধ্যে যারা একটু অভিজ্ঞ তারা তাদের প্রেমিক অথবা প্রেমিকদের নিয়ে জঙ্গলের মাঝে অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল, যখন ফিরে এলো তখন অদ্ভুত এক আনন্দে ঝলমল করছে তাদের চেহারা।
