আমি বুঝতে পারছি অদ্ভুত কিছু একটা আছে এখানে। ইনানা এবং আমার সম্পর্কটা বেশ খাপছাড়া, তবে আমি জানি যে দরকার পড়লে তার ওপর নির্ভর করা যায়। আমাকে কখনো ঠকায়নি সে, যদি ঠকিয়েও থাকে তাহলে তার কথা আমার জানা নেই। আরো ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজির পর একটু বিশ্রাম নিতে বাধ্য হলাম আমি। একটা বুনো ডুমুর গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে ধপ করে বসে পড়লাম মাটিতে।
এখানে কী পাবে বলে আশা করেছিলে? নিজেই প্রশ্ন করলাম নিজেকে। একা থাকলে প্রায়ই নিজের সাথে জোরে জোরে কথা বলি আমি। প্রশ্নটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম মাথার ভেতর। তারপর চিন্তাভাবনা করে জবাব দিলাম, কিছুই আশা করিনি। কিন্তু ভেবেছিলাম প্রাচীন সেই জাতির কাছ থেকে কোনো একটা চিহ্ন বা বার্তা পাওয়া যাবে। প্রাচীন জাতি বলতে হাজার বছর আগে এখানে যারা বাস করত তাদেরকে বোঝাচ্ছি আমি।
হাতের আঙুলে হুল ফোঁটার মতো কোনো চিহ্ন? প্রশ্নটা আমার মুখ থেকে বের হলো ঠিকই; কিন্তু আমি বলিনি কথাটা। দারুণ অবাক হয়ে এদিক-ওদিক তাকালাম এবং দেখতে পেলাম তাকে। আমার দৃষ্টিসীমার ঠিক এক কোণে গাছপালার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সে। ছায়ার মাঝে যেন আরেকটা ছায়া। কিন্তু এক পলকেই আমি চিনতে পারলাম তাকে, কোনো ভুল হলো না।
*
ইনানা! বলে উঠলাম আমি। সাথে সাথে হেসে উঠল সে জলতরঙ্গের মতো সুমধুর বুলবুল পাখির মতো মিষ্টি গলা। তারপর আবার কথা বলে উঠল, তবে এবার আর আমার কণ্ঠে নয়; বরং তার নিখুঁত কণ্ঠই শুনতে পেলাম আমি।
যা খুঁজছ তা যদি দষ্টির সামনে না থাকে তাহলে এমন জায়গায় খোজো যেখানে দৃষ্টি দিয়ে সামনে এগোনো যায় না। আবার হেসে উঠল সে, তারপর হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তার উদ্দেশ্যে দুই হাত বাড়িয়ে দিলাম আমি; কিন্তু তাকে ধরার কোনো উপায় নেই।
আমি জানি, তার পিছু ধাওয়া করে বা নাম ধরে ডেকে কোনো লাভ নেই। এর আগে বহুবার এই কাজ করেছি আমি, কখনো কাজ হয়নি। অগত্যা আবার বসে পড়লাম আগের জায়গায়। নিজেকে কেমন যেন প্রতারিত মনে হচ্ছে।
তার পরেই অনুভব করলাম তীক্ষ্ণ কী যেন বিধল আমার শরীরে। যে জায়গায় ব্যথা লেগেছে অর্থাৎ আমার দুই নিতম্বের ঠিক মাঝখানটায় সেখানে হাত বাড়িয়ে দিলাম। হাঙরের দাঁতের মতো ধারালো শক্ত কিছু একটা বিঁধে আছে সেখানে। দুই আঙুলে ধরে সেটাকে টেনে বের করে আনলাম আমি, ব্যথা লাগতেই কুঁচকে উঠল মুখ।
জিনিসটা এবার সাবধানে ধরে রেখে চোখের সামনে তুলে আনলাম আমি। সাথে সাথে লাফ দিয়ে উঠল আমার হৃৎপিণ্ড, রক্ত চলাচল দ্রুত হয়ে উঠল। কাঁধের ওপর হাত বাড়িয়ে পিঠ থেকে চামড়ার থলেটা খুলে আনলাম আমি, যেটার মধ্যে গানোর্ডের দেওয়া সেই মাটির তৈরি মাছটা রয়েছে।
নিখুঁত টালিটা হাতের তালুতে রাখলাম আমি, তারপর নিতম্বে বিধে থাকা ধারালো টুকরোটা নিয়ে সেটার পাশে রাখলাম। টালির একটা কোনার চেহারার সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যাচ্ছে ধারালো জিনিসটা।
যেই জায়গাতে টুকরোটা ভেঙে এসেছে সেখানটা ক্ষুরের মতো ধারালো এবং সুইয়ের মতো তীক্ষ্ণ। এখনো আমার পেছন থেকে বের হওয়া এক ফোঁটা রক্ত লেগে আছে তাতে। অন্য প্রান্তটা চওড়া এবং আমার হাতে ধরে রাখা আস্ত টালির গায়ে আঁকা মাছের মাথার মতো হুবহু একই রকম একটা মাথা আঁকা রয়েছে তাতে।
ভাঙা টুকরোটা প্রথম টালির ওপর রাখতেই দুটো নিখুঁতভাবে মিলে গেল। খুব সম্ভব হাজার বছর আগে একই ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হয়েছিল এ দুটোকে। একটা অক্ষত অবস্থায় এসে পৌঁছেছে আমার হাতে, আরেকটার একটা ভাঙা অংশ এখন খুঁজে পেয়েছি আমি।
প্রাচীন সেই মানুষেরা যে আমার আগেই এই দ্বীপে এসে পৌঁছেছিল এটা তারই চিহ্ন বলে ধরে নিলাম আমি। নিজেদের চিহ্ন রেখে গেছে তারা। এটাও বুঝতে পারছি যে তারা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে আমার কাছে। আস্ত টালিটা এক হাতে নিলাম আমি, ভাঙা টালিটা নিলাম অন্য হাতে। তারপর সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করলাম তাদের ওপর। বেশ কিছুটা সময় কিছুই ঘটল না, তারপর আস্ত টালিটার পেছনে আঁকা চারটে ছিদ্র যেন ধীরে ধীরে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল, জ্বলজ্বল করে উঠল ছোট ছোট তারার মতো।
চার! সংখ্যাটা ফিসফিস করে উচ্চারণ করলাম আমি, বুঝতে পারছি যেকোনো একটা সমাধান আমার হাতের খুব কাছেই অপেক্ষা করছে। এক কিংবা দুই নয়, চার… হঠাৎ করেই থেমে গেলাম, কারণ অর্থটা এবার ধরা দিয়েছে আমার সামনে। ছিদ্রগুলো আমাকে বলতে চাইছে যে একটা নয় বরং চার চারটে দ্বীপ আছে এখানে। প্রথম দ্বীপে যদি সমাধান পাওয়া না যায় তাহলে বাকি তিনটে দ্বীপেও খুঁজে দেখতে হবে আমাকে!
টালি দুটোকে গলার সাথে সুতো দিয়ে বাঁধা চামড়ার থলেতে ভরে রাখলাম আমি তারপর লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছোট্ট দ্বীপটার পশ্চিম পাশে চলে এলাম। এখান থেকে বাকি তিনটে দ্বীপ এবং আবু নাসকোসের দুর্গ-প্রাচীর দেখা যাচ্ছে। তবে গাছের আড়াল থেকে মুখ বের করেই আবার সরিয়ে নিতে হলো আমাকে, কারণ আমার ঠিক সামনেই যে দ্বীপটার রয়েছে সেটাকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে শত্রুদের দুটো পাহারাদার নৌকা। বেশ বড় নৌকা, প্রতি পাশে এক জোড়া করে দাঁড়। প্রতিটা দাঁড় বাইছে দুজন লোক। মাস্তুলগুলোতে এখন পাল খাটানো নেই ঠিক; কিন্তু তার বদলে প্রত্যেক নৌকাতে রয়েছে দুজন করে তীরন্দাজ। সবার হাতে ধনুক তাতে তীর জোড়া। দ্বিতীয় দ্বীপের গায়ে জন্মানো ঘন জঙ্গলগুলো পরীক্ষা করে দেখছে তারা। আমার চোখের সামনেই সবচেয়ে কাছের নৌকাটা মুখ ঘুরিয়ে এদিকে আসতে শুরু করল। বুকে হেঁটে পিছিয়ে এলাম আমি, তারপর একটু আড়ালে এসেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক দৌড়ে চলে এলাম দ্বীপের অন্য পাশে। এখান থেকে এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়লাম নদীতে, তারপর পানিতে মাথা তুলেই সমস্ত শক্তি দিয়ে হুরোতাসের শিবির লক্ষ্য করে সাঁতার কাটতে শুরু করলাম। মনে হলো যেন শত্রুরা জানত যে আমি ওখানে রয়েছি, আমাকে খুঁজতেই এসেছিল তারা। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই, হয়তো নৌকাগুলোর ওখানে হাজির হওয়ার ঘটনাটা নেহাতই কাকতালীয়।
