ছিদ্রগুলো গুনে দেখলাম আমি। সব মিলিয়ে চারটি: মাছের লেজের পেছন বরাবর দুটো আর দুটো রয়েছে নাকের সামনে। এগুলো কী কারণে তৈরি করা হয়েছে বোঝার চেষ্টা করলাম; কিন্তু কোনো তল পেলাম না। ফলে মেজাজ খারাপ হতে শুরু করল। বুঝতে পারছি যে কিছু একটা আমার হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু ধরতে পারছি না। আবার ক্ষুধা লেগে গেল এবার। এক দৌড়ে শিবিরে ফিরে এলাম আমি, রান্নাবান্না যেখানে হয় সেদিকটায় চলে এলাম। গতকালের কিছু ঠাণ্ডা সসেজ রয়েছে বাবুর্চিদের কাছে। তেলতেলে, লবণও বেশি। কিন্তু তার পরও সবকটা সাবাড় করলাম আমি। মনে হচ্ছে দেবতারা আমাকে নিয়ে মজা করছে, এবং এটাই প্রথমবার নয়। তাদের কাছে হার মানার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।
খাওয়া শেষ হতে আবার নদীর পাশে সেই পাথরটার ওপর ফিরে এলাম আমি। বিস্বাদ সসেজ খাওয়ায় একটু পর পর কটু ঢেকুর উঠছে। আরো একবার জামার নিচ থেকে বের করে আনলাম মাছের ছবি আঁকা টালিটাকে। সূর্যের দিকে উঁচু করে ধরে ঘোরাতেই সেই চারটে ছিদ্র আবার দেখা গেল। টালিটা নামিয়ে রেখে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি।
নদীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট প্রায় একই রকম দ্বীপগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে আমার চোখ। সবুজ পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে তারা। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার সামনে যে রহস্য রয়েছে তার সাথে তো ওদের কোনো সম্পর্ক নেই… নাকি আছে?
হঠাৎ করে মৃদু উত্তেজনার শিহরণ বয়ে গেল আমার, শরীরে রোম খাড়া হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম নদীর বুকে দ্বীপের সংখ্যা হচ্ছে চার, যেটা একই সঙ্গে আমার হাতে ধরে রাখা টালির মাঝে দেখা ছিদ্রগুলোর সংখ্যাও বটে। হয়তো একেবারেই তাৎপর্যহীন একটা ব্যাপার; কিন্তু চার হচ্ছে দেবী ইনানার সংখ্যা, যে আমার রক্ষাকারী দেবী। বুঝতে পারলাম, ওই চারটি দ্বীপের অন্তত একটাতে যেতেই হবে আমাকে।
ইচ্ছে করলে একটা নৌকা নিয়ে এক ঘণ্টার ভেতরেই প্রথম দ্বীপটায় পৌঁছে যেতে পারি আমি। কিন্তু আমার জানা আছে নদীর অন্য পাড়ে অবস্থিত দুর্গ প্রাচীরের ওপর থেকে এই দিকে শ্যেনদৃষ্টি রেখেছে শত্রুরা। নৌকার চাইতে বরং আমার সাঁতারের গতি বেশি দ্রুত, এবং অন্য পাড় থেকে দেখলে আমার মাথাটাকে ভোঁদড়ের মাথা বলে ভুল করবে যে কেউ। চিন্তাগুলো মাথার ভেতর পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ার আগেই কাপড় ছাড়তে শুরু করলাম আমি।
কাপড় ছাড়া শেষ হতে নদীর তীর ধরে এগোতে শুরু করলাম। পানির কাছ থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখেছি, যাতে আবু নাসকোসের দুর্গ-প্রাচীর থেকে আমাকে দেখা না যায়। সবচেয়ে কাছের দ্বীপটা যখন আমার এবং দুর্গ প্রাচীরের ঠিক মাঝখানে চলে এলো তখন নদীর কিনারের দিকে এগিয়ে গেলাম আমি, তারপর পানিতে নেমে পড়লাম। গলা পানিতে নেমে এসে একবার দেখে নিলাম যে গলায় ঝোলানো থলেটা ঠিকঠাক আছে কি না। ছুরিভরা খাপটা অন্তর্বাসের সাথে বেঁধে নিয়েছি। এবার সেটাকে খাপ থেকে বের করে বুড়ো আঙুলে ঠেকিয়ে ধার পরীক্ষা করে নিলাম। যথেষ্ট ধার রয়েছে ওটাতে। ছুরিটা আবার খাপে ঢুকিয়ে টালিসহ থলের সুতোটা গলার সাথে এমনভাবে বেঁধে নিলাম যেন ওটা ঠিক আমার পিঠের সাথে আটকে থাকে। সামনের দিকে থাকলে সাঁতার কাটার সময় হাতে জড়িয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
এবার তীর থেকে সরে এসে সাঁতার কাটতে শুরু করলাম আমি, লক্ষ্য সবচেয়ে কাছের দ্বীপটা। লক্ষ্য রাখছি যেন আমার হাত বা পায়ের বাড়িতে কখনো পানির ওপর আলোড়ন না ওঠে। স্রোতের বিরুদ্ধে কোনাকুনিভাবে উল্টো ঠেলে এগোতে হচ্ছে আমাকে, যাতে দ্বীপটা সব সময় আমার এবং দুর্গের মাঝখানে থাকে।
দ্বীপের কাছে পৌঁছানোর পর পানির ওপর ঝুলে থাকা একটা লিয়ানা লতা ধরে ফেললাম আমি, তারপর পা দিয়ে তলা খুঁজতে লাগলাম। এবং এখানেই প্রথমবারের মতো অবাক হতে হলো আমাকে। তলা নেই! দ্বীপের কিনারটা যেন খাড়া নেমে গেছে নদীর তলদেশ বরাবর। অগত্যা লতাটা ধরে ঝুলে থেকে কয়েকবার লম্বা দম নিলাম আমি। তারপর লতা ছেড়ে দিয়ে বুনো হাঁসের মতো মাথা নিচু করে ডুব দিলাম পানির ভেতর। ঘোলা পানির মাঝ দিয়ে নেমে চললাম নিচে, আশা করছি যেকোনো মুহূর্তে নদীর তলদেশের দেখা পাব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুসফুঁসে ব্যথা শুরু হতে হাল ছেড়ে দিয়ে ওপরে উঠে আসতে বাধ্য হলাম আবার।
পানির ওপর মাথা তুলে আবার লতাটা চেপে ধরলাম, তারপর বুক ভরে টেনে নিলাম মিষ্টি বাতাস। একটু দম ফিরে পেতে এগিয়ে গেলাম দ্বীপটার পাথুরে পাড়ের দিকে। গাছের শিকড় আর ডাল ধরে ধরে নিজেকে টেনে তুললাম ওপরে, উঠে পড়লাম সমতল পিঠের ওপর। এখানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। তারপর ঘন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে বৃত্তাকারে চক্কর দিতে শুরু করলাম দ্বীপের কিনার ঘিরে, যতক্ষণ না আবার আগের জায়গায় এসে পৌঁছলাম।
এবার আমি বুঝতে পারলাম দ্বীপটা আসলে আকৃতিতে গাছের গুঁড়ির মতো অন্যান্য সাধারণ দ্বীপের মতো ঢিবি আকৃতির নয়। পানির নিচে এবং ওপরে দুই জায়গাতেই এটা সম্পূর্ণ খাড়াভাবে ওপরে উঠে গেছে। ওপরের অংশটা চ্যাপ্টা গোলাকার। এমন কোনো দ্বীপের কথা আগে কখনো শুনিনি আমি, দেখা তো দূরের কথা। ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুলল আমাকে; কিন্তু ঘন জঙ্গলে কারণে দ্বীপের সঠিক আকার-আকৃতি আন্দাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার এ পাশ থেকে ও পাশে পায়ে হেঁটে দেখলাম। মাঝে মাঝে ওল্টানো গাছের গুঁড়ি পার হতে হলো, কখনো খালি হাতে মাটি খুঁড়ে দেখলাম নিচে কোনো পাথুরে স্তরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় কি না। কিন্তু গাছপালা আর ঝোঁপঝাড়ের শিকড়ের জাল বিছিয়ে রয়েছে মাটির নিচে, সেগুলোকে খালি হাতে ভেদ করা প্রায় অসম্ভব। সঙ্গে থাকা ছুরিটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেও বিশেষ লাভ হলো না। বহু বছরের পুরনো এগুলো, অত্যন্ত শক্ত।
