ভোঁদড়ের চামড়া দিয়ে একটা থলে তৈরি করলাম আমি, যার মাঝে মাটির টুকরোটা নিখুঁতভাবে এঁটে যায়। তারপর টালিটাকে থলের ভেতর ভরে একটা সুতোয় বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে নিলাম। আমার জামার ভেতর ঝুলে রইল জিনিসটা। চিন্তাভাবনা করার সময় টালিটাকে আনমনে আঙুলের মাঝে নাড়াচাড়া করতে বেশ ভালো লাগে।
পরবর্তী কয়েক দিন নদীর তীরে একা একা ঘুরে বেড়ালাম আমি। তবে কখনোই নিঃসঙ্গ বোধ করলাম না। নীলনদের সন্তান আমি, যদিও আমার জন্মতারিখ আমি নিজেও জানি না। তবে এটা জানি যে জন্মের দিন থেকেই নীলনদকে আমার বন্ধু বলে জেনে এসেছি আমি। এই বিশাল স্রোতস্বিনীকে ভালোবাসি আমি, এবং অনুভব করতে পারি যে সেও ভালোবাসে আমাকে।
নদীর তীরে একটা গাছের ছায়ায় আরামদায়ক একটা জায়গা খুঁজে নিয়ে সেখানে বসে পড়লাম আমি। এখান থেকে পশ্চিম তীরে অবস্থিত আবু নাসকোস শহরের দুর্গটাকে দেখা যায়। এবং এখানেই নীলনদের মাঝখানে কয়েকটা ছোট ছোট দ্বীপ দেখা যায় এক সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। সবগুলো দ্বীপের ওপরেই গজিয়েছে বড় বড় গাছ আর বুনো লিয়ানা লতা। এখানে নদী প্রায় দেড় লিগ চওড়া এবং দ্বীপগুলোর মাঝে প্রায় পোয়া লিগ দূরত্ব বিদ্যমান। আমার মনে হলো খুব বেশি হলে আধাঘণ্টার মধ্যেই সাঁতার কেটে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে পারব আমি। তার পরেই আনমনে হেসে উঠে মাথা ঝাঁকালাম। এমন কাজ করার তো কোনো দরকার পড়েনি আমার।
চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালাম। বরাবরের মতোই সোনালি মাছটা ছিল আমার ডান হাতে। কিন্তু হঠাৎ করে যেন বুড়ো আঙুলে হুল ফোঁটাল ওটা। ব্যথা এবং বিস্ময়ে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো আমার মুখ দিয়ে। মনে হলো যেন বোলতার হুল, তবে ও রকম ব্যথা লাগল না। টালিটা বাম হাতে নিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা পরীক্ষা করে দেখলাম আমি। এমন কোনো দাগ নেই, যা দেখে বোঝা যেতে পারে যে এখানে হুল বা এমন কিছু ফুটেছে। ব্যথাটাও দ্রুত মিলিয়ে গেল। অগত্যা ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশি মাথা না ঘামিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শিবিরে ফিরে এলাম আবার।
সেদিন সন্ধ্যায় তেহুতি আমাকে দাওয়াত করল তার এবং হুরোতাসের সাথে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। রামেসিস আর সেরেনাও থাকল তাদের সাথে। গত কয়েক দিনে ওদের সাথে আমার দেখাই হয়নি। সবাই মিলে বেশ সুন্দর একটা সন্ধ্যা কাটালাম, আসন্ন বিয়ের প্রস্তুতি সম্পর্কিত আলোচনায় পার হয়ে গেল সময়টা।
পরদিন সকালে সূর্যোদয়ের আগেই ঘুম ভেঙে গেল আমার। দ্রুত কাপড় পরে নিলাম আমি, তারপর এগিয়ে চললাম নীলনদের তীর বরাবর তৈরি হওয়া পায়ে চলা পথ ধরে। দ্বীপগুলোর কাছাকাছি এসে গতকাল বিকেলে যেখানে বসেছিলাম সেই একই মসৃণ পাথরটার ওপর বসলাম। অত্যন্ত শান্ত একটা পরিবেশ বিরাজ করছে এখানে। অনেকটা আনমনেই টালিটা আমার গলায় ঝোলানো চামড়ার থলে থেকে বের করে আনলাম, তারপর আঙুলে ঘষতে শুরু করলাম সেটাকে। আমার মাথার ওপর গাছের ডালে বাসা বাঁধছে এক দল পাখি। জানি না ঠিক কতক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমি। তবে একসময় ক্ষুধার্ত বোধ করতে শুরু করলাম। মনে পড়ল সকাল থেকে এখনো কিছু খাওয়া হয়নি।
উঠে দাঁড়ালাম আমি। সাথে সাথে টালিটা দারুণ জোরে হুল ফোঁটাল আমার হাতে। দারুণ চমকে উঠে ওটাকে হাত থেকে ছেড়ে দিলাম আমি, ব্যথা পাওয়া আঙুলটা মুখে পুরে চুষতে লাগলাম। আমার গলায় বাঁধা সুতোর সাথে ঝুলতে লাগল ওটা। এবং এবারই প্রথম বুঝতে পারলাম এর মাঝে আসলে অলৌকিক কোনো ক্ষমতা আছে। এক আঙুলে আরেকবার স্পর্শ করলাম ওটাকে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। বুড়ো আঙুল এবং তর্জনীর মাঝে নিয়ে ঘষতে লাগলাম, প্রতি মুহূর্তে আশা করছি যে আরো একবার হুলের খোঁচা খেতে হবে। কিন্তু এবারও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। ওদিকে এতক্ষণে আমার ক্ষুধা উধাও হয়ে গেছে। এখন আর খাবারের চিন্তা নেই আমার মাথায়, অন্য চিন্তা এসে ভর করেছে তার বদলে।
এবার একটু সরে এসে অন্য একটা জায়গায় বসলাম আমি, যাতে সূর্যের আলোটা সরাসরি টালির ওপর এসে পড়ে। এমনভাবে ওটাকে পরীক্ষা করতে লাগলাম, যেন জীবনে প্রথমবার দেখছি জিনিসটা, আগে কখনো দেখিনি। মাছের শরীরের আঁশগুলো গুনে দেখলাম। মাছের পাখনা এবং লম্বা লেজটাও একইভাবে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলাম; কিন্তু কোনো রহস্যময় নিগূঢ় তথ্য ধরা দিল না আমার সামনে। এবার টালির উল্টো দিকটাও ভালো করে পরীক্ষা করলাম। এই দিকটায় কোনো লেখা হায়ারোগ্লিফ বা কিউনিফর্ম তো দূরের কথা, সামান্য একটা আঁচড়ের দাগ পর্যন্ত নেই। তবে জিনিসটা আবার সোজা করে ধরার সময় একটা ব্যাপার চোখে পড়ল আমার, যেটা এর আগে আমার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। সূর্যের আলোর দিকে বিশেষ একটা কোণ করে না ধরলে এটা বোঝার কোনো উপায় নেই। টালির পেছন দিকে অর্থাৎ মাছের ছবি যেদিক আঁকা রয়েছে তার উল্টো দিকে কয়েকটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র গর্ত রয়েছে। খুব সম্ভব টালিটা বানানোর পর আগুনে পোড়ানোর আগে কোনো সরু সুইয়ের মাথা দিয়ে খোঁচা মেরে গর্তগুলো তৈরি করা হয়েছিল। আলোর দিক বদল করতেই আবার অদৃশ্য হয়ে গেল ফুটোগুলো। আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে আবার দেখা গেল সেগুলোকে।
