আমার কাপড়চোপড়ের বেহাল দশা দেখে আমাকে একপাশে টেনে নিয়ে গেল রানি হ্যাগনে। নিজের শরীর থেকে রাজকীয় গাউন খুলে ফেলল সে, তারপর আমাকে দিয়ে বলল, এই মুহূর্তে আমার চাইতে আপনারই এটা বেশি দরকার মহামান্য টাইটা।
খুশি মনেই তার প্রস্তাব গ্রহণ করলাম আমি, যদিও তার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে রানির উন্মুক্ত বুকের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পাওয়া। এবং স্বীকার করছি, বীরবাহু বের আর্গোলিদের রুচির প্রশংসা করতে হয়। তা ছাড়া গাউনটাও বেশ আরামদায়ক হলো আমার পরনে, রংটা আমার চোখের সাথে সুন্দর মানিয়ে গেল। যদিও হাতা এবং ঝুলের দিক দিয়ে একটু খাটো হলো, তবে তাতে কিছু আসে-যায় না। এবার আমাদের দুর্দশার কাহিনি শোনার জন্য আমাদের চারপাশে জড়ো হলো বীরবাহু এবং তার সকল কর্মকর্তা, সেইসাথে তাদের স্ত্রীরা। তবে সৌভাগ্যক্রমে আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম যে এমন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। তাই রামেসিসসহ বাকি সবাইকে ইতোমধ্যে সাবধান করে দিয়েছি, যেন মুখ বন্ধ রাখে তারা।
আসলে বলার মতো তেমন কিছুই ঘটেনি, বীরবাহুর প্রশ্নের জবাবে বিনয়ের অবতার সেজে জবাব দিলাম আমি।
নিশ্চয়ই আরো একবার বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন আপনি, প্রভু টাইটা, বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকাল রানি হ্যাগনে। সুতরাং এবার একটু বাড়িয়ে বলা ছাড়া আর কোনো পথ রইল না আমার সামনে।
ফারাও রামেসিস আর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে উটেরিকের ঘোড়ার সংখ্যা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। তাতে উটেরিকের কাছে পর্যাপ্ত রথ থাকবে না, অথচ আমাদের রথের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। দেখলাম অবাক হয়ে গেল রামেসিস, আমার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মুখ খুলল। তারপর হঠাৎ মুখ বন্ধ করে ফেলে ঘন ঘন মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল আমার কথায়।
ঘোড়া কি আনতে পেরেছেন? জানতে চাইল বীরবাহু। আমার কাছে তো মনে হচ্ছে না সফল হয়েছেন আপনারা, বলে হো হো করে হেসে উঠল সে।
তা কিছু ঘোড়া পেয়েছি আমরা, মধুমাখা গলায় জবাব দিলাম আমি।
কিছু বলতে কত? জানতে চাইল সে। পাঁচ? দশ?
তার চাইতে সামান্য বেশি, স্বীকার করলাম আমি। এই ধরুন দেড় শর মতো। তবে শুধু দেবতারাই বলতে পারবেন যে ওগুলোর মাঝে কতগুলো আমাদের শিবিরে পৌঁছবে। বুঝতেই পারছেন, ঘোড়াগুলো আমাদের আগেই। এই তীরে এসে উঠেছে, এবং উঠেই দৌড়ে পালিয়েছে এদিক-ওদিক। কিছু ঘোড়া যে হারাতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে আশা করি বেশির ভাগই পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হব আমরা। এই বলে জিজ্ঞাসু চোখে রামেসিসের দিকে তাকালাম আমি। তোমার কি আর কিছু বলার আছে রামেসিস? মাথা নাড়ল ও আমার বানানো গল্প শুনে হাঁ হয়ে গেছে। তবে সেই মুহূর্তেই আলোচনায় যোগ দিল রানি হ্যাগনে।
তাহলে এই কাজ করতে গিয়েই এমন কাকভেজা দশা হয়েছে আপনাদের। ঘোড়াগুলোর সাথে নদীর ওই তীর থেকে এ পর্যন্ত সাঁতরে এসেছেন আপনারা, তাই না? কি মিষ্টি জ্ঞানী একজন মহিলা। যত দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি আমি। সন্দেহ নেই, সাহসী এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে এক নজরেই চিনে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে সে।
একেবারে সঠিক ধরেছেন, মহামান্য রানি, তার কথায় সম্মতি জানালাম আমি। বুঝতেই পারছেন আমাদের নৌকাগুলোকেও নষ্ট করে রেখে আসতে হয়েছে আমাদের। যদিও ওগুলোর খুব সামান্যই মূল্য আছে; কিন্তু আমরা চাইনি যে শত্রুরা ওগুলোর ফায়দা লুটুক।
গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল বোয়েশিয়ার রাজা। একটু আগে যে ব্যঙ্গের হাসি ফুটে উঠেছিল তার মুখে সেটা এখন মুছে গেছে। জাহাজের ডেকের ওপরেই আমাদের সবাইকে মদ পরিবেশন করার জন্য পরিচারককে নির্দেশ দিল সে।
এই মদটা সত্যিই দারুণ, রামেসিস এবং আমার বিজয় আর নায়কোচিত বীরত্বের গল্পের সবটুকু শোনার পর মন্তব্য করল বীরবাহু। সত্যিই দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির বিজয়ের কথা মানুষ বেশি দিন মনে রাখে না। মানুষের নিজস্ব ভুল এবং অন্য ত্রুটিগুলোর কথা তাই কাউকে না জানানোই ভালো।
*
বীরবাহু বের আর্গোলিদের আগমনের সাথে সাথে হুরোতাসের শিবিরে ষোলোজন মিত্র রাজার সবার উপস্থিতি নিশ্চিত হলো। এবার অবশেষে রামেসিস এবং সেরেনার বহুপ্রতিক্ষীত দ্বিতীয় বিবাহের আয়োজনে হাত দেওয়া যেতে পারে। প্রথম বিয়ের অনুষ্ঠানে আমিই ছিলাম একমাত্র অতিথি এবং অন্য সব দায়িত্বও আমাকেই পালন করতে হয়েছিল। তাই দ্বিতীয় অনুষ্ঠানে যতটা সম্ভব দূরে দূরে থাকব বলেই ঠিক করলাম। সেরেনাকে সাহস দেওয়ার জন্য তার পুরো পরিবার এবং আত্মীয়স্বজন সবাই রয়েছে এখানে, ওদিকে রামেসিসের জন্য আছে বেকাথা এবং তার তিন ছেলে, যারা তাকে নিজেদের পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। এখন আর আমাকে না হলেও চলবে ওদের।
এবার অন্য একটা ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পেলাম আমি, যেটা সেই লুক্সর থেকে গানোর্ডের সাথে নদীপথে যাত্রা করার সময় থেকেই আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, গানোর্ডের কাছ থেকে শোনা সেই অপেক্ষাকৃত উন্নত জাতির বিবরণ; যারা নীলনদের তীরে আবু নাসকোস শহরের এই জায়গায় গড়ে তুলেছিল এক প্রাচীন কিন্তু সমৃদ্ধ জনপদ।
পোশাকের ভেতরটা হাতড়ে গানোর্ডের কাছ থেকে উপহার পাওয়া সেই মাটির ভাস্কর্যটা বের করলাম আমি, যাতে আঁকা আছে সোনালি মাথাসহ একটা মাছ। আরো একবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম সেটাকে। জিনিসটা সুন্দর ঠিক; কিন্তু রহস্যময়ও বটে। নদীর কিনারে চলে এলাম আমি; সেখানে নোঙর করে থাকা ছোট ছোট নৌকা আর জাহাজগুলোর মাঝে চার বাতাসকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। তবে মাঝিদের কাছ থেকে জানা গেল জাহাজটা নাকি লুক্সরে ফিরে গেছে। সে সময় নদীর পশ্চিম তীরে ঘোড়া সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলাম আমি। গানোর্ড যে কোথায় গেছে তা কেউ বলতে পারে না। মাঝিদের সোনালি মাথার মাছটা দেখালাম আমি। সবাই একমত হলো যে জিনিসটা সুন্দর; কিন্তু এমন কিছু কেউ আগে কখনো দেখেনি।
