গম্ভীর হয়ে এসেছে হুরোতাসের চেহারা। প্রিয়তমা কন্যা আমার, বলল সে, অত্যন্ত কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছ তুমি। কিন্তু আমার কোনো সন্দেহ নেই। যে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। আমার দিকে এক নজর তাকাল সে, তারপর গম্ভীর চেহারাতেই এক চোখের পাতা বন্ধ করল আলতো করে। অভিনন্দন জানানো হচ্ছে আমাকে। আরো একবার অল্প একটুর জন্য জিতে গেছি আমরা।
*
পরদিন রাতে আমি আর রামেসিস বের হলাম নীলনদের পশ্চিম তীরটা পরীক্ষা করে দেখতে। এই তীরেই আবু নাসকোস শহর অবস্থিত, যেখানে ঘাঁটি গেড়েছে উটেরিক। নদীর দিকটায় কোনো প্রবেশপথ নেই, যেখান দিয়ে শহরে ঢোকা যায়। অন্য দরজাগুলোর বর্ণনা জানা আছে আমার; কিন্তু নিজের চোখে কখনো দেখিনি। বুঝতে পারছি যে ওগুলো দেখতেই হবে আমাকে। সাথে করে পনেরোজন লোক নিয়েছি আমরা। মাঝরাতের পরে চাঁদ উঠল আকাশে। তার আগের অন্ধকার সময়টাতে নীলনদ পার হয়ে গেলাম আমরা, তারপর নদীর তীরে নলখাগড়ার বনে লুকিয়ে রাখলাম আমাদের নৌকাগুলো। তারপর সামনেটা দেখতে পাওয়ার মতো আলো ফুটতেই দ্রুত কিন্তু নিঃশব্দে এগিয়ে গেলাম শহর প্রাচীরের দিকে। কয়েক শ কিউবিট এগোনোর পরেই দেখলাম উটেরিকের এক পাল ঘোড়া চাঁদের আলোয় ঘাস খাচ্ছে নদীর তীরে। সেগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করলাম আমরা, তারপর দুজনকে পাঠালাম ওগুলোকে আমাদের নৌকার কাছে রেখে আসতে। এভাবে তিনবারে প্রায় দেড় শ রথের ঘোড়া জোগাড় করে ফেললাম আমরা।
দুর্গের পশ্চিম দেয়ালের ওপর ঝলকাচ্ছে চাঁদের আলো, ফলে নিরাপদ দূরত্ব থেকেই শহরের দুটো দরজা দেখতে পাচ্ছি আমি। সেগুলোর আকার আকৃতি এবং নির্মাণশৈলীও আন্দাজ করে নিলাম এর ভেতরেই। আক্রমণ ঠেকানোর উপযোগী দেয়াল আর চোখা কাঠ দিয়ে ভর্তি পরিখাগুলোর কথাও মাথায় রাখতে ভুললাম না।
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর পিছিয়ে এলাম আমরা। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর পর দেখা গেল আমাদের রেখে যাওয়া নৌকাগুলোর মাঝে দুটো নৌকার সাহায্যে ঘোড়াগুলোকে নদীর ওপারে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেমনটা আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম। বাকি নৌকাগুলো নিয়ে ওদের অনুসরণ করলাম এবার। বেচারা ঘোড়াগুলোর জন্য অবশ্য একটু বেশিই কষ্ট হয়ে গেল, নীলনদ এখানে প্রায় দেড় লিগ চওড়া। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা যখন পুব তীরে হুরোতাসের শিবিরের সামনে এসে পৌঁছলাম তখন আমি আর রামেসিস সবগুলো ঘোড়া গুনে দেখলাম। একটা ঘোড়াও খোয়া যায়নি দেখে খুশি হয়ে উঠলাম সবাই।
এভাবে সফলতা পেয়ে আমাদের সাহস বেড়ে গেল। চার রাত পর রামেসিসের কথায় প্রভাবিত হয়ে আরো একবার একইভাবে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করলাম আমরা, যদিও এবার আমার মনের ভেতর সায় দিচ্ছিল না। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এবার আর আগের মতো সফলতা ধরা দিল না আমাদের হাতে। উটেরিকের লোকেরা বাকি ঘোড়াগুলোকে সরিয়ে ফেলেছিল এবং আমাদের জন্য ওত পেতে অপেক্ষা করছিল তারা। যেখানে নৌকা লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলাম সেখানে ফিরে আসার জন্য প্রাণপণে লড়াই করতে হলো আমাদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন নৌকার কাছে আসতে পারলাম তখন দেখলাম যে ওগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য যাদের রেখে গিয়েছিলাম তাদের কচুকাটা করে ফেলা হয়েছে। সেইসাথে খসিয়ে দেওয়া হয়েছে সবগুলো নৌকার তলি। আমাদের মাঝে অর্ধেকের বেশি লোক সাঁতার জানত না। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত নৌকাগুলোকেই ভেঙে তক্তা আলাদা করে ফেললাম আমরা, একই সাথে লড়াই করতে হলো শত্রুদের সাথে। নৌকাগুলো থেকে তক্তা বের করে আনার কাজ শেষ হতেই নদীতে নেমে পড়লাম আমরা, যারা সাঁতার জানত না তাদের প্রত্যেককে একটা করে তক্তা ধরিয়ে দিলাম। তারপর তাদের ঠেলে ঠেলে বা টেনে নিয়ে পালিয়ে এলাম নদীতে। তীরে দাঁড়িয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ বর্ষণ করতে লাগল শত্রুরা, তীর ছুঁড়তে লাগল আমাদের লক্ষ্য করে। অগত্যা স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলাম আমরা। পানিতে ডুবে অথবা কুমিরের মুখে পড়ে আরো পাঁচজন লোক প্রাণ দিল। যার অর্থ হচ্ছে, যারা গিয়েছিলাম তাদের মাঝে মাত্র ছয়জন প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারলাম নীলনদের পুব তীরে। আমার বিখ্যাত পুঁথি যুদ্ধবিদ্যার ইতিহাস-এ আমি লিখেছি, যুগে যুগে যত বিখ্যাত এবং মেধাবী সেনানায়ককে দেখা গেছে তারা প্রত্যেকেই জীবনে অন্তত একবার হলেও পরাজয়ের শিকার হয়েছে। সেই পরাজয় থেকে সে বেঁচে ফিরতে পারল কি না সেটাই মুখ্য, পরাজয়টা কীভাবে ঘটেছিল তা মুখ্য নয়।
সৌভাগ্যক্রমে হুরোতাসের মিত্র রাজাদের মাঝে সবচেয়ে শেষজন প্রায় আমাদের সাথে সাথেই নীলনদের পুব তীরের নোঙর ফেলল। এ হচ্ছে সেই বীরবাহু বের আর্গোলিদ, থিবিসে অবস্থিত বোয়েশিয়ার রাজা। সাতটি জাহাজের নৌবহর নিয়ে এসেছে সে। সব মিলিয়ে ৬৩০ জন সৈনিক রয়েছে তার দলে, সেইসাথে তার অসংখ্য স্ত্রীদের মাঝে দশজন। রানি হ্যাগনেও আছে তাদের মাঝে, কিছুদিন আগেও যে ছিল সোনালি ধনুক ভগিনীসংঘের প্রধান পূজারিনি।
নীলনদের অববাহিকার দিক থেকে এক সারিতে এলো তারা। এবং অবাক হয়ে দেখল, ফারাও রামেসিস এবং তার প্রধান মন্ত্রী টাইটা অর্ধনগ্ন অবস্থায় সারা গায়ে কাদা মেখে কয়েকটা ভাঙা তক্তা ধরে ভাসছে নীলনদের পানিতে। দ্রুত বের আর্গোলিদের প্রধান জাহাজে টেনে তোলা হলো আমাদের। এবং আমাদের দেখে তাদের চেহারায় প্রথমে যে বিস্ময় ভর করেছিল তা দুষ্টুমিতে পাল্টে যেতে বেশি সময় লাগল না।
