হুরোতাস এবং হুইয়ের মুখ থেকে অনলবর্ষী বক্তৃতার মাধ্যমে শুরু হলো সন্ধ্যাটা। তারপর বক্তৃতা দিল বেকাথার বাকি তিন ছেলে। এই সময়ের মধ্যে তেহুতি এবং বেকাথা দুজনই প্রচুর পরিমাণে ল্যাসিডিমনের উৎকৃষ্ট লাল মদ গলায় ঢেলেছে। ছেলেদের রক্তপিপাসু কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল বেকাথা; কিন্তু হঠাৎ করেই কী যে হলো, কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। সাথে সাথে বদলে গেল সবার মেজাজ।
উপস্থিত নারীরা সবাই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল, তারপর বেকাথার চারপাশে জড়ো হয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। বিমূঢ় হয়ে পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল পুরুষরা। শেষ পর্যন্ত সবাই তাকালাম হুইয়ের দিকে। মুখে কিছু বললাম না তবে আমাদের মনের কথা ঠিকই বুজতে পারল সে: এখানে আমাদের কিছুই করার নেই। সে তোমার স্ত্রী। তাকে সামলাও!
অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল হুই। তবে কপাল ভালো তার, কারণ সে বেকাথার কাছে পৌঁছানোর আগেই হঠাৎ বুকভাঙা চিৎকার করে উঠল বেকাথা, আমার সবগুলো সন্তানকে মরতে পাঠাতে হবে কেন?
সেই মুহূর্তেই নানা অংশে টুকরো টুকরো হয়ে গেল দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ পরিবারটি।
সাথে সাথে ছোট বোনের পাশে এসে দাঁড়াল তেহুতি। বেকাথা ঠিকই বলেছে। সেরেনাকে ফিরে পেয়েছি আমরা। এই ছোটখাটো অর্থহীন যুদ্ধে লড়াই করার কোনো মানেই হয় না এখন।
অর্থহীন মানে? গর্জে উঠল হুরোতাস। তুমি কি সত্যিই এই শব্দটা উচ্চারণ করলে, প্রিয়তমা আমার? ছোটখাটো শব্দটাও কি তোমার মুখ থেকে শুনলাম আমি? তুমি বুঝতে পারছ পুরো একটা সেনাবাহিনীকে এই মিশর পর্যন্ত নিয়ে আসতে কত কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে? এখন কিছুতেই ফিরে যেতে রাজি নই আমি, যে যাই বলুক না কেন। এই কষ্টের পাই পয়সা উসুল না করে আমি ছাড়ব না।
আমাদের সাথে এমন কাজ কোরো না মা, বেকাথার মেজ ছেলে সস্ট্রেটাস এবার বলে উঠল। সবেমাত্র সৈনিক জীবনে পা রেখেছি আমরা। এই সময়ে আমাদের অসম্মানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বোলো না। তাহলে পুরো পৃথিবী বলবে আমরা সবাই কাপুরুষ, জোচ্চোর উটেরিকের সাথে লড়াই করার মতো সাহস রাখতে পারিনি।
আমি তাকিয়ে ছিলাম সেরেনার দিকে। আমার জানা আছে এই পুরো ব্যাপারটার ফলাফল কী হবে তা নির্ভর করছে একান্তই ওর ওপর। হুরোতাস তার মেয়ের কথামতোই কাজ করবে এবং একই কথা তেহুতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুখে হয়তো প্রতিবাদ করবে ওরা দুজন; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল সেরেনাই নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। দেখলাম এক মুহূর্তের জন্য হুরোতাসের দিকে তাকাল ও; এক চিলতে সন্দেহের ছায়া এসে ভর করল চেহারায়। তারপর মায়ের দিকে তাকাল ও এবং সব শেষে খালা বেকাথার দিকে। বুঝলাম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে ওর। এটাও বুঝতে পারলাম, যে করেই হোক ওর সিদ্ধান্ত বদলাতে হবে। তা না হলে হয়তো আগামীকালই ল্যাসিডিমনের দিকে ফিরতি পথে রওনা দেবে এই বাহিনী।
আমার মনে হয় এই দেশকে নিশ্চিতভাবেই ঘৃণা করে সেরেনা, এবং তাকে সারাটা জীবন এখানে কাটাতে বাধ্য করাটা হবে একেবারেই নিষ্ঠুরতার পরিচয়, বলে উঠলাম আমি। আমার মতে ঠিকই বলেছে বেকাথা এবং তেহুতি। আমাদের উচিত এই মুহূর্তে ল্যাসিডিমন ফিরে যাওয়া। এই অভিশপ্ত দেশ নিয়ে যা খুশি করুক গিয়ে উটেরিক। আমি নিশ্চিত যে আমাদের মিত্র রাজারা আমাদের মনের অবস্থা বুঝতে পারবে, এবং এটাও আশা করি যে, তাদের সেনাবাহিনীকে এত দূর নিয়ে আসা এবং তাদেরকে আবার শূন্য হাতে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ চাইবে না তারা। সেরেনা তার জন্মভূমিতে সুখে দিন কাটাবে। হুরোতাস নদীর তীরে অবস্থিত ছোট্ট কোনো কুটিরের সামনে খেলা করে বেড়াবে তার আর রামেসিসের একগাদা বাচ্চাকাচ্চা। পারিবারিক সম্পদ যে ভালো কাজেই ব্যয় হয়েছে এটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে সে। নিজের জন্য সে যে ফালতু নামটা ঠিক করেছিল, রানি ক্লিওপেট্রা… ইতোমধ্যে যেন পাখা গজিয়েছে আমার মুখ থেকে উচ্চারিত কথাগুলোর। হাঁ করে সেগুলো শুনছে সবাই, বিশেষ করে সেরেনা।
তার পরেই আমি দেখলাম একটু আগে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ও সেটা আবার এক লহমায় বদলে ফেলল।
প্রিয় টাটা, তোমার কথাগুলো সবই সত্যি। কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নেরই দুটো চেহারা থাকে। আমাকে সব সময় শেখানো হয়েছে যে, একজন স্ত্রীর উচিত যেকোনো পরিস্থিতিতে দেবতাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া, এবং তার স্বামীর সামনে দেবতারা যে দায়িত্বই দিন না কেন তা পালন করতে তাকে সব রকম উপায়ে সাহায্য করা। আমি জানি যে সময় হলে রানি ক্লিওপেট্রা নামটাও গ্রহণ করব আমি, তা যতই ফালতু হোক না কেন। রামেসিস এবং আমি যদি এই মিশরের ফারাও এবং ফারাওইন হিসেবে থেকে যাই তাহলে আমার যেকোনো সময় আমার প্রিয় মা আমাকে দেখতে আসতে পারবে, অন্তত তার যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে কোনো অসুবিধা হবে না আমাদের। এই মিশরের সৌন্দর্য এবং সম্পদকে উপভোগ করতে শিখে নেব আমরা দুজন। আর সবচেয়ে বড় কথা যেটা, আমার কারণে দারিদ্র্যে পতিত হতে হবে না আমার বাবাকে।
এই বক্তৃতার সাথে সাথে নীরবতা নেমে এলো চারদিকে। কিন্তু বেকাথার ছেলেরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল ঠিকই। নতুন করে কান্নায় ভেঙে পড়ল বেকাথা। কিন্তু আমি এক পেয়ালা মদ নিয়ে এগিয়ে যেতে সেটায় চুমুক দেওয়ার জন্য কান্না থামাতে হলো তাকে।
