এই কথা যদি সত্যি হয় তাহলে কৃতজ্ঞচিত্তে সকল দেব-দেবীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই আমি, বলল হুরোতাস। কিন্তু পৃথিবীর সকল দেশেই এমন কিছু লোক থাকবে যারা আমার মেয়ের নামে বদনাম ছড়ানোর কোনো সুযোগ নষ্ট করবে না, এবং তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য একটাই উপায় আছে আমাদের হাতে।
সেরেনাকে যত দ্রুত সম্ভব স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে আমার চাইতে খুশি আর কেউ হবে না। আর কিছু বলতে হবে না আপনাকে, রাজা হুরোতাস। আমার দিকে একবারও তাকাল না রামেসিস। তবে আমি ঠিকই বুঝে নিলাম যে রামেসিস আর সেরেনাকে আমি যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেছিলাম তার কথা চিরকাল আমাদের তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
তাহলে তো আর কোনো কথাই রইল না। তোমাকে একমাত্র পুত্র হিসেবে পেলে আনন্দের কোনো সীমা থাকবে না আমার। এই বলে উঠে দাঁড়াল হুরোতাস, আমার দিকে তাকাল। প্রিয় টাইটা, এবার বোধ হয় একটু আমার স্ত্রী আর কন্যার খবর নেওয়া দরকার। কে জানে হয়তো কাপড় বদলাতে ওদের এত বেশি সময় নাও লাগতে পারে।
চোখ পিটপিট করল একবার রামেসিস, তারপর ভবিষ্যৎ শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, আপনি কি টাইটাকে এই কথাটা আগেও বলেছিলেন রাজা হুরোতাস? হ্যাঁ। এই একটু আগে তোমরা যখন আমার তাঁবুতে ঢুকলে তখন।
কিন্তু আমি তো আপনাকে কিছু বলতে শুনলাম না। বিভ্রান্ত দেখাল রামেসিসকে। দারুণ হইচই হচ্ছিল আপনার তাঁবুর ভেতরে।
সে ক্ষেত্রে আমি বলব চোখ দিয়ে কীভাবে শুনতে হয় সেটা টাইটার কাছ থেকে শিখে নেওয়া উচিত তোমার। আমার জানা মতে একমাত্র তার পক্ষেই এই কাজ করা সম্ভব।
অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল রামেসিস। পুরো ব্যাপারটা বুকে নেওয়ার পর তার চেহারায় প্রথমে বিভ্রান্তি, তারপর অভিযোগ ফুটে উঠতে দেখলাম আমি। এখন আমি নিশ্চিত যে খুব তাড়াতাড়িই চোখ দিয়ে শুনতে পারে এমন মানুষের সংখ্যা হবে দুজন। তার আগ পর্যন্ত আমাকে রেহাই দেবে না রামেসিস। অবশ্য ওর এই বিদ্যেটা শিখে নেওয়া দরকারিও বটে, কারণ চিরকাল এটা গোপন রাখতে পারব না আমি। এ ছাড়া সামনের বছরগুলোতে এই বিদ্যে নিশ্চয়ই আমাদের অনেক কাজে আসবে। এখন আমি জানি, পরস্পরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের দুজনের ভবিষ্যৎ।
*
যদিও সমগ্র বিশ্বের সামনে রামেসিস আর সেরেনাকে স্বামী স্ত্রী এবং মিশরের ভবিষ্যৎ ফারাও আর ফারাওইন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছি আমরা; কিন্তু সব কিছুরই একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। যথাযথ সম্মানের সাথে ছাড়া এ ধরনের কাজ কখনোই করা যায় না।
কাজটা আরো কঠিন হয়ে উঠল যে কারণে তা হলো, খুব শীঘ্রই রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি আমরা। মিশর অথবা পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভয়াবহ এক যুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে এই যুদ্ধ।
বিয়ে এবং এ ধরনের ব্যাপারগুলোতে সাধারণত মেয়েদেরই প্রাধান্য বেশি থাকে, এবং নিজের সহজাত বুদ্ধি খাঁটিয়ে আমি বুঝলাম যে এখানে আমার জড়িত না হওয়াই সমীচীন। তাই অপেক্ষাকৃত পুরুষালি ব্যাপারগুলো অর্থাৎ যুদ্ধ এবং দেশ দখলের ব্যাপারে মনোযোগ দিলাম আমি। এখানে আমার সঙ্গী হলো পুরনো এবং বিশ্বাসী দুই বন্ধু জারাস এবং হুই; এবং তাদের সাথে সাথে রামেসিস এবং অন্য রাজারা, যাদের সাথে আমার পরিচয়ের বয়স খুব বেশি না হলেও ইতোমধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছি আমরা।
বরাবরের মতোই এবারও অভিজ্ঞ যোদ্ধার প্রথম লক্ষ্যকে নিজের লক্ষ্য ধরে নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমি। আর তা হলো শত্রুকে জানো।
আমার শত্রু হলো উটেরিক বুবাস্টিস; কিন্তু তার সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না আমি। সে এমন এক ব্যক্তিত্ব, যে কিনা প্রতি নিঃশ্বাসের সাথে সাথে নিজের পরিচয় এবং আকার বদলায়। আমি এমনকি এটাও নিশ্চিতভাবে জানি না যে, সে আদৌ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কি না। হুরোতাসের শিবিরে পৌঁছানোর পর পরবর্তী দুই দিন শুধু নীলনদের অপর তীরে অবস্থিত শহর এবং দুর্গের দিকে নজর রেখে কাটালাম আমি আর রামেসিস। এমন অনেককেই চোখে পড়ল, যে উটেরিক হতে পারে এবং কখনো কখনো এমন দু-তিনজনকেও একসাথে দেখলাম। কাউকে দেখে হুমকির মুখে কান্নায় ভেঙে পড়া উটেরিককে মনে পড়ল আমার কেউ কেউ মনে করিয়ে দিল প্রচণ্ড ক্রোধে খ্যাপা উন্মত্ত উটেরিকের কথা।
তবে আশার কথা এটাই যে, যুদ্ধ শুরু করার জন্য খুব বেশি তাড়াহুড়ো নেই আমাদের। এখন সময় প্রস্তুতি এবং সেনাবাহিনীর সমন্বয় সাধনের। আমরা লুক্সর থেকে এখানে এসে পৌঁছানোর মাত্র পাঁচ দিন আগে নদীর এই তীরে শিবির ফেলার কাজ শেষ করেছে হুয়োতাস। এখন পর্যন্ত তার মিত্র রাজাদের সবাই উত্তর দিক থেকে এখানে এসে পৌঁছায়নি। প্রতিদিনই নীলনদ ধরে এগিয়ে আসছে নতুন নতুন নৌবহর, যোগ দিচ্ছে আমাদের সাথে। এখনো আমাদের সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়, এই মুহূর্তে আক্রমণ পরিচালনা করা মোটেই উচিত হবে না। সৈন্যদের সামলানো এমনিতেই দারুণ জটিল একটা কাজ। তার ওপরে আরো একটা গণ্ডগোল বাঁধল যখন হঠাৎ করেই সিদ্ধান্তের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিল বেকাথা।
সৌভাগ্যক্রমে ঘটনাটা ঘটল রাজা হুরোতাসের আয়োজন করা একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক নৈশভোজের আসরে। উটেরিকের হাতে বন্দিদশা থেকে মেয়ে সেরেনার নিরাপদে ফিরে আসার ঘটনাকে উদ্যাপন করতে এই ভোজের আয়োজন করেছে সে। ভোজের আরো একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেরেনার অপহরণ এবং অত্যারকে কেন্দ্র করে পুরো পরিবারের ওপর যে দুঃখ এবং শোকের চাদর নেমে এসেছিল তার বিরুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে আরো শক্তিশালী করে তোলা।
