এতক্ষণে সেরেনার গলা ভেঙে চিৎকার করার শক্তি হারিয়ে গেছে ঠিক; কিন্তু দৌড়ানো এবং সাঁতার কাটার জন্য এখনো যথেষ্ট শক্তি আছে তার শরীরে। আমার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ও, তারপর আবার পুরো ঘটনাটার পুনরাবৃত্তি ঘটাল। চার বাতাসের ডেকের ওপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে আবার নীলনদের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল ও, পেছন পেছন গেল তার মা। মুহূর্তের ব্যবধানে ঝাঁপিয়ে পড়ল দুজন, তারপর আবার সাঁতার কেটে রওনা দিল তীরের দিকে।
কী মনে হয় তোমার, ওদেরকে উদ্ধার করতে যাওয়া কি উচিত হবে? গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল রামেসিস। নাকি ভাগ্যের হাতেই ছেড়ে দেব ওদের? তেহুতির আগে জাহাজের ডেক থেকে পানিতে ঝাঁপ দিয়েছে সেরেনা, ফলে নদীর পুব তীরে দাঁড়ানো হুরোতাসের কাছ সেই আগে পৌঁছাল। কাছে আসতেই তাকে জড়িয়ে ধরে শূন্যে ছুঁড়ে দিল হুরোতাস, ঠিক যেন ছোট কোনো বাচ্চা। নেমে আসতেই আবার মেয়েকে ধরে ফেলল সে, তারপর চুমুয় চুমুয় আর দাঁড়ির ঘষায় ভরিয়ে দিল। এর ভেতরেই তেহুতি চলে এলো দুজনের কাছে। মুক্ত হাত দিয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরল হুয়োতাস, তারপর দুই হাতে দুজনকে বুকের সাথে চেপে ধরে নিজের তাঁবুর দিকে রওনা দিল।
ওদিকে আমি আর রামেসিস দ্রুত নিজেদের শরীর মুছে একটু আগে ফেলে যাওয়া পোশাক পরে নিলাম আবার। এই ফাঁকে নদীর তীরের দিকে জাহাজ চালিয়ে নিয়ে গেল গানোর্ড। জাহাজের সামনের অংশ তীরে ঠেকতেই লাফ দিয়ে নেমে পড়লাম আমরা, তারপর উত্তেজিত লোকজনের ভিড়ের মাঝখান দিয়ে পথ করে দিয়ে হুরোতাসের তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেলাম, যেখানে একটু আগে স্ত্রী আর কন্যাকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে সে। কাজটা খুব একটা সহজ হলো না, কারণ মনে হলো যেন উপস্থিত সবাই আমাদের উটেরিকের হাত থেকে সেরেনাকে উদ্ধার করার জন্য ধন্যবাদ এবং প্রশংসা জানাতে চায়। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সবাই জড়িয়ে ধরতে লাগল আমাদের, চুমু দিয়ে ভিজিয়ে দিল। তবে শেষ পর্যন্ত ঠিকই হুরোতাসের তাঁবুর ভেতর ঢুকে পড়লাম আমরা।
*
হুরোতাসের মালিকানায় থাকা বেশির ভাগ জিনিসের মতো তার তাঁবুটাও প্রয়োজনের তুলনায় বিশাল, দেখলেই সম্ভ্রম জাগে মনে। সত্যি কথা বলতে, তবুটা অনায়াসে স্পার্টার দুর্গ-প্রাসাদের মন্ত্রণাকক্ষের সাথে পাল্লা দিতে পারে। অবশ্য তাতে এক হিসেবে ভালোই হয়েছে, কারণ ভেতরে ঢোকার পর মনে হলো হুরোতাসের সাথে যারা এসেছে তাদের অর্ধেকই বোধ হয় তাঁবুর ভেতর আস্তানা গেড়ে বসেছে। ল্যাসিডিমন থেকে হুরোতাসের সাথে আসা ষোলোজন মিত্র রাজার অসংখ্য বউ এবং রক্ষিতা, সভাসদের দল, প্রধান প্রধান সেনা কর্মকর্তা এবং মন্ত্রীসহ আরো অনেকেই রয়েছে তাদের মধ্যে।
রামেসিস এবং আমি ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই তাঁবুর অন্য প্রান্ত থেকে আমাদের উদ্দেশ্য করে হাত নাড়ল রাজা হুরোতাস। আমার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে বুঝে বলে উঠল, তেহুতি আর সেরেনা গেছে ভেজা কাপড় বদলাতে। সুতরাং বুঝতেই পারছ বেশ সময় লাগবে ওদের। কয়েক দিনও লেগে যেতে পারে।
তার কথা শুনে দাঁত বের করে হাসলাম আমি, তারপর এক হাত রামেসিসের কাঁধে রেখে তার কানের এক ইঞ্চি দূরে মুখ রেখে হুরোতাসের কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করলাম। আমাদের চারপাশে অন্তত কয়েক শ লোকের ভিড় রয়েছে। মনে হচ্ছে যেন হাতে মদের বোতল নেই, এমন কেউ এখানে উপস্থিত নেই এবং প্রত্যেকেই তার পাশের জনকে উদ্দশ্য করে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। তার ওপর আবার চার-পাঁচটা বাদক দলও নিজেদের মতো করে বাজনা বাজিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে নরক গুলজার অবস্থা।
যুগপৎ হতাশা এবং গাম্ভীর্য নিয়ে আমার দিকে তাকাল রামেসিস। শয়তানি আর ঠগবাজির দেবতা ডলোসের নামে কসম করে বলো তো, এটা তুমি কীভাবে করো, টাইটা? ওর সাথে প্রথম যখন আমার দেখা হয় তখন মাঝে মাঝেই আমার অন্তদৃষ্টিকে পরীক্ষা করে দেখত ও। কিন্তু অনেক আগেই সেই চেষ্টা বাদ দিয়েছে। আমার ধারণা, একদিন এই কাজটা ও নিজেও করতে শিখবে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত ওকে নিয়ে হালকা মজা করতে তো আর কোনো দোষ নেই।
জনাকীর্ণ তাঁবুর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যেতে বেশ একটু সময় লেগে গেল। তবে হুরোতাসের কাছে পৌঁছানোর সাথে সাথেই আমাদের শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে এবং বেশ অনেকটা সময় ধরেই রাখল। তারপর আমাদের সাথে নিয়ে এক পাশের একটা দরজা দিয়ে অন্যদিকের একটা ছোট কিন্তু আলাদা কামরায় এসে ঢুকল। এবং ঢুকেই রামেসিসের দিকে ফিরল সে। সেরেনা এবং তোমার বিয়ের ব্যাপারে ওর সাথে খুব বেশি কথা বলার সময় পাইনি আমি। তবে অন্তত একবারের জন্য হলেও আমার সাথে একমত হয়েছে ও। উটেরিক যে কত বড় শয়তান এবং ভণ্ড সেটা সবার সামনে তুলে ধরার এখনই সময়। সবাইকে জানাতে হবে যে সে একজন নির্দোষ কুমারীকে তার পরিবারের কাছ থেকে অপহরণ করেছে এবং অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে তার ওপর।
মহামান্য রাজা, সাথে সাথে তাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল রামেসিস। আপনাকে একটা কথা পরিষ্কারভাবে জানানোর প্রয়োজন বোধ করছি। উটেরিক আপনার মেয়ের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে এ কথা ঠিক। ওকে মারধর করা হয়েছে, বন্দি করে রাখা হয়েছে কারাগারে। তবে ওর কুমারীত্ব নষ্ট করেনি সে, এবং নিজের কোনো অনুচরকেও এই কাজ করার অনুমতি দেয়নি।
