সৈনিক এবং যোদ্ধাদের এই বিশাল সমারোহের বাইরের প্রান্তে গড়ে উঠেছে। সেই সব মানুষের তাঁবু আর কুঁড়েঘর, যাদেরকে প্রায় মানুষের কাতারেই ফেলা যায় না। এরা হচ্ছে ভবঘুরে এবং বেশ্যা, সেইসাথে অকর্মা আর জোচ্চোরের দল, যারা যেকোনো সেনাবাহিনীর পিছু নিয়ে থাকে। এদের মূল উদ্দেশ্য থাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকা লাশগুলোকে লুট করা, যা কিছু পাওয়া যায় সব আত্মসাৎ করা।
ওই যে আমার বাবার যুদ্ধনিশান! হঠাৎ করেই আমার পাশ থেকে চিলের মতো চিৎকার করে উঠল সেরেনা, একই সাথে মুঠি পাকানো হাতে ঘুষি মারতে শুরু করল আমার কাঁধে; খুব সম্ভব আমার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। মানতেই হবে জোর আছে মেয়েটার হাতে।
কোথায়? কোনটা? আঙুল দিয়ে দেখাও আমাকে, তাড়াতাড়ি বললাম আমি। আসলে আমার কাঁধের ওপর সেরেনার চলমান ঘুষির স্রোত থামাতে চাইছি।
ওই যে! লাল রঙের শূকর আঁকা পতাকাটা দেখতে পাচ্ছ? আমার বুদ্ধিতে কাজ হয়েছে। ঘুষি মারা বাদ দিয়ে এখন আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে সেরেনা।
নদীর কিনারার সবচেয়ে কাছে এবং সবচেয়ে লম্বা দণ্ডটার ওপর পতপত করে উড়ছে হুরোতাসের প্রতীক আঁকা নিশান। পুরো যুদ্ধশিবিরের মাঝে সবচেয়ে বড় তাবুটাও তারই। সেই একই মুহূর্তে তাঁবুর দরজা দিয়ে দীর্ঘদেহী হালকা পাতলা গড়নের এক নারী বেরিয়ে এলো। তার পরিচয় জানার জন্য দুই হাত দিয়ে চোখ ঢেকে তারপর তাকালাম আমি। এবং চিনতে পারলাম প্রায় সাথে সাথেই। এবার আমার গলাতেও সেরেনার মতো একই রকম চিৎকার শোনা গেল: আর ওই যে তোমার মা! তাবু থেকে বেরিয়ে আসছে!
এই কথা শুনেই দুর্বোধ্য ভাষায় চিৎকার করতে শুরু করল সেরেনা, একই সাথে ডেকের ওপর লাফালাফি করছে আর দুই হাত মাথার ওপর তুলে পাগলের মতো নাচছে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকাল তেহুতি। তার পরই মেয়েকে চিনতে পারল সে, এবং হাতের ঝুড়িটা ছুঁড়ে ফেলে দিল এক দিকে।
আমার সোনামণি! এমন এক সুরে চিৎকার করে উঠল সে, মনে হলো তাতে আনন্দের চাইতে তীব্র কষ্টের ভাগই বেশি। দৌড়াতে শুরু করল এবার, এবং সামনে যে-ই পড়ল তাকেই ছুঁড়ে ফেলে দিল এক দিকে।
জাহাজের পেছন দিকে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা। এবার গানোর্ডের হাত থেকে হালের চাকাটা নিজের হাতে নিয়ে নিলাম আমি, তারপর গায়ের জোরে ঘুরিয়ে দিলাম। তীরের দিকে নাক ঘোরাল জাহাজটা। হঠাৎ চিৎকার থামিয়ে এমন ভঙ্গিতে দৌড়ে এলো সেরেনা, যেন নেকড়ের দলের তাড়া খেয়ে ছুটছে কোনো ভয়ার্ত হরিণ। জাহাজের নাকের কাছে এসেও থামল না ও, বরং ছোটার গতিকে ব্যবহার করে এক লাফে তীরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল নীলনদের পানিতে। একরাশ পানি ছিটিয়ে নদীর বুক চিরে ঢুকে গেল ওর একহারা শরীরটা।
কয়েক মুহূর্ত যেন থেমে রইল আমার হৃৎপিণ্ডটা। কিন্তু তার পরেই আবার পানির ওপর ভেসে উঠল সেরেনার মাথা। দ্রুত গতিতে তীরের দিকে সাঁতার কাটতে শুরু করল ও। দুই হাত মাথার সামনে উঠছে আর নামছে, সেইসাথে পানি কেটে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। চুলগুলো মুখের ওপর জড়িয়ে গেছে, মনে হচ্ছে যেন ভোঁদড় একটা সাঁতার কাটছে। পেছনে রেখে যাচ্ছে ফেনার রেখা। মেয়ের দু-এক মুহূর্ত পরেই তেহুতি পৌঁছে গেল পানির কিনারে, তারপর সে নিজেও লাফ দিল। আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে মা-মেয়ে কতটা দক্ষ সঁতারু। সত্যিই এক বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য হচ্ছে আমার। সত্যি কথা বলতে, উঁচু বংশের দুজন নারীকে এমন কাজ করতে প্রায় কেউই দেখেনি এর আগে। রাজবংশের যেসব নারী সদস্যরা সাঁতার জানে তারা সাধারণত গোপনে একা একা সাঁতার কাটে। সে সময় দেবী আইসিসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে নগ্নই থাকে তারা। ধারণা করা হয় যে, দেবীর যোনির গঠন অনেকটা সামুদ্রিক শঙ্খের মতো।
গভীর পানিতে পরস্পরের সাথে মিলিত হলো মা আর মেয়ে, এবং প্রায় সাথে সাথেই একে অপরকে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল যে, দুজনকে কয়েক মুহূর্তের জন্য পানির ওপরে আর দেখা গেল না। তার পরেই আবার ভেসে উঠল দুজনের মাথা, একই সঙ্গে হাসছে, কাঁদছে আর হাঁপাচ্ছে। এভাবে তৃতীয়বারের মতো তাদের মাথা দুটো ডুবে যেতে দেখে তীরে জড়ো হওয়া জনতা সবাই রুদ্ধশ্বাসে সামনে এগিয়ে এলো, সবাই ভাবছে যে বিপদ বোধ হয় শেষ পর্যন্ত ঘটেই যাবে।
এমনকি আমি নিজেও ভয় পেয়ে গেলাম। রামেসিসকে বললাম, আমরা কেউই চাই না যে ওরা কুমিরগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করুক। বোকা মেয়ে দুটোকে পানি থেকে টেনে তুলতে হবে আমাদের। তারপর কাপড় খুলে ফেললাম আমরা, রইল কেবল অন্তর্বাস। এবার পানিতে ঝাঁপ দিলাম আমরা। কিন্তু মা-আর মেয়ের কাছে পৌঁছে আবিষ্কার করলাম কিছুতেই তাদের আলাদা করা যাচ্ছে না। অগত্যা ওই অবস্থাতেই তাদেরকে জাহাজে টেনে নিয়ে আসা হলো। গানোর্ড এবং অন্য নাবিকরা আমাদের জাহাজে উঠতে সাহায্য করল। ওদিকে তীরে দাঁড়িয়ে উল্লসিত চিৎকারে ফেটে পড়ল জনতা।
শয়তান সেথ আর অন্য সব বদমাশ দেবতার কসম, এখানে হচ্ছেটা কী, অ্যাঁ? তীর থেকে আর সবার কণ্ঠ ছাপিয়ে চেঁচিয়ে উঠল একটা পরিচিত গলা। জনতা দুই ভাগ হয়ে পথ করে দিল, সেই পথ দিয়ে নদীর কিনারে এগিয়ে এলো রাজা হুরোতাস। প্রচণ্ড ক্রোধে চেহারা টকটকে লাল হয়ে গেছে তার। কিন্তু যখনই বুঝতে পারল যে নদীর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট জাহাজটার নাবিকরা যে দুই নারীকে পানি থেকে টেনে তুলেছে তারা আসলে তার সবচেয়ে প্রিয় দুজন মানুষ, সাথে সাথে বদলে গেল তার হাবভাব। গলার স্বর বদলে গেল, আদুরে আর ভালোবাসায় গদগদ হয়ে উঠল। আরে, আমার খুকুমণি সেরেনা! বলে দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিল সে। চওড়া পেশিতে ভরে আছে তার হাত দুটো, শত শত যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ফসল। তার ওপর নানা রকম ভয়ংকর উল্কি আঁকা হয়েছে তাতে, যাতে ভয় পায় শত্রুরা। বাবার কাছে এসো, লক্ষ্মীসোনা! বলে উঠল সে।
