এই কথাগুলো যে আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছি সেটা বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়িয়ে ডেকের নিচে চলে গেল গার্ডে। একটু পর ফিরে এলো সেই অর্ধ দেবতাদের একটা চিহ্ন নিয়ে। জিনিসটা আমাকে উপহার দিল সে। মাটি বা পাথর দিয়ে তৈরি সবুজ রঙের ছোট একটা টুকরো বা টালি আমার হাতের তালুর চাইতে বেশি বড় হবে না। তাতে লম্বা পাখনা আর সোনালি মাথাসহ একটা অদ্ভুত মাছের ছবি আঁকা। গানোর্ড দাবি করল, এটা নাকি আবু নাসকোসের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মাঝে খুঁজে পেয়েছে সে। বলল, প্রাচীন সেই সভ্যতা যারা গড়ে তুলেছিল তাদের এই একটা চিহ্নই আছে তার কাছে।
সূর্য ওঠার একটু আগে আমার সবচেয়ে প্রিয় দুই মানুষ পা রাখল ডেকের ওপর। আলোচনায় ছেদ পড়ায় একটু অবশ্য মন খারাপ হলো আমার। মনে হলো আরেকটু বেশি সময় নিজেদের কেবিনে থাকলে নিশ্চয়ই এমন কোনো ক্ষতি হতো না ওদের।
তবে ওরা উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথেই আমার কাছে মাফ চেয়ে উঠে দাঁড়াল গানোর্ড। দুজনকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল সে, তারপর জাহাজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাপ্টেনের সাথে কথা বলতে চলে গেল। পাল গুটিয়ে আনা হলো জাহাজের। নদীতে জাহাজের চলার গতি কমিয়ে আনলাম আমরা। আর একটা বাঁক ঘুরলেই আবু নাসকোস শহর উন্মোচিত হবে আমাদের সামনে।
*
নদীর বাঁকটা ঘোরার সাথে সাথে প্রায় একই সময়ে সূর্যোদয় হলো, ফলে নীলনদের পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা শহরটার সম্পূর্ণ চেহারা খুব ভালোভাবে দেখতে পেলাম আমরা। এই জায়গায় নদীটা প্রায় এক লিগ চওড়া, যা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের এক ঘণ্টার হাঁটা পথের দূরত্বের সমান। ফলে নদীর অন্য পাড় থেকে তীর ছুঁড়ে শহরের প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই।
শহরের প্রাচীর গড়ে তোলা হয়েছে সোনালি-হলুদ রঙের বেলেপাথরের বিশাল সব চাঙড় দিয়ে। অনেক উঁচু সেই দেয়াল, হিকসস রীতিতে প্রাচীরের ওপর কিছু দূর পরপর গড়ে তোলা হয়েছে ছাউনি। মিশরীয়দের কাছ থেকে এই শহর দখল করে নিয়েছিল হিকসসরা, পরে নিজেদের মতো করে পুনরায় নির্মাণ করেছে। হানাদার হিকসসদের এই দেশ থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত করতে প্রায় এক শতাব্দী সময় লেগে গেছে আমাদের। কিন্তু বিদেশিদের হাত থেকে স্বদেশকে পুনরুদ্ধার করতে পারলেও এক উন্মাদ স্বৈরাচারী ফারাওয়ের কারণে তাকে হারিয়ে ফেলেছি আবার। এখন এই শহরের দুর্ভেদ্য সীমানার মাঝেই লুকিয়ে আছে সে।
সমস্ত জীবনে প্রায় শ খানেক যুদ্ধক্ষেত্র দেখার সুযোগ হয়েছে আমার; কিন্তু এখন যা দেখলাম তার কথা আমি কখনো ভুলব না। মনে হলো যেন ভয়াবহ এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া দুই পক্ষের শক্তি এবং বোকামি দুটোই উন্মোচিত হয়েছে আমার সামনে।
শহর প্রাচীর থেকে নীলনদের পানির বিস্তৃতি যেখানে শুরু হয়েছে তার মাঝখানে রয়েছে এক চিলতে বালির সৈকত। সেখানেই নিজের নৌবাহিনীকে নোঙর করিয়ে রেখেছে উটেরিক। কাছাকাছি আসার সাথে সাথে জাহাজগুলোকে গুনতে লাগলাম আমি। সব মিলিয়ে প্রায় এক শ জাহাজ এখনও সে রয়েছে সেখানে, যার প্রতিটি ত্রিশ থেকে চল্লিশজন মানুষকে বহন করতে পারে। শহরের পাথুরে দেয়াল যেন ঝুলে রয়েছে জাহাজগুলোর ওপর। এক নজরেই বুঝতে পারলাম যে প্রাচীরের ওপর বড় বড় পাথর তূপ করে রাখা হয়েছে, যাতে শত্রুপক্ষের কোনো সদস্য জাহাজগুলোর কোনো ক্ষতি করতে গেলে বা ওগুলোকে ছিনতাই করতে চাইলে তাদের ওপর পাথর ছুড়ে মারা যায়।
প্রাচীরের যেদিকটা নদীর কাছে সেখানে কোনো দরজা নেই। সত্যি কথা বলতে একটা ফাটলও নেই কোথাও, যেখান দিয়ে কোনো একরোখা আক্রমণকারী ঢুকে পড়ার চেষ্টা করতে পারে। দেয়ালের অর্ধেক উচ্চতা থেকে শুরু হয়েছে তীর ছোঁড়া এবং অন্যান্য কাজের জন্য তৈরি ছিদ্রের সারি, এবং মাটি থেকে সেগুলোর উচ্চতা প্রায় এক শ কিউবিট।
প্রাচীরের ওপর দিয়ে এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত কুচকাওয়াজ করে বেড়াচ্ছে উটেরিকের সৈন্যরা। সূর্যের আলোতে ঝলকাচ্ছে তাদের শিরস্ত্রাণ আর বর্ম। নিশ্চয়ই আশা করছে যে তাদের দেখে ভয় পেয়ে সরে যাবে আমাদের আক্রমণকারী বাহিনী। সৈন্যদের সামনে রয়েছে এক গাদা পতাকাবাহী দণ্ড, তাতে উড়ছে উটেরিকের বাহিনীর নানা রং এবং আকারের বিভিন্ন পতাকা। নদীর ওপারে নোঙর করে থাকা হুরোতাসের বাহিনীর দিকে যেন যুদ্ধে নামার জন্য সরাসরি আহ্বান জানাচ্ছে সেগুলো।
নদীর পুব তীরে নোঙর করেছে ল্যাসিডিমনের নৌবহর। ভারী লোহার শিকল দিয়ে জাহাজগুলোকে বেঁধে রাখা হয়েছে তীরের সাথে। এটা করা হয়েছে যেন শত্রুরা রাতের আঁধারে এসে চুপি চুপি জাহাজগুলোকে দড়ি কেটে ভাসিয়ে দিতে না পারে। জাহাজের ওপর অস্ত্র নিয়ে সদা সতর্ক অবস্থায় পাহারা দিচ্ছে নাবিকরা। জাহাজের মাস্তুল আর খোলের গায়ে লাগানো হয়েছে নানা রঙের ছোট-বড় পতাকা, যেন নদীর অপর তীরে আবু নাসকোস শহরের প্রাচীরের ওপর উড়ন্ত পতাকার বিরুদ্ধে পাল্টা জবাব।
হুরোতাস আর তার মিত্ররা যেখানে ঘাঁটি গেড়েছে সেখানে অবশ্য কোনো দুর্গ প্রাচীর বা স্থায়ী কোনো অবকাঠামো নেই। তাই পুরনো বন্ধু এবং মিত্রদের শিবির দেখতে পেয়ে আনন্দে ভরে উঠল আমার মন। পুব তীরের দুই দিকে যত দূর চোখ যায় নিচু পাহাড় আর টিলার ওপর ছড়িয়ে আছে ঘন জঙ্গল। কিন্তু এখন সেগুলোর সামনে এসে হাজির হয়েছে শত শত তাঁবু আর ছাউনি। নির্দিষ্টভাবে আলাদা আলাদা ভাগে তৈরি করা হয়েছে সেগুলো, ফলে ষোলোটি বাহিনীর প্রত্যেকটার ছাউনি এবং সেনাপতির তাবুকে চিনতে কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না। এগুলোর পেছনে রয়েছে ঘোড়া রাখার আস্তাবল এবং হাজারখানেক রথ রাখার জায়গা। তার সাথে আরো রয়েছে প্রায় একই সংখ্যক ভারী মাল টানার গাড়ি।
