আমাদের স্বাগত জানাতে পেরে দারুণ খুশি হয়ে উঠল সবাই। তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্তব্য হলো উচ্চ এবং নিম্ন মিশরের সিংহাসনে ফারাও প্রথম রামেসিসকে অধিষ্ঠিত করা। গম্ভীর চেহারায় এই সম্মান বরণ করে নিল রামেসিস, তারপর সিংহাসনে বসে রাজ্য পরিচালনার শপথ নিল। তারপর অন্ত বর্তীকালীন মন্ত্রিসভাকেই নিজের পূর্ণাঙ্গ এবং স্থায়ী মন্ত্রিসভা হিসেবে স্বীকৃতি দিল ও। সেইসাথে আরো ঘোষণা করল, এই নতুন সভার প্রথম এবং প্রধান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে আর কেউ নয়, বরং প্রভু টাইটা।
রামেসিস যখন এসব দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত তখন তার স্ত্রী আমাদের অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রথমেই নীলনদ ধরে এগিয়ে চলার জন্য আমাদের একটা দ্রুতগামী জাহাজ দরকার, যাতে করে ও পরিবারের সাথে মিলিত হতে পারে। সেরেনার প্রতি সব সম্মান রেখেই বলছি, ওর এবং রামেসিসের বিয়ের কথা আমরা তিনজন বাদে আর কেউ জানে না। এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ওদের বিয়ে তখনই হতে পারে যখন আরো কিছু ব্যাপারকে নিশ্চিত করা হবে, যেমন বিয়ের অনুষ্ঠানে ওর বাবার মিত্র রাজাদের সবাই সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকা। তাই সব দিক বিবেচনা করে এটাই ঠিক হয়েছে যে, বিয়ের আগ পর্যন্ত জনসমক্ষে বা আনুষ্ঠানিকভাবে সবার সামনে আসবে না সেরেনা, অন্তত যত দিন না ওদের সব দিক মেনে বিয়ে না হচ্ছে।
সেদিন বিকেলেই এক প্যাপিরাসের পুঁথিতে আমার হায়ারোগ্লিফিক সিলমোহর আঁকলাম আমি। প্যাপিরাসে বলা হলো, আমার অবর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার ভার ওয়েনেগের ওপর ন্যস্ত করা হচ্ছে। তারপর রামেসিসকে নিয়ে সবার চোখের আড়ালে সরে এলাম আমি। একটু পর আমাদের উদয় হতে দেখা গেল নদীর বন্দর এলাকায়। সবার চোখে ধুলো দিয়ে একটা দুই মাস্তুলওয়ালা জাহাজে চড়ে বসলাম আমরা। জাহাজের নাম হচ্ছে চার বাতাস। আমরা উঠে আসার সাথে সাথেই নোঙর তুলল জাহাজ, ঢেউয়ে ভেসে এগিয়ে চলল উত্তর দিক লক্ষ্য করে। আমাদের সামনে এখন আবু নাসকোস এবং আরো সামনে রয়েছে ভূমধ্যসাগর।
লুক্সর শহরের আলো-অন্ধকারে মিশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত জাহাজের নিচে নিজের কামরায় অপেক্ষা করল সেরেনা। তারপর ঠিক যেন সন্ধ্যাতারা মতোই রহস্যময় এ+ সৌন্দর্য নিয়ে উদয় হলো জাহাজের ওপর। আমাদের দেখতে পেয়ে খুশিতে হেসে উঠল ও, তারপর আমার দুই গালে চুমু খেয়ে নিচে চলে গেল আবার। রামেসিসও গেল ওর সাথে। সকালের আগে আর ওদের দেখা পাওয়া গেল না। পরবর্তী তিন দিন আবু নাসকোসের উদ্দেশ্যে ভেসে চলল চার বাতাস। এই তিন দিন হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের এবং সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ একটা সময়।
তৃতীয় দিন রাতে মধ্যরাতের একটু আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়লাম আমি। জানি যে আগামীকাল ভোরেই গন্তব্যে পৌঁছে যাব আমরা। তাই এখন আর ঘুমানো সম্ভব নয় আমার পক্ষে। তার বদলে জাহাজের ডেকে গিয়ে বসলাম আমি। জাহাজের সারেং, যার নাম গানোর্ড এসে যোগ দিল আমার সাথে। বরাবরের মতোই তার সঙ্গ পেয়ে কৃতজ্ঞ বোধ করলাম আমি। বয়স্ক একজন মানুষ, চেহারাটা দেখলে নীলনদের কুমিরের সাথে কোথায় যেন মিল পাওয়া যায়। কোটরে বসা এক জোড়া বাদামি চোখ, নীলনদের কিনারে এসে জমা হওয়া, নুড়িগুলোর মতো। কিছুই আটকায় না সেই চোখে। মুখে ঘন সাদা দাঁড়ি, প্রায় কোমর পর্যন্ত লম্বা। সারাটা জীবন এই নীলনদ আর উত্তর সাগরের কিনারা চষে বেড়িয়ে কাটিয়েছে সে।
এদিকের জলভাগ, এমনকি আমার চাইতেও ভালোভাবে চেনে গানোর্ড। নদীতে বসবাসকারী অশরীরী আর পানিভূতদের নামও জানা আছে তার, যদিও অনেক নামই প্রাচীন উপজাতিদের সাথে সাথে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। নীলনদ যেখানে আকাশ থেকে নেমে এসেছে সেই উৎসমুখ ঘুরে এসেছে সে, দেখেছে হাথোরের দরজা দিয়ে কীভাবে ঝরে পড়ছে নীলনদের বিশাল স্রোতধারা, তারপর অনন্তকাল ধরে হারিয়ে যাচ্ছে এক অন্তহীন গহ্বরের ভেতর।
আজ রাতে গানোর্ডের কাছ থেকে নদীর সেই অংশের গল্প শুনলাম আমি, যা আবু নাসকোসের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য ওখানেই। তার মতে, প্রায় হাজার বছর আগে এক প্রাচীন কিন্তু উন্নত জাতি ওই শহরে প্রথমবারের মতো বসতি স্থাপন করে। গানোর্ডের মতে ওই জাতির সদস্য ছিল অর্ধ-দেবতারা। ভবন নির্মাণ, পড়ালেখা এবং বাগান করায় অত্যন্ত দক্ষ ছিল তারা। নীলের দুই তীরেই সেচের ব্যবস্থা করেছিল তারা, চারপাশের বর্বর জনগোষ্ঠীর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য তৈরি করেছিল সুউচ্চ দুর্গ। ধারণা করা হয় যে, নদীর এপার থেকে ও পারে দ্রুত যাতায়াত করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল তারা, খুব সম্ভব কোনো ধরনের সেতুর মাধ্যমে। তবে গানোর্ডের ধারণা জাদু জানত তারা। এখনো নাকি আবু নাসকোসের বর্তমান শহর অঞ্চলের নিচে লুকিয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপে সেই হারানো সভ্যতার নানা ধরনের চিহ্ন পাওয়া যায়।
প্রায় পাঁচ শ বছর আগে হুট করেই ধ্বংস হয়ে যায় এই সভ্যতা, খুব সম্ভব ঘন ঘন ভূমিকম্পের ফলে। আন্দাজ করা হয় যে, সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে যারা বেঁচে গিয়েছিল তারা নীলনদের কাছ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যায়, ইউফ্রেটিস নদী এবং ব্যাবিলনের দিকে সরে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তী পাঁচ শ বছর ধরে খালিই পড়ে থাকে আবু নাসকোস।
