কিন্তু ছুরির বাঁটে আঙুলগুলো চেপে বসার আগেই অনুভব করলাম আরেকটা হাতের আঙুল চেপে ধরেছে আমার কবজি। সেগুলো উষ্ণ এবং মসৃণ; কিন্তু একই সাথে পাথরের মতো শক্ত। যেন ওই হাতে যে নীল তলোয়ার উঠে আসে তার ফলার মতোই শক্ত হয়ে উঠেছে হাতটাও।
ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার হাত ধরে থাকা নারীর দিকে তাকালাম আমি। আমার চোখে চোখ রাখল না সেরেনা; কিন্তু ফিসফিস করে কথা বলে উঠল। ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রামেসিস এবং আমি ছাড়া কেউ শুনতে পেল না কথাগুলো।
না! বলল ও।
কেন? প্রশ্ন করলাম আমি।
আমি চাই ও কষ্ট পাক, জবাব দিল সেরেনা।
কাজটা করতেই হবে আমাকে, বললাম আমি।
কেন?
কারণ এটা করলে ওর আর আমার মধ্যে কোনো তফাত থাকে না, মৃদু গলায় জবাব দিলাম আমি।
আমার হৃৎপিণ্ড বিশবার স্পন্দিত হতে যতটুকু সময় লাগে ঠিক ততটা সময় চুপ করে রইল সেরেনা। তারপর ওর আঙুলগুলো ছেড়ে দিল আমার হাতকে। এখনো আমার দিকে তাকাচ্ছে না ও। কিন্তু দেখলাম চোখ বন্ধ হয়ে এলো ওর, নীরব সম্মতির ভঙ্গিতে ঝাঁকি খেল মাথাটা।
কোমরের খাপ থেকে ছোরাটা বের করলাম আমি, তারপর ঝুঁকে এসে মুঠো করে ধরলাম পানমাসির দাড়ি। থুতনিটা টেনে ওপরে তুলে নিলাম, যাতে সম্পূর্ণ গলাটাকে উন্মুক্ত পাওয়া যায়। তারপর ছোরার ধারালো পাশটা এক কানের পাশে রেখে টেনে অন্য পাশে নিয়ে গেলাম। এত গভীরভাবে কাটলাম গলাটা যে ঘাড়ের হাড়ের সাথে ঘষা খেল আমার ছুরি। গলার দুই প্রধান ধমনি কেটে গিয়ে ভলকে ভলকে রক্ত বেরিয়ে এলো। কাটা শ্বাসনালি দিয়ে বেরিয়ে এলো অন্তিম নিঃশ্বাস। একবার ঝাঁকি খেল দেহটা, তারপর মারা গেল পানমাসি।
ধন্যবাদ, মৃদু স্বরে বলল সেরেনা। বরাবরের মতোই সঠিক কাজটা করেছ তুমি টাটা। একই সাথে আমার পরামর্শদাতা এবং আমার বিবেক হিসেবে কাজ করেছ তুমি।
*
পানমাসি যেখানে মারা গেল সেখানেই তাকে রেখে গেলাম আমরা, শেয়াল এবং শকুনের খাবার হিসেবে। সাত্তাকিন নদীর দুই পাশে তৈরি হওয়া গিরিখাত পার হয়ে ফিরে চললাম এবার। সঙ্গী হলো মেরিমোস এবং তার সঙ্গীরা, যারা সবেমাত্র উটেরিকের পক্ষ ত্যাগ করে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। ঠিক হলো নদী পার হয়ে এক দিনের জন্য বিশ্রাম নেব আমরা, ঘোড়াগুলো এবং দলের বাকিদের একটু চাঙ্গা হয়ে ওঠার সুযোগ দেব।
সেদিন সন্ধ্যায় আগুনের চারদিকে ঘিরে বসে সামান্য খাবার আর এক বোতল লাল মদ দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিচ্ছিলাম আমরা। ইচ্ছে করেই দলের বাকিদের কাছ থেকে একটু আলাদা হয়ে এসেছি, যাতে নিশ্চিন্তে নিজেদের মাঝে আলাপ করা যায়।
স্বাভাবিকভাবেই পানমাসির মৃত্যু নিয়ে কিছুক্ষণ কথা হলো আমাদের মাঝে। ফলে কিছুটা গুমোট হয়ে উঠল পরিবেশ। কিন্তু তার পরেই সেরেনা তার স্বভাব অনুযায়ী হুট করেই নতুন এক বিষয় টেনে নিয়ে এলো।
তাহলে আমরা লুক্সরে ফিরে যাচ্ছি কেন? প্রশ্ন করল ও।
প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে গেলাম আমি। কী জবাব দেব কিছুই মাথায় এলো না। শেষে বললাম, কারণ ওটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শহর।
ইতোমধ্যে খুব সম্ভব আবু নাসকোসে চলে এসেছে আমার বাবা আর মা, কিছুটা উদাস গলায় বলল ও। আমার হুই চাচা আর বেকাথা চাচিও নিশ্চয়ই আছে তাদের সাথে, সেইসাথে আমার চাচাতো ভাইয়েরা। উটেরিকের কবল থেকে আমাকে উদ্ধার করতে নিশ্চয়ই আসবে ওরা।
আমারও তাই মনে হয়। তোমার পরিবারের সবাই এখন নীলনদের তীরে তাবু খাঁটিয়ে বসে বসে মশার কামড় খাচ্ছে, ওদিকে উটেরিক আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা সবাই আরাম করে ঘুমাচ্ছে শহরের দেয়ালের ভেতর। সেরেনা আসলে কী বলতে চাইছে সেটা এবার খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি আমি এবং চেষ্টা করছি ওকে নিরুৎসাহিত করতে। তুমি যেভাবেই বলো না কেন, এখান থেকে আবু নাসকোস অনেক দূরের পথ…।
ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার কথা তো বলছি না আমি। লুক্সরের জাহাজঘাটায় প্রায় পঞ্চাশটার মতো দারুণ জাহাজ রয়েছে, যেগুলো এখন পানমাসির কাছ থেকে চলে এসেছে আমাদের জিম্মায়, আমাকে মনে করিয়ে দিল সেরেনা। ঘোড়া ছুটিয়ে চললে আগামীকাল ভোরের আগেই লুক্সরে পৌঁছে যেতে পারব আমরা। তারপর দুই মাস্তুলের একটা দ্রুতগামী জাহাজ, একজন দক্ষ সারেং আর দাঁড়ে একদল শক্তসমর্থ দাসকে বসিয়ে দিলে দুই কি তিন দিনের মধ্যেই পৌঁছে যাব আবু নাসকোস। এবার প্রিয় টাইটা, দয়া করে আমাকে দেখাও দেখি আমার হিসাবের কোথায় ভুল আছে?
সুন্দরী কোনো নারীর সাথে কখনোই তর্কে যেতে চাই না আমি, বিশেষ করে সে যদি হয় সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী। আমিও আসলে ঠিক এ কথাগুলোই বলতে চাইছিলাম, মাথা দুলিয়ে বললাম আমি। তবে আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আজ রাতে এখানে বিশ্রাম নিতে চাইবে, কাল সকালে রওনা দিতে চাইবে লুক্সরে।
যেকোনো ভালো পরিকল্পনাই খুব সামান্য সময়ের মাঝে বদলে যেতে পারে, গম্ভীর মুখে বলল সেরেনা। হতাশ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি। এমনকি হাতের বোতলটা শেষ করার সুযোগও আমাকে দিতে রাজি নয় মেয়েটা।
৬. সারা রাত ঘোড়া
সারা রাত ঘোড়া ছুটিয়ে চললাম আমরা, এবং পরদিন ঠিক ভোরবেলা এসে পৌঁছলাম লুক্সর শহরে। প্রধান ফটকের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীরা প্রায় সাথে সাথেই চিনতে পারল আমাদের, এবং যথাযোগ্য সম্মানের সাথে শহরের ভেতরে নিয়ে গেল। রামেসিসকে ঘিরে একটি বেষ্টনী তৈরি করল তারা, তারপর লুক্সরের সোনালি প্রাসাদে নিয়ে গেল আমাদের সবাইকে। সেখানে ইতোমধ্যে নব্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে সভায় বসেছে ওয়েনেগ। আনন্দের বাগানে যাদের মৃত্যুদণ্ডের জন্য পাঠানো হয়েছে প্রায় তাদের সবাইকেই রাখা হয়েছে মন্ত্রিসভায়। অনেকেই কাপড়েই এখনো রক্তমাখা, সম্মানের চিহ্ন হিসেবে সেগুলো পরে আছে তারা। মনে হচ্ছে যেন লড়াই করে সবার মাঝে যৌবন ফিরে এসেছে আবার।
