তীর ছোড়ো সবাই! নিজের ধনুকটা কাঁধ থেকে নামাতে নামাতে চিৎকার করে নির্দেশ দিলাম আমি, চেষ্টা করছি সেরেনার সাথে তাল মেলানোর। এবার আমার দলের বাকিরাও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, তীরের বৃষ্টি বইয়ে দিতে শুরু করল শত্রুদের ওপর। প্রথম কয়েক দফা তীরবৃষ্টিতেই কমপক্ষে পনেরোজন শত্রু ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল, একেকজনের শরীরে অন্তত কয়েকটা করে তীর ঢুকেছে। বাকিরাও পরবর্তী তীরগুলোর আঘাতে একইভাবে ধরাশায়ী হতে লাগল।
প্রথমবার দূর থেকে দেখেই আমি আন্দাজ করেছিলাম যে খুব বেশি হলে ষাটজনের মতো হবে শত্রুদের সংখ্যা। ফলে দশ-বারোবার তীর ছুঁড়ে প্রথমেই ওদের সংখ্যা আমাদের সংখ্যার সমানে নামিয়ে আনলাম আমরা। কিন্তু এখন ওরা নিজেদের বিপদ বুঝে গেছে এবং ধনুকে ছিলা পরানোর চেষ্টা করছে। যত দ্রুত সম্ভব পাল্টা আক্রমণ শুরু করতে চায় সবাই।
তবে আরো একটা কথা ঠিকই খেয়াল রেখেছি আমি। এরা সবাই আমার মিশরের নাগরিক। যদিও বিপথে চলে গেছে; কিন্তু সবাই আমার স্বদেশের সন্তান। তাই খুব বেশি সময় এই হত্যাযজ্ঞ সহ্য করা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে। চিৎকার করে নির্দেশ দিলাম আমি, ধনুক ছুঁড়ে ফেলে দাও। না হলে কেউ প্রাণে বাঁচতে পারবে না! তারপর নিজের লোকদের দিকে ঘুরে বললাম, কেউ তীর ছুড়বে না। আত্মসমর্পণের সুযোগ দাও ওদের। ধীরে ধীরে নীরবতা নেমে এলো চারপাশে। কেউ নড়াচড়া করছে না। তারপর হঠাৎ করেই প্রতিপক্ষ দলের এক তীরন্দাজ এগিয়ে এলো সামনে।
আপনি কে আমি জানি, প্রভু টাইটা। হিকসসদের বিরুদ্ধে সিগনিয়ামের যুদ্ধে ফারাও টামোসের সেনাবাহিনীতে আপনার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছি আমি। আমি যখন আহত হয়েছিলাম তখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আপনি, তারপর হিকসস কুকুরগুলো যখন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেল তখন আমাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন।
লোকটার চেহারা হালকা পরিচিত লাগল আমার কাছে; কিন্তু অনেক বেশি বয়স্ক মনে হচ্ছে। দীর্ঘ এক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা; মনে হলো যেন সমগ্র সৃষ্টিজগৎ দম আটকে রেখেছে। তারপর হঠাৎ করেই তার নাম মনে পড়ে যেতে হাসি ফুটল আমার মুখে। তাই বলে ভেবো না যে আবারও তোমাকে বয়ে আনতে পারব, মেরিমোস। শেষবার তোমাকে দেখার পর কমপক্ষে দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে গেছে তোমার ওজন।
গলা ছেড়ে হেসে উঠল মেরিমোস, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নোয়াল। প্রভু টাইটার জয় হোক। এই মুহূর্তে মিশরের দুই অংশে যেই লোক তাণ্ডব চালাচ্ছে তার বদলে আপনারই উচিত ছিল মিশরের ফারাও হওয়া।
সাধারণ মানুষের মতামত কত দ্রুত বদলাতে পারে তা চিন্তা করলে বেশ অবাক লাগে আমার। ধনুকে একটা তীর জুড়ে তা ছুঁড়তে যত সময় লাগে তার চাইতেও কম সময়ের মাঝে নিজের আনুগত্য বদলে ফেলেছে মেরিমোস।
না মেরিমোস! এই দায়িত্ব এবং সম্মানের দাবিদার আমি নই, বরং ফারাও রামেসিস এবং তার ফারাওইন ল্যাসিডিমনের রাজকুমারী সেরেনা।
নামগুলো চিনতে পারার সাথে সাথেই সবার মাঝে বিস্মিত গুঞ্জনের ঢেউ বয়ে গেল। প্রথমে একজন, তারপর একে একে সবাই তাদের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল, তারপর কপাল ঠেকাল মাটিতে।
রামেসিস এবং সেরেনাকে আমার কাছে ডেকে নিলাম আমি, তারপর নীরব হয়ে আসা যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাদের প্রাক্তন শত্রুদের সামনে নিয়ে গেলাম ওদের। এক এক করে সবাই নিজেদের নাম জানাল ওদের এবং রাজদম্পতির প্রতি আনুগত্যের শপথ নিল। যুদ্ধের শেষে বেঁচে গেছে মাত্র বত্রিশজন। তবে খুশির কথা এটাই যে, প্রত্যেকেই মিশরের নতুন ফারাওয়ের প্রতি জোর গলায় সারা জীবন অনুগত থাকার প্রতিজ্ঞা করল।
সবার শেষে জেনারেল পানমাসির সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা। সেরেনার তীরের আঘাতে যেখানে পড়ে গিয়েছিল সে, এখনো সেখানেই পড়ে আছে। কেউ তার আহত স্থানের পরিচর্যা করার আগ্রহ দেখায়নি। কিছুক্ষণ আগেও যারা তার অনুসারী ছিল, এখন কেউ তার গোঙানি আর প্রলাপের দিকে কর্ণপাত করছে না, কেউ পানি এনে খাওয়াচ্ছে না তাকে। বরং সবাই দূরত্ব বজায় রেখেছে পানমাসির কাছ থেকে। তবে আমরা তিনজন যখন পানমাসির সামনে এসে দাঁড়ালাম, সবাই আগ্রহের সাথে লক্ষ করতে লাগল আমাদের।
আগেই বলেছি লোকটাকে কত তীব্রভাবে ঘৃণা করি আমি। কিন্তু এমনকি আমার ঘৃণারও একটা সীমা আছে। মনে হলো এই লোকটাকে তার কষ্টের শেষ সীমানায় পৌঁছে দিয়ে পক্ষান্তরে আমি নিজেই ওর পর্যায়ে নেমে যাচ্ছি না তো? ইচ্ছে করলেই তার যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে পারি আমি, সেই ক্ষমতা আছে আমার। অনুভব করলাম টলে যাচ্ছে আমার সেই ঘৃণার ভিত্তি। অনেকটা যেন আপনাআপনিই আমার ডান হাতটা এগিয়ে গেল কোমরে ঝুলে থাকা ছুরির দিকে। আজ সকালে আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করার সময় ছুরিটায় ধার দিয়ে রেখেছি আমি। দক্ষ শল্যচিকিৎসক হিসেবে আমি জানি গলার ঠিক কোথায় প্রধান রক্তনালিগুলো রয়েছে। এটাও জানি যে পানমাসির অবস্থায় থাকা যেকোনো মানুষকে এই উপায়ে অত্যন্ত দ্রুত এবং প্রায় যন্ত্রণাবিহীনভাবে মুক্তি দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কাজটা আমি পানমাসির প্রতি করুণা থেকে করছি না, কারণ এমন দুরাচারের প্রতি করুণার ছিটেফোঁটাও নেই আমার মনে। কাজটা করছি আমার নিজের আত্মসম্মান বোধ থেকে।
