তবে বরাবরের মতোই এবারও দেবতারা আমার সহায় হলেন। পথের পাশ ধরে এগিয়ে যাওয়া একটা অগভীর খাদের দেখা পেয়ে গেলাম আমি, এমনকি পঞ্চাশ কদম দূর থেকেও যেটার অস্তিত্ব বোঝার উপায় নেই। এবং পথ থেকে খাদটার দূরত্বও এমনই হবে। এ ছাড়া এই দূরত্ব থেকে তীর-ধনুকগুলোও দারুণ কাজ করবে। খাদের ওপাশেই রয়েছে একটা উঁচু পাথুরে দেয়ালের মতো জায়গা, যার আড়ালে লুকিয়ে রাখা যাবে আমাদের ঘোড়াগুলো। আমাদের মাঝ থেকে কেবল দুজনকে ঘোড়াগুলোর দেখাশোনা করার জন্য রাখা হলো। বাকি সবাই খাদের মাঝে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম আমরা, প্রত্যেকে ধনুকে একটা করে তীর জুড়ে নিলাম। হাতের কাছে প্রস্তুত রাখলাম আরো অনেকগুলো তীর।
*
সকালের সূর্য দিগন্ত ছাড়িয়ে খুব বেশি হলে চার আঙুল ওপরে উঠেছে, এই সময় সাত্তাকিন নদীর পাড় ধরে উঠে আসা পাথুরে পথটার ওপর অনেকগুলো ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের শব্দ পাওয়া গেল। এদিকেই আসছে শব্দটা। খাদের কিনারায় একগুচ্ছ ঘাস রেখেছি আমি, যাতে ওগুলোর আড়াল ব্যবহার করে বাইরেটা উঁকি দিয়ে দেখা যায়। বাকি সবাই খাদের কিনারা থেকে নিচে নামিয়ে রেখেছে মাথা, উবু হয়ে বসে আছে। তবে কারা আমার নির্দেশ মানবে আর কারা মানবে না তা খুব ভালো করেই জানা আছে আমার।
সে জন্যই সেরেনাকে ঠিক আমার পেছনে রেখেছি আমি। ফলে আমার দৃষ্টিপথের ভেতরে চলে আসার সম্ভাবনা নেই ওর। এই মুহূর্তে আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ সামনের পথ এবং তার ওপর দিয়ে এগিয়ে আসা লোকগুলোর ওপর। ফলে আমি মোটেই বুঝতে পারলাম না যে আমার পেছনে সোজা হয়ে বসেছে সেরেনা এবং আমার মাথা আর ঘাসের গুচ্ছটাকে ব্যবহার করছে নিজের আড়াল হিসেবে। ইতোমধ্যে ধনুর্বিদের বিশেষ হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থানে চলে এসেছে ওর শরীর, ধনুকে জুড়ে নিয়েছে একটা তীর। ঈগল তার শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঠিক আগে চোখগুলো যেমন তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে তেমনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খেলা করছে ওর চোখে।
পানমাসি আর তার দলবলকে যথেষ্ট সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ দিলাম আমি, তারপর আমার লোকদের তীর ছোঁড়ার নির্দেশ দেওয়ার জন্য মুখ খুললাম। কিন্তু চিৎকারটা আর বের হলো না আমার মুখ দিয়ে, কারণ কানের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে একটা তীর ছুটে যাওয়ার শব্দে চমকে গেছি আমি। ভারী একটা ধনুক থেকে ছোঁড়া হয়েছে তীরটা, যেটা টানতে প্রায় চল্লিশ ডেবেন ওজনের প্রয়োজন। শব্দটা হলো এমন, যেন চাবুক ফোঁটানোর তীক্ষ্ণ শব্দকে আরো অনেক গুণ বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। সূর্যের আলোতে ঝাপসা দেখাল তীরটাকে। তাও কেবল আমার তীক্ষ্ণ চোখের কারণেই ওটার গতিপথ অনুসরণ করা সম্ভব হলো, অন্য কারো চোখে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যেত তীরটা। পথ ধরে এগিয়ে আসা ঘোড়সওয়ার দলটার সবার সামনে রয়েছে পানমাসি, শরীরের ওপরের অংশ সম্পূর্ণ নগ্ন তার। শিরস্ত্রাণ আর বর্ম বেঁধে রেখেছে ঘোড়ার জিনের সাথে। দলের আর সবার মতোই সূর্যের ইতোমধ্যে কড়া হয়ে ওঠা তাপে দরদর করে ঘামছে সে। সেরেনার তীরটা গিয়ে লাগল পানমাসির দুদিকের পাঁজরের সংযোগস্থলের ঠিক নিচে এবং নাভির ঠিক তিন আঙুল ওপরে। তীরের গোড়ায় যেখানে পালক লাগানো হয়েছে সে পর্যন্ত পানমাসির পেটের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল ওটা, এত জোরে গিয়ে আঘাত করল যে, ঘোড়ার পিঠ থেকে উড়াল দিল তার শরীর। বাতাসে মোচড় খেল পানমাসি, দেখলাম যে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে তীরের মাথা। নিঃসন্দেহে মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে এই ভয়ংকর আঘাতে। তীব্র ব্যথায় চিৎকার করছে পানমাসি। আঘাতটা ভয়ংকর তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু তীরের অবস্থান খেয়াল করে বুঝতে পারলাম যে মরতে বেশ সময় লাগবে তার। খুন করার জন্যই তীর ছুঁড়েছে সেরেনা; কিন্তু অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে ধীরে ধীরে কাজটা করতে চেয়েছে ও।
বুঝতে পারলাম পানমাসির হাতে নিজের সকল অপমানের শোধ নিতে চাইছে সেরেনা, সেইসাথে ওর পরিবারের সদস্যদের কষ্ট, বিশেষ করে পালমিসের মৃত্যুরও বদলা নিতে চাইছে। যদিও আমার নির্দেশ অমান্য করেছে ও; কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না আমি। এটুকু জানি যে, সেরেনার কাছ থেকে মাঝে মাঝে এই অবাধ্যতাটুকু মেনে নিতেই হবে আমাকে।
পানমাসির দলের বাকিদের দেখে মনে হলো কী হচ্ছে এখনো বুঝতে পারেনি তারা। দলের মাঝে প্রায় কেউই সেরেনার তীরটা পানমাসির শরীরে ঢুকতে দেখেনি। বেশির ভাগই মাথা নিচু করে পথ চলছিল আর সামনের অশ্বারোহীর কারণে বেশির ভাগের দৃষ্টিসীমা ছিল সীমাবদ্ধ। পানমাসি যখন ঘোড়ার পিঠ থেকে উড়ে গিয়ে মাটিতে পড়ল, তার ঠিক পেছনে যারা ছিল তাদের পথ গেল আটকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো দলটার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল বিশৃঙ্খলা। দলের মধ্যে খুব কম অশ্বারোহীই ধনুকে ছিলা পরিয়েছে, এবং কেউই ধনুকে তীর জোড়েনি এখন পর্যন্ত। সবাই নিজেদের ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতেই এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে এটা বুঝতেই বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে গেল।
আর এই সব যখন ঘটছে তখনই দ্রুত আরো তিনটি তীর ছুঁড়েছে সেরেনা। দেখলাম তিনটিই লক্ষ্যভেদ করল, আরো তিন অশ্বারোহী তাদের ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল নিচে। ঘোড়ার খুরে পিষে গেল তাদের শরীর। পানমাসির মতো পেটের মধ্যে ঢোকেনি এই তীরগুলো, বরং পাঁজর ফুটো করে দিয়েছে। সবারই ফুসফুস অথবা হৃৎপিণ্ড অথবা দুটো অঙ্গই ফুটো হয়ে গেছে, সাথে সাথে মারা গেছে তারা।
