এখনো না, বলে মাথা তুলে আকাশের তারা দেখল ছেলেটা। আরো আধ লিগ পথ বাকি আছে, বলল সে।
আমাদের সামনে পানমাসির কোনো চিহ্ন দেখা গেছে?
এই অন্ধকারে ঘোড়া থেকে না নামলে কোনো চিহ্ন দেখা সম্ভব নয় প্রভু। আমি কি নিচে নেমে পরীক্ষা করে দেখব? প্রশ্ন করল সে।
না, তার কোনো দরকার নেই। এক মিনিটও সময় নষ্ট করা যাবে না এখন। চলতে থাকো! নির্দেশ দিলাম আমি।
পেছনে তাকালাম আমি। সেরেনা আর রামেসিসকে দেখা গেল আবছা ছায়ার মতো। আমার ঠিক পেছনেই রয়েছে ওরা। ঠিক আমার ভঙ্গিতেই ঘোড়ার পিঠে বসে ঘুমাচ্ছে রামেসিস, আর সেরেনা ওকে ধরে রেখেছে, যেন হঠাৎ পিছলে পড়ে না যায়। তবে এখনই রামেসিসকে জাগানোর প্রয়োজন বোধ করলাম না আমি। আমাদের পেছনে অন্য ঘোড়াগুলোর খুরের শব্দও পাওয়া যাচ্ছে। তবে অন্ধকারে তাদের দেখতে পাওয়ার কোনো উপায় নেই, যদিও সংখ্যায় নেহাত কম নয় তারা। সামনেটা ভালোভাবে দেখার মতো আলো ফোঁটার আগে চলার গতি বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই, তাতে বরং পানমাসির পেতে রাখা কোনো ফাঁদে পা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
জিনের সাথে চেপে ধরে ধনুকটা বাঁকিয়ে নিলাম আমি, তারপর ছিলা পরালাম তাতে। এবার ওটা কাঁধে ঝুলিয়ে তূণ থেকে পাঁচটা তীর বের করে কোমরে গুঁজে নিলাম, যাতে প্রয়োজন পড়লে দ্রুত একের পর এক ছোঁড়া যায়। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম রামেসিসের ঘুম ভেঙেছে। নিশ্চয়ই সেরেনা জাগিয়ে তুলেছে ওকে। রামেসিস নিজেও ওর অস্ত্রগুলো নিয়ে ব্যস্ত, প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত ব্যবহারের জন্য গুছিয়ে রাখছে।
আমার দিকে একবার মুখ তুলে তাকাল ও। এবার ওর চেহারাটা পরিষ্কার ধরতে পারলাম আমি। দ্রুত ফুটতে শুরু করেছে ভোরের আলো। এখন রামেসিসের পেছনে থাকা অন্যান্য ঘোড়া আর তাদের আরোহীদেরকেও দেখতে পাচ্ছি আমি। দ্রুত গুনে নিলাম একবার। বাইশজনের সবাই আছে। তারপর তাকালাম আমার ঘোড়ার পায়ের নিচ দিয়ে চলে যাওয়া পথের দিকে। সাথে সাথে চমকে উঠলাম আমি, দ্রুত হয়ে উঠল হৃদস্পন্দন। ভোরের আলোতে দেখা যাচ্ছে পথের শুকনো মাটি খুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে অনেকগুলো খুরের আঘাতে এবং ছাপগুলো এক ঘণ্টার বেশি পুরনো হবে না। এমনকি আমার চোখের সামনেই একটা দাগের কিনারার শুকনো মাটি ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল।
হাত তুললাম আমি। আমার পেছনে যারা ছিল সবাই ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল জড়ো হলো এক জায়গায়। রামেসিস আর সেরেনা আমার দুই পাশে এসে দাঁড়াল। পরস্পরের সাথে প্রায় স্পর্শ করে রইল আমাদের জুতোগুলো। ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করলাম আমরা।
আমি বোধ হয় বুঝতে পেরেছি যে আমরা কোথায় রয়েছি। একটু সামনেই খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে গেছে পথ, নিচে সাত্তাকিন নদী। ছাপ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে খুব বেশি হলে আর আধাঘণ্টার পথ সামনে রয়েছে পানমাসি। অন্ধকারে পেছন থেকে তার দলের ওপর গিয়ে পড়তে পারতাম আমরা। তবে আমি নিশ্চিত যে পানমাসি এখন ওই ঢালের মাঝে তার দলবল নিয়ে যাত্রাবিরতি করেছে। বিশ্রাম নেবে ওরা, ঘোড়াগুলোকে পানি খাওয়াবে। নিঃসন্দেহে নিজেদের পেছনে খেয়াল রাখার জন্য পাহারাদার রাখবে পানমাসি, তবে ওই উঁচু টিলাগুলোর কারণে- বলে হাত তুলে দেখালাম আমি, ওদের চোখ দেখতে এখনো দেখতে পাচ্ছে না আমাদের। বলে যেই পথ দিয়ে এসেছি সেদিকে ঘুরে তাকালাম আমি।
এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে পিছিয়ে যাওয়া, তারপর একটা চওড়া বৃত্ত তৈরি করে পানমাসির দল থেকে আরো সামনে গিয়ে হাজির হওয়া। ওদের বিশ্রামের সুযোগে এই কাজটা করতে হবে আমাদের। তারপর ওরা যখন আবার চলতে শুরু করবে তখন ওদের নজর পেছনেই থাকবে। কিন্তু আমরা ওদের জন্য অপেক্ষা করব পথের সামনে।
কেউ কোনো আপত্তি জানাল না, এমনকি সেরেনাও না। সুতরাং এবার উল্টো দিকে ঘুরলাম আমরা, দক্ষিণ দিক লক্ষ্য করে বেশ কিছুটা দূর পথ চললাম। তারপর একটা চওড়া অর্ধবৃত্ত রচনা করে রওনা দিলাম পুব অভিমুখে। সাত্তাকিন নদী যেখানে গিরিখাতের মাঝে ঢুকে নীলনদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য এগিয়ে গেছে তার বেশ কিছুটা আগে একটা জায়গায় ঘোড়াগুলো নিয়ে নদী পার হলাম আমরা।
নদী পার হওয়ার পরেও একই অর্ধবৃত্তাকার পথ ধরে এগিয়ে চললাম এবং শেষ পর্যন্ত সেই পথটার দেখা পাওয়া গেল, যেটা লুক্সর থেকে বের হয়ে নীলনদের পুব তীরের পাশাপাশি এগিয়ে গেছে। খুব সাবধানতার সাথে পথটার দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। কয়েক শ হাত দূরে থাকতে নেমে পড়লাম ঘোড়া থেকে, তারপর সঙ্গের সব কিছু একটা অগভীর খাদের মাঝে লুকিয়ে রেখে পায়ে হেঁটে এগোতে শুরু করলাম। রাস্তার কাছাকাছি এসে দেখলাম কোথাও কোনো মানুষ বা ঘোড়ার পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা দেখে স্বস্তি পেলাম ঠিকই তবে অবাক হলাম না।
এখান থেকে পশ্চিম দিকে মোটামুটি মাইলখানেক এগোলেই নীলনদ এবং লুক্সর ও আবু নাসকোসের মাঝে যোগাযোগের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পথ। আমি যেমনটা আশা করেছিলাম এখনো দলবল নিয়ে সাত্তাকিন নদীর পারেই অপেক্ষা করছে পানমাসি, ধরে নিয়েছে যে আমরা ওর পিছু নিইনি। চুপিসারে তার সামনের পথে অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছি আমরা। পথের পাশ ধরে দৌড়াতে শুরু করলাম আমি, যাতে ঘাস অথবা আগাছার কারণে আমার পায়ের কোনো ছাপ না পড়ে। একই সাথে খুঁজছি লুকিয়ে থাকার জন্য একটা সুবিধাজনক জায়গা, যেখান থেকে আক্রমণ চালানো যায়। এই কাজটা অবশ্য বেশ কঠিন হলো, কারণ সাত্তাকিন নদীর পাশে যে ছোট ছোট পাহাড় এবং টিলাগুলো রয়েছে তাতে গাছপালা প্রায় নেই বললেই চলে। ঘাস আছে ঠিকই কিন্তু খুব কম জায়গাতেই সেগুলো হাঁটু সমান উচ্চতা ছাড়িয়েছে।
