কিন্তু পালিয়ে গেছে পানমাসি এবং আমরা সবাই ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেছি। দীর্ঘ এক রাত এবং এক দিন একনাগাড়ে লড়াই করতে হয়েছে আমাদের, তার ওপর আমাদের বেশির ভাগই যৌবন পার করে এসেছে অনেক আগে। প্রায় সবার শরীরেই আঘাতের চিহ্ন। যদিও বেশির ভাগই ছোটখাটো; কিন্তু তাই বলে ব্যথা কম দিচ্ছে না। আর আমি নিজেও ক্লান্ত, প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। অনেকটা নিজের অজান্তেই যেন সেরেনার দিকে তাকালাম আমি। আমার চোখে হয়তো আবেদন রয়েছে বলে ভুল করল ও।
চাবুক খাওয়া কুকুরের মতো মনিবের কাছে আশ্রয় নিতে ছুটেছে পানমাসি, আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল সেরেনা। সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম এইমাত্র সমস্যাটার সমাধান হয়ে গেল। পানমাসিকে অনুসরণ করার কোনো প্রয়োজন নেই আমাদের। আমরা জানি যে কোথায় চলেছে সে। হঠাৎ করেই অনুভব করলাম, সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে আমার শরীর থেকে।
*
আবু নাসকোসে উটেরিকের কাছে পৌঁছানোর আগেই যদি পানমাসিকে ধরতে হয় তবে আমাদের ঘোড়া দরকার হবে। যা বোঝা যাচ্ছে পালানোর আগে নিজের এবং সঙ্গীদের জন্য ঘোড়াগুলো সব নিয়ে গেছে সে। অতিরিক্ত ঘোড়াগুলোকে পঙ্গু করে রেখে গেছে, যাতে আমরা ব্যবহার করতে না পারি। সুন্দর একটা ঘোড়া, যার পেছনের দুই পায়ের রগ কেটে ফেলা হয়েছে তার চাইতে করুণ দৃশ্য পৃথিবীতে আর কিছু আছে কি না আমার জানা নেই। পানমাসি ইচ্ছে করেই করেছে কাজটা। ইচ্ছে করলে ঘোড়াগুলোকে তাড়িয়ে দিতে পারত সে অথবা সরাসরি খুন করে যেতে পারত। কিন্তু তা না করে স্রেফ আমাদের রাগানোর জন্যই ঘোড়াগুলোকে অকেজো করে রেখে গেছে। পানমাসির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আরো একটা কারণ তৈরি হলো আমার মনে।
আমি এতই রেগে উঠেছিলাম যে আরেকটু হলেই পানমাসিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য সেরেনাকে ধমক দিয়ে বসেছিলাম। শয়তানটাকে যখন হাতের মুঠোয় পাওয়া গিয়েছিল তখন স্রেফ সেরেনার কথাতেই আমি আর হুরোতাস তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। কিন্তু সেরেনাকে এত ভালোবাসি আমি, ওর প্রতি নিষ্ঠুরতা কীভাবে দেখাই? তার বদলে বরং ওকে আনন্দের বাগানে পাঠালাম আবার, বললাম ওখান থেকে ঘোড়া নিয়ে আসতে। তারপর ও চলে যেতে পানমাসির হাতে পঙ্গু হয়ে যাওয়া ঘোড়াগুলোর দুই কানের মাঝে তলোয়ারের এক আঘাতে ওদের যন্ত্রণার অবসান ঘটালাম।
আনন্দের বাগান থেকে আসা ঘোড়াগুলো বাদেও পানমাসির লোকদের নজর এড়িয়ে গেছে এমন বেশ কিছু অক্ষত ঘোড়া চোখে পড়ল আমাদের। শহর থেকে পালানোর সময় তাড়াহুড়োতে এই ঘোড়াগুলোকে ফেলে রেখে গেছে। ওরা। ফলে সব মিলিয়ে বাইশটা ঘোড়া জোগাড় করা গেল। এগুলো ব্যবহার করেই পানমাসির পিছু ধাওয়া করতে হবে আমাদের।
সেরেনা যখন জেদ ধরে বসল যে পানমাসি এবং তার লোকদের পিছু নিতে আমাদের সাথে ও নিজেও যোগ দিতে চায়, স্বাভাবিকভাবেই আমি এবং রামেসিস তীব্র আপত্তি জানালাম। সেই একই পুরনো অজুহাত ব্যবহার করলাম আমরা, বললাম যে এই অবস্থায় দীর্ঘ পথ ঘোড়ার পিঠে পাড়ি দিলে তার গর্ভের বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে সে।
মুখে মিষ্টি হাসি ধরে রেখে আমাদের সব কথা শুনল সেরেনা, বারবার মাথা ঝাঁকাল, যেন আমাদের মতামত মেনে নিতে কোনো আপত্তি নেই ওর। তারপর যখন আমাদের কথা ফুরিয়ে এলো এবং ওর কথা শোনার জন্য আশান্বিত চোখে তাকিয়ে রইলাম আমরা তখন ও মাথা নাড়ল। তোমরা যা বলছ তা যদি সত্যি হতো তাহলে আমি সত্যিই খুশি হতাম। কিন্তু দেবী আর্টেমিসের ইচ্ছে অন্য রকম, বলল ও। তুমি আমাকে আনন্দের বাগানে রেখে আসার ঠিক পরপরই দেবী আমাকে লাল চাঁদ দেখিয়েছেন।
সে আবার কী জিনিস? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল রামেসিস। নারীদেহের রহস্যগুলো সম্পর্কে এখনো ও আশ্চর্য রকমের অবোধ।
ওকে বোঝাও টাটা, আবেদন জানাল সেরেনা।
দেবী আর্টেমিস তোমাদের বলতে চাইছেন, যথেষ্ট নয়। আবার চেষ্টা করো, রামেসিসকে বুঝিয়ে বললাম আমি।
কয়েক মুহূর্ত ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করল রামেসিস, তারপর হঠাৎ খুশির হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। দেবীকে বলো তার নির্দেশ খুব খুশি মনেই পালন করব আমি!
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দীর্ঘ যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলাম আমরা। এবার পানমাসিকে ধরতে হবে, চেষ্টা করতে হবে সে যেন কোনোভাবেই উত্তরের শহর আবু নাসকোসে অবস্থানরত তার প্রভু উটেরিকের কাছে পৌঁছতে না পারে। এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই আর কোনো তর্কবিতর্কের প্রয়োজন হলো না। লাল চাঁদ দেখা যাক আর না-ই যাক সেরেনা বুঝিয়ে দিয়েছে যে তাকে আর অগ্রাহ্য করা যাবে না। এবার আমাদের সাথে যাবে ও।
ঘোড়ার পিঠে বসা অবস্থায় দুই পা ঘোড়ার পেটের নিচ দিয়ে বেঁধে কীভাবে ঘুমাতে হয় সেই কায়দা অনেক আগেই রপ্ত করে নিয়েছি আমি। শুধু আমাদের সঠিক পথে রাখার জন্য একজন পরিচারক থাকলেই যথেষ্ট। ভোরের এক ঘণ্টা আগে ঘুম ভাঙল আমার, এবং এক মুহূর্তের মধ্যেই সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে উঠলাম। অনুভব করছি সম্পূর্ণ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে আমার শরীর। শিকারের দেখা পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছি আমি।
সাত্তাকিন নদী কি এখনো পার হয়েছি আমরা? সামনের ঘোড়ায় বসে থাকা পরিচারককে জিজ্ঞেস করলাম এবার। লুক্সরের দক্ষিণে নীলনদের মাঝে পতিত হওয়া অজস্র জলধারার মাঝে সবচেয়ে বড় হচ্ছে এই সাত্তাকিন নদী।
