উটেরিক নামটার সাথেও তারা বেশ ভালোভাবেই পরিচিত, এই মুহূর্তে তার কুশাসনই বিদ্যমান মিশরে। তার সম্মান রক্ষার্থে যেসব মন্দির তৈরি হচ্ছে তার নির্মাণ খরচ আসে জনগণের ওপর নির্ধারিত আকাশছোঁয়া কর থেকে। একসময় অঢেল পরিমাণে লাল মদ আর মাংস দিয়ে উদরপূর্তি করতে পারত সবাই, এখন সেখানে পচা রুটিও জোটে কি না সন্দেহ। তাদের চোখের সামনেই পুরনো বন্ধুদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ভয়ানক সেই কারাগারে, যেখান থেকে কেউ ফেরে না। অথচ কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি।
এখন যেই রামেসিসের নাম তাদের কানে প্রবেশ করল, সবাই বুঝতে পারল যে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করার এটাই শেষ সুযোগ তাদের সামনে। ফলে অলস সময় কাটানোর সঙ্গী পুঁথিপত্র আর পাশা খেলার ছক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল তারা। চিৎকার করে নিজেদের স্ত্রীদের নির্দেশ দিল সিঁড়ির নিচ থেকে মরচে ধরা অস্ত্র আর বর্ম আবার বের করে আনতে। তারপর পাঁচ-দশজনের দলে ভাগ হয়ে নেমে আসতে শুরু করল রাস্তায়, কান পেতে শুনল কোন দিক থেকে আসছে সেই রণহুংকার, রামেসিসের জয় হোক! তারপর সেই শব্দ লক্ষ্য করে কেউ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, কেউ হেঁটে, কেউ বা দৌড়ে এগিয়ে এলো আমাদের কাছে, তারপর পুরনো সঙ্গীদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেল, বর্মের দেয়ালের এ পাশ থেকে শুরু করল লড়াই।
সমস্ত রাত ধরে লড়াই করলাম আমরা। রাত গড়িয়ে দিন হলো; কিন্তু লড়াই থামল না। সমস্ত দিন লড়াই চলার পর সন্ধ্যা নাগাদ বুঝতে পারলাম বিজয় আমাদের হাতেই ধরা দিতে চলেছে। নতুন উৎসাহে উজ্জীবিত হয়ে লড়াই চালিয়ে গেলাম আমরা। পানমাসির সৈন্যদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়তে শুরু করল আমাদের সামনে। শেষ পর্যন্ত তারা দলে দলে ভাগ হয়ে রামেসিসের পক্ষে যোগ দিতে শুরু করল। দেরিতে হলেও তারা বুঝতে পেরেছে যে রামেসিস বাইরের কেউ নয় বরং এই মিশরেরই সন্তান এবং উটেরিকের চাইতে বহু গুণে যোগ্য একজন ফারাও। রাতের আঁধার নেমে আসার সাথে সাথে পানমাসির দলের যেটুকু প্রতিরোধ বাকি ছিল তাও ধুলোয় মিশে গেল। যারা আমাদের সাথে যোগ দিল না তারা সবাই পালিয়ে গেল শহর ছেড়ে।
পানমাসি এবং তার অনুগত সৈন্যদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের পিছু নিয়ে শহর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা এবং প্রধান ফটক দিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথে যার সাথে প্রথম দেখা হলো সে হচ্ছে রাজকুমারী সেরেনা।
রামেসিস আর আমি যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে লুক্সর শহরে ঢুকে পানমাসি এবং তার সৈন্যদের ওপর হামলা চালাব তখন সেরেনাকে বোঝতে দারুণ বেগ পেতে হয়েছিল আমার। নিজের সবটুকু ইচ্ছাশক্তি এবং প্রভাব বিস্তার করে শেষ পর্যন্ত ওকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে, রামেসিস এবং ওর পরিবারের কথা চিন্তা করেই সেরেনার উচিত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নেওয়া। এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় এটাও বলেছিলাম যে, এখন ও একজন বিবাহিত নারী এবং যে দারুণ উৎসাহের সাথে ও বিবাহপরবর্তী কর্তব্য সম্পাদন করেছে, তাতে এ সম্ভাবনা খুবই প্রবল যে ওর গর্ভে এখন রামেসিসের সন্তান। এখন আর যুদ্ধক্ষেত্র ওর উপযুক্ত স্থান নয়। এখন থেকে নিজের গর্ভের সন্তানের প্রতিই ওর সবটুকু খেয়াল রাখা উচিত। যদিও সম্ভাব্য সকল উপায়ে আমাকে কাটানোর চেষ্টা করেছে ও, যেভাবেই হোক লুক্সর দখলের যুদ্ধে রামেসিসের পাশে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে রামেসিসও আমার পক্ষ নিয়েছে বলেছে যে, ওর স্ত্রী হিসেবে নিশ্চয়ই সেরেনার উচিত তার গর্ভের সন্তানকে নিরাপদে রাখা এবং সে জন্য অবশ্যই সেরেনাকে আনন্দের বাগানে থাকতে হবে। এই পর্যায়ে আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে, দুজনই। যেমন গোঁয়ার ওদের মাঝে আবার ঝগড়া না বেঁধে যায়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, প্রায় সাথে সাথেই রামেসিসের কথায় রাজি হয়ে গেল সেরেনা। কখনোই বুঝতে পারিনি যে মাতৃত্বের দায়িত্বকে এত গুরুত্বের সাথে নেবে ও। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থেকেছে ঠিকই; কিন্তু আমাদের মাঝে কোনো দুর্বলতা দেখলে সাথে সাথে সেই জায়গা দখল করার জন্য ঠিকই শহরের বাইরে এসে হাজিরও হয়েছে। অবশ্য সেরেনার কাছ থেকে এর চাইতে কম কিছু আশা করাও উচিত হয়নি আমার।
সেরেনার সাথে যখন আমাদের দেখা হলো তখন মধ্যরাতের আকাশে সামান্য এক ফালি চাঁদ অবশিষ্ট রয়েছে কেবল, প্রায় নিশ্চিদ্র অন্ধকার বিরাজ করছে চারপাশে। এই সামান্য আলোতে পানমাসি আর তার দলবলের অনুসরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি জানি যে পানমাসি যদি আমাদের চাইতে বারো ঘণ্টার পথ এগিয়ে যেতে পারে তাহলে তাকে আর জীবনেও ধরা সম্ভব হবে না। তাকে আমার চাই। জীবনে আর কখনো কারো ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এত ব্যাকুল হয়ে উঠিনি আমি। আমার এবং আমার প্রিয় মানুষগুলোর ওপর ওই লোকটা যে পরিমাণে কষ্ট আর দুর্ভোগ নামিয়ে এনেছে তার প্রতিটি মুহূর্ত মনে রেখেছি আমি। পানমাসি এবং তার লোকেদের হাতে নিহত পালমিসের ক্ষতবিক্ষত দেহের কথা মনে পড়ল আমার, সেইসাথে মনে পড়ল ছেলেকে অনন্ত শয্যায় শায়িত করার সময় হুই আর বেকাথার কষ্টের কথা। কিন্তু তার চাইতেও বেশি মনে পড়ল সেরেনাকে অপহরণ করার পর ওকে কীভাবে মেরেছিল সে, মারের চোটে ফুলে উঠেছিল সেরেনার চেহারা। অনুভব করলাম পানমাসির পেটের ভেতর তলোয়ার সম্পূর্ণ সেধিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত শান্তি নেই আমার।
