শেষ প্রহরীটার মুখও বন্ধ করে দেওয়ার পর কান খাড়া করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম আমরা। যদি কোনো প্রহরী আমাদের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে থাকে। তাহলে নিশ্চয়ই তার সাড়াশব্দ পাওয়া যাবে। কিন্তু না, আর কোনো শব্দ পাওয়া গেল না। ধীরে ধীরে চেপে রাখা দম ছাড়লাম আমরা, তারপর চকমকি ঘষে তেলের বাতিগুলো জ্বালালাম। আলো জ্বলে উঠতে এদিক-ওদিক তাকালাম এবার। দেখলাম লম্বা একটা ঘরের মাঝে রয়েছি আমরা। মেঝের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্কুপ আকারে রাখা রয়েছে নানান ধরনের যুদ্ধাস্ত্র।
সবাই হাত লাগাও বন্ধুরা, তাড়াতাড়ি করো। অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। আমাদের সামনে, সবাইকে নির্দেশ দিলাম আমি। সাথে সাথে গুদামের এ মাথা থেকে ও মাথায় ছড়িয়ে পড়ল সবাই, অস্ত্রের স্তূপ থেকে তীর-ধনুক আর নানা ধরনের ধারালো অস্ত্র বেছে নিতে শুরু করল। ধনুকে ছিলা পরানোর আগে সেগুলোর নমনীয়তা পরীক্ষা করে নেওয়া হলো, বুড়ো আঙুলে ঘষে পরীক্ষা করা হলো তলোয়ারের ধার। ওদিকে আমি আর রামেসিস তাড়া দিয়ে চললাম সবাইকে, দ্রুত হাত চালানোর জন্য তাগাদা দিতে লাগলাম।
সবার হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র তুলে নিতে সময় খুব বেশি লাগল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই দিক বাঁকানো ধনুক, দুই কাঁধে ঝোলানো তীরভর্তি জোড়া তূণ আর কোমরের খাপে ভরা চকচকে ধারালো তলোয়ার বা ছোরা নিয়ে বেরিয়ে এলো। আমার লোকেরা। দলের নেতাদের কাছ থেকে ভেসে এলো নিচু গলার নির্দেশ, সেই অনুযায়ী তেলের বাতিগুলো নিভিয়ে ফেলে সবাই আবার আগের মতো নিজ নিজ দলে ভাগ হয়ে গেল। তারপর নুড়ি বিছানো পথ ধরে শহরের প্রধান দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। দরজার সামনে এসে দেখলাম ভেতর থেকে আটকানো রয়েছে দরজা; কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না আশপাশে। রামেসিস এবং আমার সাথে যারা ছিল তারা পথের দুই পাশে নালার মাঝে নেমে পড়ে অবস্থান নিল আর আমরা দুজন এগিয়ে গেলাম সামনে। দরজার গায়ে কান পাতলাম আমি; কিন্তু এবারও কিছু শোনা গেল না। এবার কোমরের খাপ থেকে ছুরিটা বের করে বাঁট দিয়ে দরজার গায়ে আস্তে আস্তে টোকা দিলাম। সামান্য বিরতি দিয়ে তিনটি করে টোকা, তিনবার।
সাথে সাথেই জবাব পাওয়া গেল। এই সংকেতই ঠিক করে রাখা ছিল আগে থেকে। দরজার গায়ে তৈরি করা ফুটোর দিকে এগিয়ে গেলাম আমি। কয়েক মুহূর্ত পর ওপাশ থেকে ফুটোর আবরণ উঠে গেল। দেখলাম শেহাবের উজ্জ্বল চোখগুলো তারার আলোতে জ্বলজ্বল করছে, তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমাদের বন্ধুদের কী খবর? মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
ঘুমাচ্ছে! একই রকম মৃদু গলায় জবাব দিল সে, তারপর ফুটোটা আবার বন্ধ করে দিল। শুনলাম দরজার ওপাশে লাগানো খিলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। সে। বড় ফটকের গায়ে ছোট একটা দরজা আছে। একেবারেই সরু, একবারে বড়জোর একজন মানুষ ঢুকতে পারে; তবে মাথা নুইয়ে এবং কাঁধের ধনুকটা সামলে ভেতরে ঢুকতে হবে তাকে। শেহাবকে দাঁত বের করে হাসতে দেখলাম আমি। দেয়ালের গায়ে ঝুলছে কয়েকটা তেলের প্রদীপ, তার আলোতে শেহাবের পেছনে কয়েকজন প্রহরীকে ঘুমন্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেল। কয়েকজন তো আরামে নাক ডাকতে লেগেছে। আরেকজনের হাতে রয়েছে সেই মদের বোতলটা, যেটা গতকাল শেহাবকে দিয়েছিলাম আমি। তবে এখন বোতলটা খালি, সেটাকে বুকের সাথে উল্টো করে চেপে ধরে বেঘোরে ঘুমোতে লেগেছে ব্যাটা। নিজের বাকি সঙ্গীদের মতোই এখন পৃথিবীর কোনো কিছুর প্রতি খেয়াল নেই তার। মদের সাথে লাল শেপেনের যে রস আমি মিশিয়ে দিয়েছিলাম তা অত্যন্ত কড়া ঘুমের ওষুধ।
আমার পেছনে প্রথম যে পাঁচজন ঢুকল তাদের ওপর দায়িত্ব দিলাম ঘুমন্ত প্রহরীদের হাত-পা এবং মুখ বেঁধে ফেলার। সংযোগ রাখার জন্য ব্যবহৃত দড়ি এবং বন্দিদের নিজেদের কাপড়চোপড় ব্যবহৃত হলো এই কাজে। এরপর যারা ভেতরে ঢুকল তাদেরকে কাজে লাগালাম ঝুলন্ত দরজাটাকে ওপরে টেনে তুলতে। বড়সড় কাঠের চাকাটার হাতল ধরে গায়ের জোরে ঘোরাতে শুরু করল তারা। বিশাল দরজাটা ক্যাচকোচ শব্দে ওপরে উঠে যেতে শুরু করল। যথেষ্ট উঁচু হতেই তার নিচ দিয়ে ঢুকে পড়ল আমাদের দলের বাকি সদস্যরা, সবার হাতে সদ্য ছিনতাই করে আনা অস্ত্র। তবে আমার নির্দেশ অনুযায়ী সবাই চেষ্টা করছে যতটা সম্ভব নীরবে কাজ সারার। কেউ কোনো যুদ্ধ হুংকার ছাড়ল না, এমনকি দলের নেতারাও ফিসফিস করে নির্দেশ দিতে লাগল সবাইকে। কিন্তু তার পরও তাদের ব্রোঞ্জের তলাওয়ালা জুতো এবং অস্ত্রের ঝনঝনানিতে যে শব্দ তৈরি হলো তাও নেহাত কম নয়। আমাদের সবাই ভেতরে ঢুকতে পারার আগেই পানমাসির সৈন্যরা ছুটে এলো এদিকে। শহরের ভেতরের রাস্তাগুলোতে টহল দিচ্ছিল তারা, হট্টগোলের আওয়াজ পেয়ে কী হয়েছে দেখতে এসেছে। ধাতব ঝনঝন আর পায়ের শব্দ শুনে প্রবেশপথের দিকে এসেই আমাদের মুখোমুখি হতে হলো তাদের। এক মুহূর্তের মধ্যে নিস্ত ব্ধ রাস্তা পরিণত হলো রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে। দুই পক্ষের ক্রমাগত রণহুংকারে কেঁপে উঠতে লাগল রাতের নৈশব্দ্য। এই দল যদি বলে অপরাজেয় উটেরিক দীর্ঘজীবী হোন! তো ওই দল বলে রামেসিসের জয় হোক!
নীচু বংশের সব গ্রাম্য ছেলেপিলে দিয়ে নিজের সেনাবাহিনী বোঝাই করেছে উটেরিক, খুব সম্ভব ফারাও টামোসের প্রতি ওদের তেমন কোনো আনুগত্য নেই বলেই। তা ছাড়া ওদেরকে যেকোনো ব্যাপারে প্রভাবিত করাও খুব সহজ। তাদের তুলনায় আমাদের লোকেরা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বয়স্ক। অনেকেই আর আগের মতো শক্তসমর্থ নেই। কিন্তু যুদ্ধবিদ্যায় তারা অত্যন্ত দক্ষ এবং জীবনের বেশির ভাগ সময় এই শহরে কাটানোয় এখানকার সব অলিগলি তাদের হাতের তালুর মতো মুখস্থ। শুরুতে তরুণ সৈন্যদের সংখ্যার মুখে আমরা কোণঠাসা হয়ে পড়লাম ঠিকই, স্রোতের মতো সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল তারা। কিন্তু আমার লোকেরা জানে যে কীভাবে টিকে থাকতে হয়। বৃত্তাকারে দলবেঁধে দাঁড়িয়ে গেল তারা, তারপর ঢাল দিয়ে দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করে তার আড়াল থেকে আক্রমণ চালিয়ে গেল উটেরিকের সৈন্যদের ওপর। যুদ্ধ সংগীত গাইতে লাগলাম আমরা। ওদিকে গণ্ডগোলের আভাস পেয়ে লুক্সরের সাধারণ মানুষও ঘুম থেকে জেগে উঠল, আমাদের গানের শব্দ কানে গেল তাদের। রামেসিসের নাম শুনতে পেয়ে অনেকের রক্তে নাচন লাগল। পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর বয়সের দাড়িওয়ালা যোদ্ধারাও শুনতে পেল সেই নাম। তাদের মনে পড়ে গেল এই রামেসিসের বাবা ফারাও টামোসের হয়ে যুদ্ধ করেছে তারা এবং তিনি ছিলেন এক মহৎ ফারাও।
