শহর থেকে যে দুজন ফিরে আসতে পারল তারাও দারুণ কাজের মানুষ। পরস্পর আপন ভাই তারা, নাম শেহাব এবং মাহাব। শহরের ভেতরে নিজেদের বন্ধু আত্মীয়স্বজন এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছে তারা, তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও জোগাড় করেছে। জানা গেছে। জেনারেল পানমাসিকেই নিজের অবর্তমানে সব দায়িত্ব দিয়ে গেছে উটেরিক। এই লোকই ল্যাসিডিমন থেকে সেরেনাকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছিল মিশরে। তবে সে একই সাথে শত্রু হিসেবে ধূর্ত এবং ভয়ংকরও বটে, এবং ব্যাপারটা চিন্তা করে কিছুক্ষণের জন্য হলেও থমকে গেলাম আমি।
দুই ভাই আরো জানাল যে, জেনারেল পানমাসির হাতে এই মুহূর্তে খুব বেশি হলে তিন থেকে চার শ লোক আছে। সৈন্যদের বাকিরা গেছে উটেরিকের সাথে আবু নাসকোস শহরে হুরোতাসের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে পানমাসি এবং উটেরিকের কোনো ধারণাই নেই যে এ পর্যন্ত তাদের হাত থেকে কত লোককে বাঁচিয়েছি আমরা। উটেরিক নিশ্চয়ই ধারণা করেছে যে তার প্রিয় জল্লাদ ডুগ সবাইকেই সফলভাবে খুন করেছে। ডুগ যে এখন আর নিরপরাধ ব্যক্তিদের ওপর অত্যাচার চালানোর মতো অবস্থায় নেই এবং তার চকচকে খুলিটা এখন আনন্দের বাগানের টানা সেতুর ওপর শোভা পাচ্ছে- এটা ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করতে পারেনি তারা।
তাই প্রথমেই পানমাসির এই ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। দুই সাহসী ভাইয়ের কাছ থেকে সব খবর শোনার প্রায় সাথে সাথেই পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করলাম আমরা। পানমাসি তার লোকদের জন্য কোথায় থাকার ব্যবস্থা করেছে এবং রাতের বেলা যখন শহরের প্রবেশদ্বার বন্ধ থাকে তখন সেখানে কত লোক থাকে- এই সব খবরই নিয়ে এসেছে তারা। তার ওপরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যেটা ওরা শুনে এসেছে যে, রামেসিসের নাম এখনো মানুষের মনে জাগরূক। সেইসাথে আমাকেও মনে রেখেছে তারা, বিশেষ করে লুক্সরের বাসিন্দারা। কারণ আমরা দুজনই এই শহরের সন্তান। তাই আমরা ঠিক করলাম আমাদের এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েই পানমাসিকে উৎখাত করার ব্যবস্থা করতে হবে। হুরোতাসের সেনাবাহিনী কবে আবু নাসকোস দখল করবে আর কবেই বা লুক্সরে আমাদের কাছে এসে পৌঁছবে তার জন্য অপেক্ষা করার কোনো সময় নেই। কারণ এতে কয়েক মাস যেমন লাগতে পারে তেমন কয়েক বছরও লাগতে পারে।
উটেরিকের হাত থেকে এ পর্যন্ত ৩৮২ জন শক্তসমর্থ পুরুষকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি আমরা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের অস্ত্রশস্ত্রের ভাণ্ডার অত্যন্ত অপ্রতুল। তবে আমাদের দুই গুপ্তচর জানাল, শহর ত্যাগ করার আগে উটেরিক তার লোকদের নির্দেশ দিয়ে গেছে শহরের প্রত্যেক বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সব অস্ত্র এক জায়গায় জড়ো করতে। ফলে শুধু তার লোকদের কাছে ছাড়া আর কোথাও কোনো অস্ত্র নেই। বাজেয়াপ্ত করা অস্ত্রগুলো সব পানমাসির লোকেরা শহরের বাইরে বন্দরের কাছে একটা গুদামে জড়ো করে রেখেছে। এসব অস্ত্রের মাঝে রয়েছে কয়েক শ দুই দিক বাঁকানো ধনুক এবং সবগুলোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে শক্ত পাথরের ফলা লাগানো তীর। তার সাথে আরো রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ব্রোঞ্জের তলোয়ার এবং ছোরা আর এক শর ওপরে যুদ্ধের কুঠার।
যে রাতে আমরা লুক্সর শহরের ওপর হামলা চালাব বলে ঠিক করলাম সে রাতে আকাশে কেবল এক ফালি ক্ষয়টে চাঁদ থাকার কথা, এবং আমাদের হিসাব অনুযায়ী তা ঠিক মাঝরাতের পরপরই ডুবে যাবে। ফলে দারুণ সুবিধা হয়ে যাবে আমাদের। চাঁদের হালকা আলোতে পথ চিনে নিয়ে বন্দরের নির্দিষ্ট গুদামের কাছে পৌঁছে যেতে পারব আমরা। তারপর চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য যখন নিশ্চিদ্র অন্ধকার প্রয়োজন তখনই চাঁদ ডুবে গিয়ে আমাদের আরো সুবিধা করে দেবে। হামলার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কয়েকটা ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেওয়া হবে। প্রত্যেক দলের মধ্যে দড়ির সাহায্যে সংযোগ রাখা হবে, যাতে অন্ধকারের মাঝে কোনো দল আলাদা না হয়ে যায়। প্রত্যেক দলের মধ্যে দুজনের হাতে থাকবে বড় হাতুড়ি, গুদামে পৌঁছানোর সাথে সাথে তার দরজা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলবে তারা। হাতুড়ির শব্দে শহরের প্রহরীদের সতর্ক হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, কারণ বন্দরটা শহর থেকে বেশ দূরে। তার ওপর শহর এবং বন্দরের মাঝখানে রয়েছে বেশ কিছু টিলা, ফলে আরো কমে যাবে শব্দ।
সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা পর আনন্দের বাগান থেকে রওনা দিলাম আমরা। কিছুটা দূরত্ব রেখে পরস্পরকে অনুসরণ করতে লাগল ছোট ছোট দলগুলো। নির্দিষ্ট গতিতে এগোলাম আমরা, ফলে সঠিক সময়েই পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। বন্দরের পৌঁছানোর পর সংযোগ রাখার জন্য ব্যবহৃত দড়িগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলাম, তারপর চুপিসারে চলে এলাম গুদামের দরজার কাছে। তিনটি দলই জায়গামতো অবস্থান নেওয়ার পর আমার সেই দুই আঙুলের কান ফাটানো শিসটা বাজালাম একবার। সাথে সাথে হাতুড়ির বাড়ির শব্দে ভরে উঠল জায়গাটা। কয়েক বাড়িতেই ভেঙে পড়ল গুদামের দরজা। ভেতরে ঝিমোচ্ছিল প্রহরীদের দল, হঠাৎ করে আরামের ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিভ্রান্ত হয়ে চেঁচামেচি শুরু করল তারা। তবে যেই হাতুড়ি দিয়ে দরজা ভাঙা হয়েছে সেই একই হাতুড়ির ঘায়ে তাদের আবার ঘুমের দেশে পাঠিয়ে দিতে খুব একটা দেরি হলো না।
