শেষ পর্যন্ত আমি জিজ্ঞেস করলাম ওদের আর কিছু বলার আছে কি না। এই কথা শুনে পরস্পরের সাথে অর্থপূর্ণ ভঙ্গিতে দৃষ্টি বিনিময় করল দুজন। শেষ পর্যন্ত সেরেনাই মুখ খোলার সিদ্ধান্ত নিল।
আমরা বিয়ে করতে চাই, বলল ও। কথাটা শুনে দারুণ অবাক হয়ে গেলাম আমি।
ঠিক বুঝতে পারলাম না তোমার কথা, সাবধানতার সাথে জবাব দিলাম আমি। এমন তো নয় যে দুষ্টুমি করতে করতে নিষিদ্ধ কিছু করে ফেলেছ তোমরা, এবং এখন তার ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য তড়িঘড়ি করে বিয়ে করতে চাইছ?
না! না! এভাবে বোলো না টাটা। সত্যি কথা বলতে, ওই দুষ্টুমি না করার কারণেই আজ প্রথমবারের মতো ঝগড়া হয়েছে আমাদের মাঝে।
এবার আমি সত্যিই বিভ্রান্ত বোধ করছি, স্বীকার করলাম আমি। বুঝিয়ে বলো তো কী হয়েছে?
আজ আমাদের মাঝে প্রথমবারের মতো ঝগড়া হয়েছে, কারণ আমি ওটা করতে চাচ্ছিলাম অথচ রামেসিস চাইছিল না। ও বলছে ও নাকি বিয়ের আগে এসব কিছু করবে না বলে কথা দিয়েছে আমার মাকে।
তুমিও তো তোমার মাকে কথা দিয়েছিলে, তাই না সেরেনা? প্রশ্ন করলাম আমি।
দিয়েছিলাম; কিন্তু তখন তো বুঝতে পারিনি যে এত লম্বা সময় ধরে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে আমাকে, উদাস গলায় বলল ও। এক বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি আমি, আর পারছি না। আর এক দিনও অপেক্ষা করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত টাটা। কিন্তু আজ রাতেই আমাদের বিয়ে দিতে হবে তোমাকে!
আগামীকাল হলে ভালো হয় না? একটু সময় নেওয়ার জন্য বলে উঠলাম আমি। ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করতে দাও আমাকে।
সজোরে মাথা নাড়ল সেরেনা। বলল, আজ রাতেই!
আচ্ছা আমার মদটুকু তো শেষ করতে দেবে, না কি?
অবশ্যই দেব, মাথা ঝাঁকাল সেরেনা। আগে আমাদের বিয়ে দাও, তারপর।
তো এই পবিত্র বিয়েটা কোথায় হলে ভালো হয় বলে তোমার ধারণা?
আমার বাগানে। সেখানে সকল দেবতারা আমাদের দেখতে পাবেন এবং তাদের আশীর্বাদ দিতে পারবেন।
বেশ, হার মেনে নিলাম আমি। তোমাদেরকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার। সুযোগ পেয়ে আমি সৌভাগ্যবান বোধ করছি!
সুন্দর একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম আমি। এত সুন্দরভাবে গুছিয়ে কথা বললাম যে, আমাদের তিনজনেরই চোখে পানি চলে এলো। এবং যখনই সেই চূড়ান্ত কথাগুলো বললাম, এই মুহূর্ত থেকে সকল দেবতাকে সাক্ষী রেখে তোমাদের স্বামী এবং স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছি, সাথে সাথে মনে হলো যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল দুজন। পরবর্তী দুই দিন ধরে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত যখন আবার আমার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ওরা পরস্পরের হাত ধরে আছে, যদিও এই দুই দিনে ওরা কেবল হাত ধরাধরিই করে ছিল বলে আমার মনে হয় না।
কী? প্রশ্ন করলাম আমি। এবার আশা করি শখ মিটেছে?
এতে এত আনন্দ তা যদি আগে একটু হলেও জানতাম তাহলে রামেসিসের সাথে যেদিন দেখা হলো সেদিনই ওকে বিয়ে করে ফেলতাম আমি, গম্ভীর গলায় জবাব দিল সেরেনা। দশ হাজার বার ধন্যবাদ তোমাকে টাটা। এমন সুখের কথা কোনো দিন কল্পনাও করতে পারিনি আমি।
*
উটেরিক চলে যাওয়ার পর তৃতীয় দিনে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার লুক্সর শহরের হালহকিকত একটু বুঝে দেখা দরকার। রামেসিসকে সাথে নিয়ে আনন্দের বাগানে আশ্রয় নেওয়া লোকদের মধ্য থেকে দশজন দক্ষ লোককে বাছাই করলাম আমি, যাদের ওপর সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা যায়। সবাই মিলে গোপনীয়তা বজায় রাখার শপথ নিলাম আমরা। দরকার হলে মরব; কিন্তু কোনো তথ্য ফাঁস করব না। তারপর আলাদা আলাদাভাবে এগোলাম শহরের প্রবেশপথের দিকে। এবং প্রায় সাথে সাথেই প্রহরীদের মনোভাব দেখে মনে মনে সতর্ক হয়ে উঠলাম আমি। এর আগে কখনো ওদের এত সতর্ক অবস্থায় দেখা যায়নি। তাদের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখে কিছু দূর থেকেই আমি আর রামেসিস ঠিক করলাম, এই অবস্থায় শহরে ঢোকা ঠিক হবে না। তাই পথ বদল করলাম আমরা, শহরের দরজার সামনে জমে থাকা ভিড়ের পাশ দিয়ে অন্য একটা পথ বেছে নিলাম। দেখলাম যারা ভেতরে ঢুকতে চাইছে তাদের সবাইকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তল্লাশি করা হচ্ছে পুরো শরীর।
একটু নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটা দেখতে লাগলাম আমরা। দেখলাম আমাদের এক সঙ্গীকে গ্রেপ্তার করল প্রহরীরা, তারপর অন্যদিকে নিয়ে গেল। সেদিন ময়দানে উটেরিকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মাঝে এই লোকও ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে প্রহরীরা তাকে চিনে ফেলেছে। কিন্তু সেইসাথে এটাও দেখলাম যে, আমাদের আরো দুই সঙ্গী ঠিকই প্রহরীদের নাকের ডগা দিয়ে শহরে ঢুকে পড়ল। তবে সাতপাঁচ ভেবে আর ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না বলেই মনে হলো আমাদের। তাই বাকিদের মধ্যে তখনো যারা শহরে ঢোকার জন্য সারিতে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের ডেকে নিলাম, তারপর আগের মতোই আলাদা আলাদাভাবে ফিরে এলাম আনন্দের বাগানে। সারা দিন কেটে গেল যে দুজন ভেতরে ঢুকেছিল তাদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে। এবং সূর্যাস্তের ঠিক আগে যখন শহরের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়; সেই সময় ফিরে এলো তারা। কিন্তু আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন লোককে ঠিকই হারাতে হলো আমাদের। আর কখনো তাকে দেখতে পাইনি আমরা। আমার ধারণা, পানমাসির লোকেরা তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তারপর খুন করে ফেলেছে। যদি এটাই তার ভাগ্যে ঘটে থাকে তাহলে বলতে হবে যে, নির্যাতন করলেও আমাদের কথা ফাঁস করেনি সে এবং এই গোপন ঘাঁটির ওপর হামলা চালাতেও এগিয়ে আসেনি কেউ।
