এই তথ্যগুলো জানার পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, উটেরিক নিজে তার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে উত্তরে নিয়ে যাচ্ছে নাকি তার কোনো নকল তার হয়ে কাজটা করছে সেটা নিজে নিশ্চিত হতে হবে আমাকে। উটেরিক নিজে যদি তার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে থেকে থাকে তাহলে আগে আমাদের উচিত হবে লুক্সর শহরের দখল নিয়ে নেওয়া। যদিও আনন্দের বাগানে আমাদের সৈন্যসংখ্যা চার শর বেশি হবে না, তবে লুক্সরের সুরক্ষার জন্য উটেরিক খুব বেশি সৈন্য রেখে যাবে না বলেই মনে হয়। আশা করি শহরের বাসিন্দাদের আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। লুক্সর উটেরিক থেকে যখন বিদায় নেবে তখন সেই দৃশ্য দেখার জন্য নিজে উপস্থিত থাকতে চাই আমি এবং সম্পূর্ণ একা। এমনকি রামেসিস বা সেরেনাকেও সঙ্গে নেব না বলে ঠিক করেছি। মধ্যরাতের ঠিক এক ঘণ্টা পর দুর্গের প্রধান দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমি। ইচ্ছে করেই এই সময়টা বেছে নিয়েছি, কারণ এখন সবচেয়ে নীরব থাকে পরিবেশ। প্রহরীদের সাবধান করে দিয়েছি আমার এই বেরিয়ে যাওয়ার খবর যেন কাউকে না জানানো হয়। বাইরে এসে নিশ্চিদ্র অন্ধকারে মিশে গেলাম আমি, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এগিয়ে চললাম লুক্সর শহরের দিকে।
যখন আমার গন্তব্যে পৌঁছলাম তখনো চাঁদ মাথার ওপরে রয়েছে, ভোর হতে আরো কয়েক ঘণ্টা বাকি। উঁচু পাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নীলনদের দিকে তাকালাম। মশালের আলোয় প্রায় দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে বন্দর। ভারী বোঝা মাথায় নিয়ে ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করছে মজুরের দল, জাহাজের খোলে বোঝাই করছে রসদ। প্রতিটি জাহাজের খোল ভরে যাওয়ার সাথে সাথে ঘাট থেকে সরে যাচ্ছে সেটা, তারপর নদীর ভাটি ধরে অন্ধকারে এগিয়ে যাচ্ছে আবু নাসকোস শহরের দিকে।
একসময় আকাশের রং হালকা হয়ে এলো, পুব দিগন্তের ওপাশে উঁকি দিল সূর্য। প্রায় একই সময়ে ছোট্ট এক দল ঘোড়সওয়ার প্রবেশ করল বন্দরের প্রবেশপথ দিয়ে, তারপর একটা জাহাজের পাশে গিয়ে থামল। ঘোড়া থেকে নেমে দলবেঁধে জাহাজের প্রধান ডেকে উঠল আরোহীরা। সবার পরনে একই ধরনের পোশাক, যেটা উটেরিকের সিংহাসনে বসার পর থেকে অভিজাত শ্রেণির মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এবং এই পোশাকের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চওড়া কানাওয়ালা টুপি, যেটা পরিধানকারী ব্যক্তির চেহারাকে ঢেকে রাখে। অশ্বারোহীরা জাহাজে উঠতেই নাবিকরা ছেড়ে দিল জাহাজ। জাহাজটা স্রোতে ভেসে এগিয়ে চলেছে, এই সময় এক যাত্রী তার মাথার টুপিটা খুলে ফেলল, তারপর ঝুঁকে এসে পাশের এক পুরুষ সঙ্গীর ঠোঁটে চুমু খেলো। আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে টুপিটা মাথায় পরছে সে, এই সময় তার চেহারার এক ঝলক দেখার সুযোগ হলো আমার। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি। কোনো ভুল নেই, ওই লোকটাই উটেরিক। এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করার ফল অবশেষে মিলে গেছে।
দ্রুত আনন্দের বাগানের ফিরে এলাম আমি, তারপর আলোচনা সভা ডেকে আমাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে বসলাম। রাজা হুরোতাসের আক্রমণ থেকে নিজের উত্তরের রাজধানীকে রক্ষা করতে লুক্সর ছেড়ে ছুটে গেছে উটেরিক এবং এই সুযোগটা কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেটা এখন ঠিক করতে হবে আমাদের।
এই আলোচনায় সমস্ত দিনের প্রায় পুরো সময়টাই ব্যয় হয়ে গেল আমাদের। শেষ পর্যন্ত আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আরো পাঁচ দিন অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়ের মাঝে উত্তরে অনেক দূরে এগিয়ে যাবে উটেরিক। কেবল তার পরেই লুক্সরে তার রেখে যাওয়া সৈন্যদের ওপর হামলা চালাব আমরা। এখন এটা নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই যে, তাদের সংখ্যা কত। একে তো সেনাপতি হিসেবে উটেরিক একেবারেই অনভিজ্ঞ, তার ওপর সে এটাও জানে যে আনন্দের বাগানে কত শক্ত এক ঘাঁটি গড়ে তুলেছি আমরা। যাদের সে মৃত্যুদণ্ড দিতে এখানে পাঠিয়েছিল তারাই এখন আমাদের সাহায্য করছে। এখন লুক্সরে খুব বেশি সৈন্য না থাকাই স্বাভাবিক। সোজা কথায় এখন আমাদের জানতে হবে যে ওই সৈন্যদের সংখ্যা কত এবং তাদের নেতৃত্বে কাকে রেখে গেছে উটেরিক।
এই সময়ের মাঝে আমরা আরো একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের মধ্যে যারা লুক্সরে বেশ প্রভাবশালী এবং পরিচিত ছিল তারা গোপনে শহরে প্রবেশ করবে এবং আমাদের পক্ষে কাজ করার সম্ভাবনা আছে এমন নাগরিকদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করবে। যদিও এখানে যারা আছে তাদেরকে সবাই ডুগ এবং তার চ্যালাদের হাতে মৃত বলেই জানে; কিন্তু তবু এই ঝুঁকিটা নিতে হবে তাদের। শহরের সুনাগরিকদের আমাদের ইচ্ছের কথা জানাবে তারা এবং উটেরিকের বদলে রামেসিসকে মিশরের ফারাও হিসেবে অধিষ্ঠিত করার ব্যাপারে তাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে।
এমনিতেই এই সব দুশ্চিন্তা আর আসন্ন যুদ্ধের পরিকল্পনায় আমার মাথা ভার হয়ে ছিল, তার ওপর সেদিন বিকেলেই আরো এক আজব ঘটনা ঘটল। মাথাটা একটু ঠাণ্ডা করার জন্য সবে একটা লাল মদের পাত্রের মুখ খুলেছি আমি, এই সময় দুর্গের দক্ষিণ প্রান্তে আমার কামরায় হঠাৎ করেই হাজির হলো রামেসিস আর সেরেনা। দুজনের আচরণেই এমন কিছু একটা ছিল যে, সাথে সাথে সতর্ক হয়ে উঠলাম আমি। প্রথমত সাধারণত যা করে সেভাবে সরাসরি আমার কামরায় ঢুকে পড়ার বদলে আস্তে আস্তে দরজায় টোকা দিয়ে তারপর ভেতরে ঢুকল তারা। দেখলাম হাত ধরাধরি করে আছে দুজন; কিন্তু কেউই আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না। তারপর আবার জানতে চাইল যে তারা আমাকে কোনোভাবে বিরক্ত করছে কি না। আমি যখন বললাম যে আমার বিরক্তি উদ্রেকের মতো কোনো কারণ ঘটেনি তখন হঠাৎ চুপ হয়ে গেল দুজন। শেষ পর্যন্ত আমিই নীরবতা ভঙ্গ করলাম এবং দুই পেয়ালা মদ তুলে দিলাম দুজনের হাতে; যদিও এটাই আমার শেষ বোতল ছিল। কৃতজ্ঞচিত্তে পেয়ালা দুটো গ্রহণ করল দুজন। তারপর আবার নীরবে গভীর মনোযোগর সাথে চুমুক দিতে লাগল তাতে, কেউ কোনো কথা বলছে না।
