আমার কাছেই একটু আড়ালে অপেক্ষা করছিল সেরেনা। এবার আমার ইশারা পেয়ে বের হয়ে এলো ও। সদ্য মুক্তির স্বাদ পাওয়া বন্দিরা সবাই কৌতূহলী চোখে তাকাল ওর দিকে এবং খুব দ্রুতই তাদের কৌতূহল বদলে গেল বজ্রাহত বিস্ময়ে। সেরেনাকে আমি বলেছিলাম যতটা সম্ভব সুন্দর চেহারা নিয়ে সবার সামনে আসতে। কিন্তু এমনকি আমিও আশা করিনি যে আমার এই কথার কারণে এত বেড়ে যাবে ওর সৌন্দর্য।
ওর মা তেহুতির পাঠানো পোশাকগুলোর মাঝে সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটা পরেছে সেরেনা। কাপড়টার রং অপার্থিব রকমের সবুজ এবং ওর নড়াচড়ার সাথে সাথে আলো খেলা করছে তাতে। ফলে তার রং বদলে যাচ্ছে, সেখানে দেখা দিচ্ছে রংধনুর সাত রঙের বাকিগুলো। পোশাকের নিচে সেরেনার দেহের শ্বাসরুদ্ধকর বাঁকগুলোও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে তখন। বাহুগুলো নগ্ন, ত্বকের কোথাও একটুও দাগ নেই। লম্বা অভিজাত ঘাড়ের ওপর বসানো মুখটা গর্বিত অভিজাত এবং মনোহর। যেকোনো মূল্যবান পান্নার চাইতেও গাঢ় সবুজ রং ওর চোখে, যে কেউ তাকানোর সাথে সাথে সম্মোহিত হয়ে পড়বে।
সেরেনার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি, তারপর ওর হাতটা আমার হাতে নিয়ে চলে এলাম রামেসিসের কাছে। সেখানে হবু স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিল রামেসিস। আমার পাশে হাঁটতে হাঁটতে যেন চাঁদের মতো ঝিলিক দিতে লাগল সেরেনা, ওর মুখের মনোলোভা হাসিতে যেন আরো একবার সম্মোহিত হয়ে পড়ল দর্শকরা। রামেসিস হাত বাড়িয়ে দিল ওকে স্বাগত জানাতে। এবার আবার আমাদের অতিথিদের দিকে ফিরে কথা বলতে শুরু করলাম আমি।
আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনাদের জানাচ্ছি যে, এই হচ্ছে রাজা হুরোতাস এবং তার স্ত্রী রানি তেহুতির একমাত্র কন্যা। ল্যাসিডিমনের রাজকুমারী সে, নাম সেরেনা। আমাদের ফারাও রামেসিসের সাথে বাগদান হয়ে আছে তার। ভণ্ড ফারাও উটেরিকের হাতে বন্দি হয়ে ছিল সে, যেখান থেকে তাকে উদ্ধার করেছে রামেসিস। সেই হতে যাচ্ছে আপনাদের রানি। উপস্থিত অতিথিগণ, আমি আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি, আপনারা সবাই তাকে সম্মান জানান!
এক এক করে আবার সামনে এগিয়ে এলো সবাই, সেরেনার প্রতি আনুগত্যের শপথ নিল। জবাবে প্রত্যেককে এমন শ্বাসরুদ্ধকর একটা হাসি উপহার দিল সেরেনা, আমি নিশ্চিত যে বাকি জীবনের জন্য সেরেনার অনুগত ভৃত্যে পরিণত হয়ে গেল সবাই। এই ঘটনার মাধ্যমে রামেসিসকে মিশরের সিংহাসনে বসানোর ব্যাপারটা আরো নিশ্চিত করলাম আমি এবং একই সাথে আমাকে তার প্রধানমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের সম্ভাবনাও জোরদার করলাম।
*
নতুন অতিথিদের নিজনিজ কাজ খুঁজে নেয়ার জন্য অবশ্য খুব বেশি সময় দেওয়া হলো না। প্রত্যেকেরই নাম এবং চেহারা আমার পরিচিত, বিশেষ করে যারা আমাদের কাজে আসতে পারে তাদের সবাইকেই খুব ভালোভাবে চিনি আমি। কোনো সময় নষ্ট না করে তাদের অন্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। তারপর প্রত্যেকের জন্য উপযুক্ত কাজ বেছে নিয়ে সেখানে নিয়োগ দিয়ে দিলাম তাদের, যাতে আমাদের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত করা যায়।
আমার প্রথম কাজ হলো তাদের কাছ থেকে উটেরিকের সম্পর্কে যতটা সম্ভব তথ্য জোগাড় করা, যাতে তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরো পোক্ত হয় আমাদের অবস্থান। যেসব তথ্য পাওয়া গেল তার বেশির ভাগই আমার ইতোমধ্যে জানা হয়ে গেছে। তবে এটা জানতে পেরে বেশ অবাক হলাম যে, উটেরিক এখন সফলভাবে নিজেকে এমন এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, যার কতটা বাস্তব আর কতটা কল্পনা তা কেউ বলতে পারে না। অনেকগুলো পরিচয় এবং ছদ্মনাম আছে তার এবং নিজের অনেকগুলো নকল তৈরি করেছে সে। মঞ্চের ওপর তীরের আঘাতে যার মৃত্যু হয়েছিল সেও ওই নকলদের মাঝে একজন। নতুন যারা এসেছে তাদের কাছে জানা গেল জনসমক্ষে যেই উপলক্ষগুলোতে উটেরিককে দেখা যায় সেগুলো বেশির ভাগই তার নকলদের কাজ। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পরিচালনায় উটেরিককে দেখা গেলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে এটা তার নকলদের কেউ। এর ফলে যুদ্ধের সকল বিপদ এড়িয়ে চলতে পারে সে, আবার বিজয়ের গৌরবও ধরা দেয় তার হাতে। আবার পরাজিত হলেও তার লজ্জা পেতে হয় না তাকে। এর অর্থ হচ্ছে, যা ভেবেছিলাম তার চাইতে অনেক কঠিন হবে উটেরিককে পরাজিত করা। আঘাত করার সময় আসল উটেরিককে আঘাত করছি না তার বিকল্প কেউ, তা নিয়ে কখনো নিশ্চিত হতে পারব না।
নতুন অতিথিদের কাছ থেকে আরো জানা গেল যে, হুরোতাস এবং তার মিত্ররা অবশেষে মিশরে পা রেখেছে। ভূমধ্যসাগর হয়ে বিশাল এক নৌবহর নিয়ে এসেছে তারা এবং নীলনদ যেখানে সাগরে পতিত হয়েছে সেখান থেকে মাত্র পঁয়ত্রিশ লিগ দূরে সাজ্জাতু বলে এক জায়গায় প্রায় এক হাজারের মতো রথ মোতায়েন করেছে। এই রথ বাহিনীর দায়িত্বে আছে হুই। নিজের বাহিনী নিয়ে আবু নাসকোস শহরে হামলা করেছে সে। অন্যদিকে জাহাজগুলো নীলনদের মুখগুলো দিয়ে প্রবেশ করেছে ভেতরে, তারপর নদীপথে একই শহরের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। স্থল এবং জল-উভয় দিক দিয়েই হামলার শিকার হয়েছে আবু নাসকোস।
মেফিসের বদলে এখন আবু নাসকোসকে নিজের উত্তরের রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করেছে উটেরিক। খামুদিকে পরাজিত করার জন্য আমি এবং হুরোতাস যে অভিযান পরিচালনা করেছিলাম তাতে মেফিসের নিরাপত্তা প্রাচীর দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আরো চল্লিশ লিগ উত্তরে আবু নাসকোস শহরে নতুন করে এক দুর্ভেদ্য রাজধানী তৈরি করেছে উটেরিক। জায়গাটায় এক প্রাচীন শহর ছিল বহু আগে, এখন কেবল তাদের ধ্বংসস্তূপ রয়ে গেছে। সেই শহরের বাসিন্দাদের সম্পর্কে প্রায় সম্পূর্ণ তথ্য এখন হারিয়ে গেছে। কালের গহ্বরে।
