একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয় কিছু জার্মানিক গোষ্ঠীর (Germanic tribes) হাতে। কিন্তু একথা ভাবলে ভুল হবে যে, এরপর নুমানশিয়া, আরভারনি কিংবা হ্যালভেশিয়ানদের মত অধীনস্থ গোষ্ঠীগুলো রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। এমন গল্প হয়তো পুরাণে পাওয়া যায়। যেমন, ইউনুস নবী (Jonah) অনেকটা সময় মাছের পেটে থাকার পরও অক্ষত অবস্থায় মাছের পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এমন নজির দেখা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই রোমান অধীনস্থ গোষ্ঠীগুলোর কোনটাই আর টিকতে পারেনি। তাদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে যারা যারা নিজেদেরকে তাদের সাম্রাজ্য পূর্ববর্তী গোত্র বা দলের সদস্য বলে পরিচয় দিত, কথা বলতো তাদের নিজেদের ভাষায়, উপাসনা করতো তাদের নিজস্ব দেব-দেবীকে এবং প্রচার করতো নিজেদের গোত্রের বীরত্বগাথা, আজ তাদের চিন্তা, ভাষা, আরাধনা সবই রোমানদের মত, যদিও রোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটেছে অনেককাল আগেই।
অনেকক্ষেত্রেই, সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি আর সাম্রাজ্যের অধীন মানুষগুলোর স্বাধীনতা – ব্যাপার দুটো সমার্থক ছিল না। বরং, একটা সাম্রাজ্যের পতনের পরপরই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য সেখানে আরেকটি সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটত। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এখানকার বর্তমান রাজনৈতিক বলয় কতগুলো পৃথক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ক্ষমতার ভারসাম্য দ্বারা নির্মিত যাদের প্রত্যেকের স্থায়ী বা অস্থায়ী ভৌগোলিক সীমানা আছে। মধ্যপ্রাচ্যের এরকম রাজনৈতিক অবস্থা বিগত কয়েকটি সহস্রাব্দে দেখা যায়নি। শেষ যেবার মধ্যপ্রাচ্য এরকম রাজনৈতিক অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিল সেটা ছিল ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, প্রায় তিন হাজার বছর আগে! খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে নিও-অ্যাসিরিয়ান সাম্রাজ্যের উত্থানের পর থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত সময়টাতে মধ্যপ্রাচ্যকে রিলে রেসের ছড়ির মত এক সাম্রাজ্য থেকে আরেক সাম্রাজ্যের অধীনে যেতে হয়েছে। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স সাম্রাজ্য তাদের শাসনের ছড়িটা যখন ছেড়ে দিল, ততদিনে তাদের পূর্ববর্তী স্বাধীন জাতি আরামানস (Aramaeans), এমোনাইটস (Ammonites), ফিনিশিয়ানস (Phoenicians), ফিলিস্তিন (Philistines), মাবাইট (Moabites) এসবের স্বাধীন অস্তিত্ব আর নেই। অনেক কাল আগেই তারা হারিয়ে গেছে কালের অতল গহ্বরে।
একথা সত্য, আজকের দিনের ইহুদি, আর্মেনিয়ান এবং জর্জিয়ানরা কিছু ন্যায়সঙ্গত যুক্তির সাহায্যে দাবি করেন তারা প্রাচীন মধ্য এশিয়ায় বসবাসকারী মানুষজনের বংশধর। এদের দাবিটুকু নিঃসঙ্গ ব্যতিক্রম হবার কারণে তা সাম্রাজ্যের প্রভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর পৃথক সাংস্কৃতিক পরিচয় অবলুপ্তির দাবিটি জোরালো করে তোলে। অনেকক্ষেত্রে ইহুদি, আর্মেনিয়ান এবং জর্জিয়ানদের দাবিকে অতিরঞ্জিতও মনে হয়। কারণ, একথা স্পষ্ট যে, বর্তমান কালের ইহুদিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক চিন্তা-চেতনা গত দুই সহস্রাব্দ ধরে তাদেরকে অধিকার করা সাম্রাজ্য দ্বারা যতটুকু প্রভাবিত, ইহুদিদের প্রাচীন রাজ্য যিহূদিয়ার (Judaea) রীতি-নীতি দ্বারা ততটুকু প্রভাবিত নয়। যদি ইসরাইলের দ্বিতীয় রাজা ডেভিড আজ কোন ঘোর রক্ষণশীল ইহুদি উপাসনালয়েও উপস্থিত হন, তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করবেন সেখানকার লোকজনের পরনে পূর্ব ইউরোপীয় পোশাক, তারা কথা বলছে জার্মানির একটি আঞ্চলিক ভাষায় (Yiddish) এবং ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে তারা একটি ব্যবলিনীয় ধর্মগ্রন্থের (The Talmud) পাঠোদ্ধার নিয়ে বাক-বিতণ্ডা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাধারণত একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ হত্যা এবং বিজিতদের উপর নির্মম নির্যাতনের দরকার পড়ে। একটি সাম্রাজ্য গঠনের জন্য প্রচলিত উপকরণগুলি হল – যুদ্ধ, দাসপ্রথা, নির্বাসন এবং গণহত্যা। ৮৩ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা যখন স্কটল্যান্ড আক্রমন করে, তখন তারা স্থানীয় ক্যালেডোনিয়ান গোত্রের (Caledonian) কাছ থেকে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় এবং ফলশ্রুতিতে রোমানরা পুরো দেশটাকে শ্মশানে পরিণত করে। রোমানদের শান্তি প্রস্তাবে ক্যালেডোনিয়ান নেতা ক্যালগাকাস (Calgacus) রোমানদের ‘দুনিয়ার সেরা সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন এবং বলেন “লুণ্ঠন, গণহত্যা আর ডাকাতিকে তারা সাম্রাজ্যপ্রতিষ্ঠা নামে অভিহিত করে আর একটি জনপদকে শ্মশানে পরিণত করার নাম দেয় ‘শান্তিস্থাপন’”।২
এসবের মানে এই নয় যে, সাম্রাজ্যের উত্থান মানুষের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেনি। সাম্রাজ্যকে ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে তার সকল উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করা হলে মানবজাতির অধিকাংশ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেই অস্বীকার করতে হয়। সাম্রাজ্যের উঁচু পদে থাকা লোকজন রাজ্য অধিকারের ফলে অর্জিত মুনাফা কেবল সামরিক বাহিনী এবং দুর্গ নির্মাণেই ব্যয় করতেন না, তার একটি অংশের বরাদ্দ হত দর্শন, শিল্প, আইন এবং সেবামূলক কাজে। মানুষের সাংস্কৃতিক অগ্রগতির একটি বড় অংশ তাদের অস্তিত্বের জন্য বিজিত জনগণের শোষণের ফলে পাওয়া সম্পদের কাছে ঋণী। রোমান সাম্রাজ্যের অগ্রগতি এবং অর্জিত মুনাফাই নিশ্চিত করেছিল সিসেরো (Cicero), সেনেকা (Seneca) এবং সেইন্ট অগাস্টিনের (St Augustine) মত মানুষদের চিন্তাভাবনা এবং লেখালেখির জন্য প্রয়োজনীয় অবসর এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধা। মুঘলদের ভারত লুঠ করে জমানো টাকা-কড়ি ছাড়া তাজমহল নির্মাণ সম্ভব হত না। হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্য স্ল্যাভিক, হাঙ্গেরিয়ান ও অন্যান্য রোমান ভাষা-ভাষী অঞ্চলগুলো শাসন করে যে মুনাফা পেত, সেখান থেকেই দেয়া হত সুরকার হেইডেন (Haydn) এর পারিশ্রমিক এবং সঙ্গীতগুরু মোজার্টের ভাতা। কোনও ক্যালেডোনিয়ান লেখক ক্যালগাকাস (Calgacus) এর বক্তৃতাকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ করে যাননি। ক্যালগ্যাকাসের বক্তৃতার ব্যাপারে আমরা জানতে পারি রোমান ঐতিহাসিক ট্যাসিটাসের (Tacitus) বয়ান থেকে এবং সম্ভবত, বক্তৃতাটি ট্যাসিটাসের নিজেরই বানানো। বেশিরভাগ ঐতিহাসিক ইদানীং এ ব্যাপারে একমত হন যে, ট্যাসিটাস কেবল ক্যালগ্যাকাসের বক্তৃতাটিই বানাননি, সমরনায়ক ক্যালগাকাসের চরিত্রটিই তার কল্পনাপ্রসূত। তিনি ক্যালগাকাস চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন নিজের দেশ সম্পর্কে তার নিজের এবং উঁচু শ্রেণীর রোমানদের যে ধারণা সেটি তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেবার জন্য।
