এমনকি যদি আমরা ধনীদের সংস্কৃতি এবং উচ্চ মার্গের শিল্পকলা থেকে চোখ ফিরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের দিকেও তাকাই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আধুনিককালের মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির মাঝে পাওয়া যাবে সাম্রাজ্যের প্রভাব। আজকের দিনে আমরা প্রায় সবাই কথা বলি নানা সাম্রাজ্যের মূল ভাষায়, যেসব ভাষা আমাদের পূর্বপুরুষদের উপর পেশীশক্তির প্রভাবে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ মানুষ হ্যান (Han) সাম্রাজ্যের ভাষায় কথা বলে, স্বপ্ন দেখে। বংশপরিচয় যাই হোক, আলাস্কার ব্যারো উপদ্বীপ থেকে শুরু করে ম্যাগেলান প্রণালী পর্যন্ত, আমেরিকার দুই মহাদেশের সবাই স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ফরাসি এবং ইংরেজি এই চারটি সাম্রাজ্যভাষার কোনো একটি ব্যবহার করে। আজকের মিশরের অধিবাসীরা আরবী ভাষায় কথা বলে, নিজেদের আরব ভাবতে এবং আরব সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। অথচ এই আরবরাই সপ্তম দশকে মিশর দখল করেছিল এবং তাদের আইনের পরিপন্থী যে কোন মিশরীয় বিদ্রোহকে শক্ত হাতে দমন করেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু গোত্রের প্রায় এক কোটি মানুষ আজও তাদের উনিশ শতকের গৌরবময় দিনের স্মৃতিচারণ করে, অথচ তাদের অধিকাংশই সেই সব মানুষের বংশধর, যারা জুলু সাম্রাজ্যবিস্তার রুখতে একদিন প্রাণপণে লড়াই করেছিল।
যা কিছু হচ্ছে, ভালোর জন্যই হচ্ছে
প্রথম যে সাম্রাজ্যের ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে জানা যায় তা হল সম্রাট সারগন এর আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্য (সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ২,২৫০ অব্দ)। সারগন মেসোপটেমিয়ার একটি ছোট্ট নগর রাষ্ট্র কিশ (Kish) এর রাজা হিসেবে তার পেশাগত জীবন শুরু করেন। কয়েক দশকের মধ্যে তিনি মেসোপটেমিয়ার অন্যান্য নগর রাষ্ট্র এবং মেসোপটেমিয়ার বাইরের অনেক বড় বড় ভূখণ্ড জয় করেন। সারগন গর্বভরে বলতেন, তিনি সমগ্র পৃথিবী জয় করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তার রাজত্ব ছিল পারস্য উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অর্থাৎ আজকের ইরাক ও সিরিয়ার বেশিরভাগ অংশ এবং ইরান ও তুরস্কের সামান্য কিছু অংশ জুড়ে ছিল তার সাম্রাজ্যের বিস্তার।
সারগনের মৃত্যুর পর আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্য আর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কিন্তু, সারগন রেখে গেছেন এমন কিছু সাম্রাজ্যবাদী দীপশিখা যা রয়ে গেছে আপন মহিমায় ভাস্বর। পরবর্তী ১,৭০০ বছর জুড়ে অ্যাসিরিয়ান, ব্যাবিলনিয়ান এবং হিট্টি রাজাদের জন্য সারগণ ছিলেন অনুকরণীয় আদর্শ, তারাও গর্বভরে বলতেন, তারা সমগ্র পৃথিবী জয় করেছেন। এরপর, খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে, পারস্যের সাইরাস দি গ্রেট এর চেয়েও বড় দম্ভোক্তি নিয়ে হাজির হলেন ইতিহাসের মঞ্চে।

অ্যাসিরিয়ার রাজা কিন্তু সবসময় নিজেকে অ্যাসিরিয়ার রাজাই মনে করতেন। এমনকি যখন তিনি নিজেকে পুরো পৃথিবীর শাসক দাবি করেন, তখনও একটা ব্যাপার সবার কাছে স্পষ্ট ছিল যে, এসব কিছুই করা হচ্ছে অ্যাসিরিয়ার গৌরব বৃদ্ধির জন্য এবং সে কারণে রাজ্য দখল করা, জয় করা এসব নিয়ে অ্যাসিরীয়দের মাঝে কোন অনুশোচনা ছিল না। অন্যদিকে সাইরাস পুরো পৃথিবী শাসন করার দাবি করেই ক্ষান্ত হলেন না, বরং বিজিতদের তিনি বললেন, এসব কিছুই তিনি করছেন সব মানুষের জন্য। পারসিয়ানরা বলল- ‘আমরা তোমাদের কল্যাণের জন্যই তোমাদেরকে অধিকার করছি’। সাইরাস চাইতেন বিজিত লোকেরা তাকে ভালবাসুক এবং পারসিয়ান সাম্রাজ্যের অংশ হবার জন্য তারা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করুক। পরাজিত রাজ্যের মানুষদের অনুমোদন পাওয়ার জন্য সাইরাসের সৃষ্টিশীল উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল তার একটি আদেশ। এই আদেশে তিনি বলেন, নির্বাসিত ইহুদিরা চাইলে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে এসে সেখানে তাদের উপাসনালয় নির্মাণ করতে পারবে। এমনকি তিনি নির্বাসিতদের অর্থনৈতিক সহযোগিতারও আশ্বাস দেন। সাইরাস নিজেকে ইহুদিদের অধিকার করা একজন পারসিয়ান রাজা হিসেবে ভাবেননি- বরং তিনি নিজেকে ইহুদিদের রাজাও ভাবতেন এবং সে কারণে তাদের ভালোমন্দের দেখভাল করাকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন।
পৃথিবীর সমস্ত মানুষের কল্যাণের জন্য সমস্ত পৃথিবী অধিকার করার ধারণাটা ছিল চমকপ্রদ। বিবর্তন অন্য সব স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মত মানুষকেও জেনোফোবিক (xenophobic, যারা অন্য দেশের মানুষজনকে অপছন্দ করে বা ভয় পায়) হিসেবে গড়ে তুলেছে। সেপিয়েন্স তার সহজাত জৈবিক প্রবৃত্তি থেকেই সমগ্র মানবজাতিকে সবসময় দুটি ভাগে ভাগ করে – ‘আমরা’ এবং ‘তারা’। ‘আমরা’ হল আপনার এবং আমার মত লোকজন যারা একই ভাষায় কথা বলে এবং একই ধর্ম ও রীতিনীতি অনুসরণ করে। ‘আমরা’ একে অপরের ভালো-মন্দের ভাগ নিতে রাজি, কিন্তু ‘তাদের’ ভালো-মন্দের ভাগ নিতে রাজি নই। ‘আমরা’ সবসময়ই ‘তাদের’ থেকে আলাদা ছিলাম এবং ‘তাদের’ কাছে ‘আমাদের’ কোন ঋণ বা ‘তাদের’ প্রতি ‘আমাদের’ কোন দায়-দায়িত্ব নেই। ‘আমরা’ ‘তাদের’ কাউকে ‘আমাদের’ এলাকায় দেখতে চাই না এবং ভুলবশত ‘তারা’ ‘আমাদের’ এলাকায় ঢুকে পড়লে যা কিছু ঘটবে সেসব নিয়ে ‘আমাদের’ এতটুকু মাথাব্যথা নেই। ‘তারা’ আসলে মানুষের পর্যায়েই পড়ে না। সুদানের ‘ডিনকা’ (Dinka) নামক জনগোষ্ঠীর ভাষায় ‘ডিনকা’ শব্দের অর্থ ‘জনগণ বা মানুষ’। সুতরাং, যারা ‘ডিনকা’ নয়, তারা মানুষই নয়। ডিনকাদের ঘোর শত্রু হল ‘নুয়ের’ (Nuer) জনগোষ্ঠী। নুয়েরদের ভাষায় ‘নুয়ের’ কী অর্থ বহন করে? তাদের ভাষায় ‘নুয়ের’ শব্দের অর্থ ‘আসল মানুষ’। সুদান মরুভূমি থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আলাস্কা এবং উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়ার বরফঢাকা অঞ্চলে ইউপিকদের (Yupik) বাস। ইউপিকদের ভাষায় ‘ইউপিক’ শব্দের অর্থ কী? যা ভাবছেন ঠিক তাই, এর অর্থও ‘আসল মানুষ’!৩