দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা নির্দিষ্ট নয় এবং তা যত খুশি বিস্তৃত হতে পারে। একটি সাম্রাজ্য নতুন নতুন জাতি এবং রাজ্যকে তাদের অধীনে আনতে পারে নিজের মূল কাঠামো বা জাতিসত্তার পরিবর্তন না ঘটিয়েই। আজকের ব্রিটিশ রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানাটা নির্দিষ্ট। এই ভৌগোলিক সীমানাটা এতটুকু বাড়াতে চাইলেও সেটা ব্রিটিশ রাষ্ট্রকাঠামো বা জাতিসত্তার কোন মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব হবে না। অথচ, একশ বছর আগেও পৃথিবীর যে কোন স্থানই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হতে পারত।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ভৌগলিক সীমারেখার নমনীয়তা সাম্রাজ্যকে শুধু একটা নতুন আঙ্গিক দেয় তা নয়, বরং এ দুটি বৈশিষ্ট্যই ইতিহাসে সাম্রাজ্যের মূল ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দেয়। এই দু’টো বৈশিষ্ট্যের কারণে সাম্রাজ্য বিভিন্ন জাতি-বর্ণ-আবহাওয়া-জলবায়ুর মানুষকে একই রাজনৈতিক ছাতার নিচে আনতে পারে এবং পৃথিবীর বৃহৎ থেকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ক্রমাগত: একত্রিত করার প্রক্রিয়ার সূচনা করে।
এখানে যে ব্যাপারটা গুরুত্বের সাথে বলা দরকার তা হল, একটি সাম্রাজ্যের পরিচয় কেবল তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং নমনীয় ভৌগোলিক সীমানা দ্বারাই নির্ধারিত হয়ে থাকে। উৎপত্তিস্থল, শাসন কাঠামো, ভৌগোলিক বিস্তৃতি বা জনসংখ্যা সাম্রাজ্যের পরিচয় নির্ধারণ করে না। একটা সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়ের জন্য সামরিক অভিযানও অপরিহার্য নয়। এথেন্স সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল একটি স্বেচ্ছাসেবক দল হিসেবে, হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের উৎপত্তি হয়েছিল বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে, বিয়ের মাধ্যমে অনেকগুলো পরিবারকে জোড়া দিয়েই তৈরি হয়েছিল এই সাম্রাজ্যের ভিত। সাম্রাজ্যের জন্য একজন সম্রাটের শাসন থাকারও বাধ্যবাধকতা নেই। এ পর্যন্ত মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসন পদ্ধতি ছিল গণতান্ত্রিক। অন্যান্য গণতান্ত্রিক (বা নিদেনপক্ষে প্রজাতান্ত্রিক) সাম্রাজ্যগুলোর মাঝে আছে আধুনিক ওলন্দাজ, ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং আমেরিকার সাম্রাজ্য এবং প্রাক-আধুনিক যুগের নভগোর্যাড, রোম, কার্থেজ এবং এথেন্স।
সাম্রাজ্যের জন্য আয়তন বা জনসংখ্যাও তেমন কোন জরুরি বিষয় নয়। খুব ছোট আয়তনের সাম্রাজ্যের অস্তিত্বও ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায়। এথেন্স সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে আয়তন ও জনসংখ্যায় এথেন্স ছিল আজকের গ্রিসের তুলনায় অনেক ছোট। আজকের দিনের মেক্সিকোর থেকে অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল অনেক কম। তা সত্ত্বেও এথেন্স এবং অ্যাজটেক ছিল সাম্রাজ্য, কিন্তু আজকের গ্রীস বা মেক্সিকো সাম্রাজ্য নয়। কারণ, এথেন্স এবং অ্যাজটেক শাসন করত কয়েক ডজন থেকে শুরু করে কয়েকশ ভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোকে, একালের গ্রিস বা মেক্সিকো যেটা করে না। এথেন্স কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিল একশরও বেশি স্বাধীন নগররাষ্ট্রের উপর, অন্যদিকে অ্যাজটেক, তার খাজনার দলিল অনুযায়ী, শাসন করেছিল তিনশ একাত্তরটি ভিন্ন গোত্রের মানুষকে।১
এত সব ভিন্ন গোত্র, দল এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষকে কী করে একালে একটি অাধুনিক রাষ্ট্রের সীমানার ভেতর আনা সম্ভব হলো? এটা সম্ভব হয়েছে কারণ অতীতকালে পৃথিবীতে যে ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক পরিচয়ের মানুষের বসবাস ছিল, তাদের প্রত্যেকের দলের সদস্য সংখ্যা ছিল অল্প এবং তাদের অধিকৃত ভূমির পরিমাণও ছিল আজকের দিনের মানুষের তুলনায় কম। ভূমধ্যসাগর এবং জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী যে ভূমি নিয়ে আজ মূলত দুজন মানুষের অহংকারের লড়াই চলছে, সে সময় এই ভূমিতেই ঠাঁই হত কয়েক ডজন জাতি, গোত্র, ছোট রাজ্য এবং নগর রাষ্ট্রের।
মানুষের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আকস্মিকভাবে হ্রাস পাওয়ার একটা প্রধান কারণ সাম্রাজ্যের উত্থান। সাম্রাজ্যবাদী শাসনের স্টিমরোলার মানুষের নানারকম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যেকে পিষে ফেলে সবাইকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে সাম্রাজ্যবাদী রীতিনীতির ছাঁচে (উদাহরণস্বরূপ নুমানশিয়ানদের কথা স্মরণ করা যেতে পারে) এবং তৈরি করেছে অনেক বড় আকারের মানব সংগঠন।
সাম্রাজ্য কি তবে শয়তান?
আধুনিককালে রাজনীতিতে নেতিবাচক শব্দগুলির মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা বা ফ্যাসিজমের পরই সাম্রাজ্যবাদকে স্থান দেয়া হয়। সমালোচকেরা সাম্রাজ্যবাদের যেসব নেতিবাচক দিকের কথা বলেন সেগুলোকে মোটামুটি দু’টো শ্রেণীতে ভাগ করা যায়-
প্রথমত, সাম্রাজ্যবাদ একটি অকার্যকর প্রক্রিয়া। সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়ায় জয় করা বিপুল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদে সুষ্ঠুভাবে শাসন করা সম্ভবপর হয় না।
দ্বিতীয়ত, যদি সেটা কোনভাবে সম্ভবও হয়, তারপরও সাম্রাজ্যবাদকে বর্জন করা উচিত। কারণ, সাম্রাজ্যবাদ হল ধ্বংস আর শোষণের হাতিয়ার। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজেদের সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আছে এবং তাদেরকে কোনোভাবেই অন্যের শাসনের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা উচিত নয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, প্রথম দাবিটি একেবারেই অচল এবং দ্বিতীয়টি নানাবিধ দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ।
বাস্তবতা হল, গত আড়াই হাজার বছর ধরে দুনিয়া জুড়ে সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে বেশি প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠন। এই আড়াই হাজার বছর ধরে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করেছে। সাম্রাজ্যের সরকারব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ব্যাপারটিও প্রশ্নাতীত। বেশিরভাগ সাম্রাজ্যই খুব সহজে তার বিদ্রোহীদেরকে দমন করতে পেরেছে। মোটাদাগে বলতে গেলে, বেশিরভাগ সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে প্রধানত বহিঃশত্রুর আক্রমণে অথবা তারা বিভক্ত হয়েছে শাসকদের মতবিরোধের কারণে। অপরদিকে, সাম্রাজ্যের বিজিত জনগণ সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের কাছ থেকে তাদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে এমন নজির তেমন একটা চোখে পড়ে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা শত শত বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। কালক্রমে, তারা হয়ে পড়েছে বিজয়ী সাম্রাজ্যের অংশ, ধীরে ধীরে মুছে গেছে তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি আর পরিচয়।
