১৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমানদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তাদের উচ্চতম রাষ্ট্রীয় পরিষদ নুমানশিয়ানদের শায়েস্তা করার জন্য সিপিও এমিলিনাসকে (Scipio Aemilianus) মনোনীত করলেন । সিপিও ছিলেন রোমের সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং তার নেতৃত্বেই রোমানরা কার্থেজ নগরকে গুড়িয়ে দিয়েছিল। এই কাজের জন্য নিয়োগ করা হল ত্রিশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী। সিপিও নুমানশিয়ানদের লড়াকু মনোভাব এবং সমরকৌশলকে সম্মান করতেন, তাই নিজেদের সৈন্যদের অযথা প্রাণহানি এড়ানোর জন্য তিনি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে নিজেদের বিরত রাখলেন। এর পরিবর্তে তিনি নিলেন এক অভিনব রণকৌশল। তিনি নুমানশিয়ার চারপাশে বৃত্তাকার দুর্গ নির্মাণ করে নুমানশিয়া শহরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেললেন এবং বাইরের দুনিয়ার সাথে নুমানশিয়ার যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। ক্ষুধাই রোমানদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে কাজ করল। একবছরের একটু বেশি সময় পর নুমানশিয়ানের খাবারের যোগান নি:শেষ হয়ে এল। নুমানশিয়ানরা যখন বুঝতে পারল তাদের বাঁচার আর কোন আশা নেই, তারা নিজেরাই তাদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল এবং রোমান ঐতিহাসিকদের মতে, নুমানশিয়ানদের বেশিরভাগই নিজেদেরকে রোমানদের দাস হওয়া থেকে বাঁচাতে আত্মহত্যা করেছিল।
পরবর্তীকালে, নুমানশিয়া স্প্যানিশদের কাছে স্বাধীনতা এবং মনোবলের প্রতীক হয়ে ওঠে। ডন কুইক্সোট উপন্যাসের লেখক মিগুয়েল ডি সারভানতেস ‘নুমানশিয়া অবরোধ’ (The siege of Numantia) নামে একটি ট্র্যাজেডি লেখেন। এই ট্র্যাজেডির ইতি ঘটে নুমানশিয়া নগর ধ্বংসের ঘটনার মধ্য দিয়ে, কিন্তু তার সাথে যুক্ত হয় স্পেনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশাবাদ। নুমানশিয়ার স্বাধীনতাকামী লড়াকু সৈন্যদের জন্য কবি রচনা করেন বিজয়গাথা, নুমানশিয়া অবরোধের চিত্র শিল্পীর তুলির আঁচড়ে রাজকীয় মহিমায় ফুটে ওঠে ক্যানভাসে। ১৮৮২ সালে নুমানশিয়ার ধ্বংসাবশেষকে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভের মর্যাদা দেয়া হয় এবং তা হয়ে ওঠে দেশপ্রেমিক স্প্যানিশদের জন্য এক তীর্থক্ষেত্র। ১৯৫০ এবং ১৯৬০ এর দশকের বিখ্যাত স্প্যানিশ কমিকগুলোর মূল চরিত্র সুপারম্যান বা স্পাইডারম্যান ছিল না, ছিল এল হাবাতো (El Jabato), এক কাল্পনিক আইবেরিয়ান, যিনি রোমানদের দমন পীড়নের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। সেকালের নুমানশিয়ানরা আজ স্পেনের বীরত্ব আর দেশপ্রেমের প্রতীক আর তরুণ স্প্যানিশদের অনুকরণীয় আদর্শের নাম।
এতকিছুর পরেও, স্পেনের মানুষজন স্প্যানিশ ভাষাতেই নুমানশিয়ানদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। এটি একটা রোমান ভাষা এবং এই ভাষার উৎপত্তি হয়েছে সমরনায়ক সিপিও এর ল্যাটিন ভাষা থেকে। নুমানশিয়ানরা নিজেরা কথা বলত এক ধরনের সেল্টিক ভাষায় যা আজ বিলুপ্ত এবং মৃত। সারভানতেস তার ‘নুমানশিয়া অবরোধ’ ট্রাজেডি লিখেছেন ল্যাটিন লিপিতে এবং নাটকটিতে গ্রিস ও রোমের শিল্পভাষার ছাপ স্পষ্ট। নুমানশিয়ায় কোন নাট্যশালা ছিল না। নুমানশিয়ানদের বীরত্বে মুগ্ধ স্প্যানিশ দেশপ্রেমিকরাও রোমান ক্যাথলিক চার্চের অন্ধ অনুসারী। খেয়াল করার বিষয় হল, ‘রোমান ক্যাথলিক চার্চ’ বলতে এমন ক্যাথলিক চার্চ বোঝানো হচ্ছে যার নেতারা এখনও রোমেই থাকেন এবং যাদের ঈশ্বর চান তাকে ল্যাটিন নামে ডাকা হোক। একই ভাবে, আধুনিক স্পেনের আইন-কানুন উদ্ভূত হয়েছে রোমানদের আইন-কানুন থেকে, স্প্যানিশ রাজনীতির ভিত্তি হল রোমান রাজনীতি, তাদের খাবার দাবার এবং স্থাপত্যবিদ্যা যতটা না আইবেরিয়ায় সেল্টদের কাছে ঋণী, তার চেয়ে অনেক বেশি ঋণী রোমান সাম্রাজ্যের কাছে। নুমানশিয়ার ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই। এমনকি নুমানশিয়ানদের এই ইতিহাসটুকুও জানা গেছে রোমান ঐতিহাসিকদের লেখা থেকেই। স্বাভাবিকভাবেই, এই ইতিহাস লেখা হয়েছে রোমান পাঠকদের রুচির জন্য উপযোগী করে এবং এতে নুমানশিয়ানদের কাহিনীতে রঙ চড়িয়ে তাদের স্বাধীনতাকামী বর্বর হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নুমানশিয়ানদের সাথে রোমের বিজয় এতটাই সর্বগ্রাসী ছিল যে, তারা পরাজিত শক্তির ইতিহাসও নিজের মত করে তৈরি করে নিতে পেরেছে।
এ ধরনের গল্প পাঠকপ্রিয়তা পায় না। আমরা সাধারণত দুর্বলের জয় দেখতে পছন্দ করি। কিন্তু, ইতিহাস ন্যায়বিচারের ধার ধারে না। অতীতের অধিকাংশ সংস্কৃতিই কখনও না কখনও কোনও না কোনও নির্দয় সাম্রাজ্যের শিকারে পরিণত হয়েছে এবং হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। সাম্রাজ্যের নিজের পতনও অবশ্যম্ভাবী কিন্তু একটি সাম্রাজ্য তার অস্তিত্বের স্থায়ী ছাপ রেখে যায় পরবর্তী সময়ের কাছে। আজকের একবিংশ শতকের প্রায় সব মানুষ কোন না কোন সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী।
কাকে বলে সাম্রাজ্য?
সাম্রাজ্য হল এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো যার দুটো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। প্রথমত, সাম্রাজ্যের খেতাব পাবার জন্য আপনাকে এমন কিছু মানুষকে শাসন করতে হবে যাদের সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক পরিচয় আলাদা। প্রশ্ন হতে পারে, এরকম কত ধরনের ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক পরিচয়ের মানুষ শাসন করলে তাকে সাম্রাজ্য বলা যাবে? দুই বা তিন রকম ভিন্নতা সাম্রাজ্যের জন্য যথেষ্ট নয়। আবার বিশ বা ত্রিশ ধরনের ভিন্নতা প্রয়োজনের অতিরিক্ত। সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার পরিমাণ হওয়া উচিত এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোন সংখ্যা।
