মূল্যবান ধাতুগুলোর নির্দিষ্ট ওজনকে মানদণ্ড ধরে লেনদেন করতে করতে একসময় মানুষ ধাতব পয়সা আবিষ্কার করে ফেলে। খ্রিস্টপূর্ব ৬৪০ সালের দিকে ইতিহাসের প্রথম পয়সা তৈরি হয় পশ্চিম আনাতোলিয়ায়, লিডিয়ার রাজা আলিয়াতেসের (King Alyattes of Lydia) রাজত্বে। একটা সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা বা রূপা দিয়ে এক একটা পয়সা তৈরি হতো। পয়সাগুলোর উপরে খোদাই করা থাকত কোনো একটা চিহ্ন। এই চিহ্ন দিয়ে দুটো কাজ হতো। এক, পয়সার মূল্যমান বোঝা যেতো, আর দুই, পয়সাটা যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে সেটা নিশ্চিত হতো। আজকের পৃথিবীতে চালু থাকা প্রায় সব পয়সাই সেই একই নীতিতে তৈরি।
ধাতবখণ্ডের চেয়ে ধাতব পয়সা ব্যবহার করা দুটো কারণে বেশি সুবিধাজনক। প্রথমত, ধাতুখণ্ড দিয়ে বেচাকেনা করতে গেলে প্রতিবার সেটার ওজন মাপতে হতো, আর দ্বিতীয়ত, খালি ওজন মাপলেই নিশ্চিত হওয়া যেত না। যে রূপার টুকরোগুলো গ্রহণ করবে সে কীভাবে জানবে যে ওগুলো আসল রূপা, রূপার প্রলেপ দেওয়া সীসা নয়? পয়সা ব্যবহার করলে দুটো সমস্যাই দূর হয়। পয়সার উপরের চিহ্নটাই নিশ্চিত করে যে ওটার ওজন ঠিক আছে, দাঁড়িপাল্লায় না মেপেই ওগুলো গ্রহণ করা যায়। আর তার চেয়েও বড় কথা হলো ওই চিহ্ন দেখেই বোঝা যায় যে পয়সাগুলো বানিয়েছে কোনো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ।
যুগে যুগে পয়সার ওজন, আকার ও চিহ্ন নানাভাবে বদলেছে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত নীতি একই আছে। পয়সার উপরের চিহ্নটা হলো রাজার বাণীঃ “আমি, মহান সম্রাট, নিশ্চিত করছি যে এই পয়সাটায় ঠিক পাঁচ গ্রাম সোনা আছে। কেউ যদি এই পয়সা জাল করার দুঃসাহস দেখায়, অর্থাৎ আমার স্বাক্ষর নকল করে, সেটা হবে আমার মর্যাদার উপর চরম আঘাত, আর সে অপরাধের জন্য সে পাবে চরমতম শাস্তি।”। এজন্যই টাকা জাল করাকে শুধু লোক ঠকানো নয়, তার চেয়েও বড় মাপের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। টাকা জাল করার অর্থ হলো সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন, স্বয়ং রাজার ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ। এ ধরনের অপরাধে সাধারণত শাস্তি হতো নির্যাতন ও মৃত্যু। মানুষ যতদিন রাজা ও তার রাজত্বে বিশ্বাস করবে, ততদিন ওই রাজার নামাঙ্কিত মুদ্রাকেও বিশ্বাস করবে। রোমান সাম্রাজ্যের বাইরের মানুষও রোমের ডিনেরিয়াস (Denarius) মুদ্রা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করত, কারণ তারা রোমান সম্রাটকে বিশ্বাস করত, আর ওই মুদ্রায় আঁকা থাকত সেই সম্রাটেরই নাম ও ছবি।

আবার উলটোভাবে রোমান সম্রাটের ক্ষমতাও নিহিত ছিলো এই ডিনেরিয়াস মুদ্রার মাঝে। শুধু চিন্তা করে দেখুন তো, ওই বিশাল রোমান সাম্রাজ্যের প্রজাদের কাছ থেকে যদি খাজনা আদায় করা হতো গম আর বার্লিতে, কেমন হতো সেটা? আবার সেই খাজনা রোমের রাজকোষে জমাই বা হতো কীভাবে, আর সেটা ব্রিটেনে নিয়ে গিয়ে সেখানকার সৈন্যদের বেতনই বা দেওয়া যেত কীভাবে? কী হতো যদি শুধু রোমের মানুষএই মুদ্রা ব্যবহার করত আর বাইরের লোকে সেটা গ্রহণ না করে কড়ি ব্যবহার করত? সেক্ষেত্রেও সেই পুরনো সমস্যা রয়েই যেত।
স্বর্ণের মহিমা
রোমান মুদ্রা ডিনেরিয়াসের উপর মানুষের আস্থা এতটাই বেশি ছিলো যে রোমান সাম্রাজ্যের বাইরের মানুষও সেটা সাদরে গ্রহণ করে। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে ভারতেও এই ডিনেরিয়াস চলত, যদিও রোমান সৈন্যবাহিনী তখনও ভারত থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে। এই মুদ্রার উপর ভারতীয়দের আস্থা এতই বেশি ছিলো যে তারা ডিনেরিয়াসের আদলে মুদ্রা তৈরি করতে শুরু করে, এমনকি রোমান সম্রাটের ছবিসহ! ‘ডিনেরিয়াস’ শব্দটাই মুদ্রার প্রতিশব্দে পরিণত হয়। এই রোমান ‘ডিনেরিয়াস’ নামটাই আরব খলিফাদের হাতে হয়ে যায় আরবি ‘দিনার’। আজও জর্দান, ইরাক, সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, তিউনিসিয়াসহ বেশ কিছু দেশের রাষ্ট্রীয় মুদ্রার নাম দিনার।
এই লিডীয় ধাঁচের মুদ্রা যখন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভারত মহাসাগরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই চীনে গড়ে উঠছিলো নতুন এক মুদ্রাব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার মুদ্রা ছিলো ব্রোঞ্জের পয়সা আর চিহ্নবিহীন সোনা ও রূপার পিণ্ড। তবে এই দুরকম মুদ্রার মধ্যে একটা জায়গায় মিল ছিলো, সেটা হলো সোনা ও রূপার ব্যবহার। এ কারণেই চৈনিক অঞ্চলের সাথে লিডীয় অঞ্চলের আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হতে সমস্যা হয়নি। মুসলিম ও ইউরোপীয় বণিক ও দিগ্বিজয়ীদের হাত ধরে স্বর্ণের মহিমা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর আনাচে কানাচে। আর আজকের গোটা পৃথিবীটা জুড়েই একই মুদ্রাব্যবস্থা চলে, যার মূলে আছে সোনা ও রূপা, আর আছে ব্রিটিশ পাউন্ড ও মার্কিন ডলারের মতো কয়েকটা মুদ্রা।
এই বহুজাতিক মুদ্রার উদ্ভব প্রথমে এশিয়া ও আফ্রিকা আর পরে পুরো পৃথিবীকেই অর্থনৈতিকভাবে একীভূত করে ফেলে। মানুষ আগের মতোই নানা ভাষায় কথা বলে, বিভিন্ন শাসকের প্রতি আনুগত্য জানায়, ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম পালন করে, কিন্তু স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রায় লেনদেন করতে তাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। সোনা ও রূপার মূল্যের উপর সকল মানুষের এই যৌথ বিশ্বাস না থাকলে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। ষোড়শ শতকে আমেরিকায় পাওয়া সোনা দিয়ে ইউরোপীয়রা পূর্ব এশিয়া থেকে সিল্কের কাপড়, চিনামাটির বাসন আর মসলা কিনেছিলো। এভাবেই ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়া উভয় স্থানের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়। মেক্সিকোর খনি থেকে তোলা সোনা আর রূপা ইউরোপের ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে গিয়ে পৌঁছায় চীনের সিল্ক ও চিনামাটি ব্যবসায়ীর টাকার থলেতে। কর্টেজের মতো ‘স্বর্ণই যার একমাত্র ওষুধ’, সেই রোগে আক্রান্ত না হলে কি চীনা ব্যবসায়ীরা সোনা আর রূপার বিনিময়ে তাদের পণ্য বিক্রি করত?